লেখক পরিচিতি
আমি জাওয়াতা আফনান। আমি একজন নবীন লেখক। ছোটবেলা থেকেই গল্প পড়তে ও নিজের মনের মতো গল্প কল্পনা করতে ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা থেকেই লেখালেখির জগতে আমার পথচলা শুরু।
আমি জানি, আমি এখনো অনেক কিছু জানি না। আমার লেখায় ভুল থাকতে পারে, কিছু জায়গায় হয়তো আরও ভালো করার সুযোগ আছে। আমি সবসময় নিখুঁত নই। কখনো ভুল করি, কখনো নিজের স্বপ্ন পূরণ নিয়ে চিন্তা করি। তবে আমি ভুল থেকে শিখতে চাই এবং নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নত করতে চাই।
আমার ভালো দিক হলো, আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি, নতুন কিছু তৈরি করতে পছন্দ করি এবং নিজের চিন্তাগুলো লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাই। আমি চাই, আমার গল্প পড়ে পাঠকেরা আনন্দ পাক, ভাবুক এবং গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি মিলিয়ে দেখতে পারুক।
‘অদৃশ্য শিকারী’ আমার লেখালেখির জীবনের একটি বিশেষ সৃষ্টি। এই গল্পের মাধ্যমে আমি পাঠকদের রহস্যের জগতে নিয়ে যেতে চাই। আশা করি, গল্পটি পাঠকদের ভালো লাগবে এবং আমার লেখালেখির পথচলায় উৎসাহ জোগাবে।
পাঠকদের ভালোবাসা ও পরামর্শই আমার আগামী দিনের লেখালেখির সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
জাওয়াতা আফনান
অধ্যায় ১: বৃষ্টির রাতের ফোন কল
রাত তখন ২টা ১০ মিনিট।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ধানমন্ডির রাস্তাগুলো প্রায় জনশূন্য। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে গেছে।
গোয়েন্দা আরিয়ান রহমান গভীর ঘুমে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
ঘুমজড়ানো চোখে ফোনটি হাতে তুলে নিলেন তিনি।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— আরিয়ান সাহেব? আমি ওসি সাজ্জাদ হোসেন বলছি। ধানমন্ডি লেকের কাছে একটি লাশ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড মনে হচ্ছে না।
আরিয়ান উঠে বসলেন।
— কী হয়েছে?
— বিস্তারিত এখানে এসে বলব। আপনাকে একবার ঘটনাস্থলে আসতে হবে।
ফোন কেটে গেল।
আরিয়ান দ্রুত তৈরি হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরছে। প্রায় বিশ মিনিট পর তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন।
পুলিশ ইতিমধ্যে এলাকাটি ঘিরে রেখেছে। কয়েকজন কৌতূহলী মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছিল।
লাশটি পড়ে ছিল লেকের পাশের একটি গাছের কাছে। মধ্যবয়সী একজন পুরুষ। তাঁর পরনে দামি পোশাক।
ওসি সাজ্জাদ এগিয়ে এলেন।
— আসুন, আরিয়ান সাহেব।
আরিয়ান লাশটির দিকে তাকালেন।
— পরিচয় জানা গেছে?
— জি। রাশেদ চৌধুরী। দেশের পরিচিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী।
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরবে লাশটির পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তাঁর চোখ আটকে গেল একটি ছোট কার্ডে।
কার্ডটি লাশের পাশে পড়ে ছিল।
তিনি সেটি হাতে তুলে নিলেন।
এটি তাঁর নিজের ভিজিটিং কার্ড।
কার্ডের ওপর লাল কালিতে লেখা একটি সংখ্যা—১।
আরিয়ান বিস্মিত হলেন।
— আমার কার্ড এখানে এল কীভাবে?
সাজ্জাদ কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,
— মনে হচ্ছে, কেউ আপনাকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়াতে চাইছে।
আরিয়ান কার্ডটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বৃষ্টির শব্দ যেন আরও বেড়ে গেল।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর নিজেরও কোনো সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু কে এই রহস্যময় ব্যক্তি?
আর কেনই বা সে তাঁকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়াতে চাইছে?
অধ্যায় ২: অন্ধকারের সূত্র
পরদিন সকালে আরিয়ান রাশেদ চৌধুরীর অফিসে গেলেন।
অফিসটি ছিল একটি বহুতল ভবনের দশম তলায়। কর্মচারীদের মুখে শোক ও আতঙ্কের ছাপ। কেউই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান আর বেঁচে নেই।
রাশেদের ব্যক্তিগত কক্ষে ঢুকে আরিয়ান চারপাশে তাকালেন। টেবিলের ওপর কয়েকটি ফাইল, একটি ল্যাপটপ এবং কিছু কাগজপত্র পড়ে আছে।
অফিসের কম্পিউটার পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত বার্তা পাওয়া গেল।
বার্তাটি ছিল—
“তুমি আমাকে খুঁজছ, কিন্তু আমি তোমার খুব কাছেই আছি।”
আরিয়ান বার্তাটি কয়েকবার পড়লেন।
কে লিখেছে এটি? রাশেদ নিজে, নাকি হত্যাকারী?
বার্তাটি দেখে তাঁর মনে হলো, কেউ যেন তাঁকে উদ্দেশ্য করেই এই খেলা শুরু করেছে।
রাশেদের ল্যাপটপে আরও অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একটি ভিডিও পাওয়া গেল।
ভিডিওটি খুলতেই পর্দায় ভেসে উঠল অন্ধকার একটি ঘর। ঘরের মধ্যে একজন যুবক বসে আছে। তার হাত বাঁধা। মুখে আতঙ্কের ছাপ।
আরিয়ান ভিডিওটি থামিয়ে যুবকটির মুখ ভালো করে দেখলেন।
— এই ছেলেটি কে?
সাজ্জাদ বললেন,
— এখনো জানা যায়নি।
ভিডিওর শেষে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
— আরিয়ান, সময় খুব কম।
ভিডিওটি শেষ হয়ে গেল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন।
এবার তিনি রাশেদের মোবাইল ফোনের তথ্য পরীক্ষা করলেন। ফোনটির শেষ অবস্থান ছিল সাভারের একটি পরিত্যক্ত কাপড়ের কারখানা।
আরিয়ান সাজ্জাদের দিকে তাকালেন।
— আমাদের সেখানে যেতে হবে।
সাজ্জাদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
কিন্তু আরিয়ান জানতেন না, সেই পরিত্যক্ত কারখানায় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর এক রহস্য।
অধ্যায় ৩: সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ
রাতের অন্ধকারে আরিয়ান ও সাজ্জাদ সাভারের পরিত্যক্ত কাপড়ের কারখানায় পৌঁছালেন।
কারখানাটি বহু বছর ধরে বন্ধ। চারপাশে আগাছা, ভাঙা দেয়াল আর মরচে ধরা লোহার গেট।
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোমাখা যন্ত্রপাতি, ভাঙা চেয়ার আর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র চোখে পড়ল।
আরিয়ান টর্চের আলো ঘুরিয়ে চারপাশ দেখলেন।
— জায়গাটা অনেক দিন ধরে পরিত্যক্ত।
সাজ্জাদ বললেন,
— কিন্তু রাশেদের ফোনের শেষ অবস্থান এখানেই দেখাচ্ছে।
তাঁরা ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে গেলেন।
একটি দেয়ালের সামনে এসে আরিয়ান থেমে গেলেন। সেখানে লাল রঙে লেখা—
“সময় শেষ হওয়ার আগে সত্য খুঁজে বের করো।”
আরিয়ান লেখাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— আমাদের জন্যই লেখা হয়েছে, মনে হচ্ছে।
সাজ্জাদ চারপাশে তাকালেন।
— তাহলে এখানে কিছু একটা আছে।
তাঁরা ঘরটি ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর আরিয়ান একটি টেবিলের নিচে ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পেলেন।
কাগজটি খুলতেই চোখে পড়ল একটি সংখ্যা—
৯৯৯।
তার নিচে লেখা ছিল—চট্টগ্রাম বন্দর।
আরিয়ান কাগজটি সাজ্জাদকে দেখালেন।
— মনে হচ্ছে, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য চট্টগ্রাম।
সাজ্জাদ বললেন,
— কিন্তু সেখানে কী আছে?
আরিয়ান উত্তর দিলেন না।
দুজন বন্দরের উদ্দেশে রওনা হলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাঁরা নির্দিষ্ট কনটেইনারটি খুঁজে পেলেন।
কনটেইনারের দরজা খুলতেই ভেতর থেকে দুর্বল একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
— কেউ আছেন?
আরিয়ান দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন।
সেখানে বসে ছিল সেই যুবক, যাকে তাঁরা রাশেদের ল্যাপটপের ভিডিওতে দেখেছিলেন।
তাকে উদ্ধার করে বাইরে আনা হলো।
যুবকটি কাঁপছিল। কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর সে নিজের পরিচয় দিল।
— আমার নাম শাহরিয়ার।
আরিয়ান বললেন,
— তোমাকে এখানে আটকে রেখেছিল কে?
শাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— লোকটিকে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। কিন্তু সে আপনার কথা বলছিল।
— আমার কথা?
— জি। সে বলেছিল, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষই আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।
আরিয়ান চুপ করে গেলেন।
শাহরিয়ারের কথাটি তাঁর মনে গভীর সন্দেহ তৈরি করল।
বন্দরের ওপর তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে জাহাজের আলো জ্বলছে।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, এই রহস্যের জাল আরও বিস্তৃত।
অধ্যায় ৪: মুখোশের আড়ালে
শাহরিয়ারকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর আরিয়ান তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চাইলেন।
শাহরিয়ার জানাল, রাশেদ চৌধুরী একটি বড় আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছিলেন। সেই প্রমাণ প্রকাশ করার আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়।
— রাশেদ সাহেব আমাকে কিছু নথি দেখিয়েছিলেন, — শাহরিয়ার বলল। — তিনি বলেছিলেন, এসব তথ্য বাইরে গেলে অনেক বড় মানুষ বিপদে পড়বে।
আরিয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
— সেই নথিগুলো এখন কোথায়?
— জানি না। রাশেদ সাহেব মারা যাওয়ার পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।
আরিয়ান রাশেদের অফিসের নথিপত্র আবার পরীক্ষা করলেন। বেশ কিছু গোপন হিসাব পাওয়া গেল। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ও অর্থ লেনদেনের তথ্য ছিল।
একটি নথিতে চোখ আটকে গেল তাঁর।
সেখানে ওসি সাজ্জাদ হোসেনের নামও রয়েছে।
আরিয়ান নথিটি হাতে নিয়ে সাজ্জাদের সামনে দাঁড়ালেন।
— এই হিসাবের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?
সাজ্জাদ প্রথমে কোনো উত্তর দিলেন না।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— আমি ভুল করেছি, আরিয়ান।
আরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— কী ধরনের ভুল?
সাজ্জাদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— রাশেদ এমন কিছু জেনে গিয়েছিল, যা প্রকাশ হলে আমার জীবন শেষ হয়ে যেত।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, সাজ্জাদ শুধু আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। রাশেদের মৃত্যুর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক রয়েছে।
— রাশেদকে আপনি হত্যা করেছেন?
সাজ্জাদ মাথা নিচু করলেন।
— হ্যাঁ।
আরিয়ানের চোখে ক্ষোভ ফুটে উঠল।
সাজ্জাদ আরও বললেন,
— আমি নিজের অপরাধ আড়াল করতে আপনার ভিজিটিং কার্ড ঘটনাস্থলে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, সবাই আপনাকেই সন্দেহ করবে।
আরিয়ান শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— আপনি শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেননি, নিজের দায়িত্ব ও বিশ্বাসকেও হত্যা করেছেন।
সাজ্জাদ কোনো উত্তর দিলেন না।
তবে আরিয়ান জানতেন, সাজ্জাদের স্বীকারোক্তিই শেষ কথা নয়। এই অপরাধের পেছনে আরও কেউ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
তিনি আগেই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের কপি নিরাপদে রেখে দিয়েছিলেন।
সেই প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করল।
কিন্তু আরিয়ানের মনে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল—
সাজ্জাদ কি সত্যিই এই অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী?
নাকি সে অন্য কারও নির্দেশে কাজ করেছে?
অধ্যায় ৫: শেষ শিকার
সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সবাই ভেবেছিল, রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে।
সংবাদপত্রে রাশেদ চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হলো। পুলিশও তদন্তের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট।
কিন্তু গোয়েন্দা আরিয়ান রহমানের মনে সন্দেহ থেকেই গেল।
সাজ্জাদের অপরাধ স্বীকার করার পরও তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই ঘটনার পেছনে আরও কিছু রয়েছে।
একদিন সন্ধ্যায় নিজের বাসায় ফিরে আরিয়ান দরজার সামনে একটি কালো খাম দেখতে পেলেন।
খামটি হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
কেউ কি তাঁকে অনুসরণ করছে?
খামের ভেতরে ছিল একটি কালো ডায়েরি এবং একটি ভিজিটিং কার্ড।
কার্ডের ওপর লাল কালিতে লেখা—৩।
আরিয়ান ডায়েরিটি খুললেন।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“সাজ্জাদ শুধু একজন খেলোয়াড়। আসল শিকারী এখনো অদৃশ্য।”
আরিয়ানের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
তিনি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রাস্তার পাশে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িটির ভেতরে কেউ আছে কি না, বোঝা যাচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। তারপর দ্রুত অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল।
ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনে একটি বার্তা এল।
“খেলা শেষ হয়নি, আরিয়ান। এবার তোমার পালা।”
আরিয়ান ফোনটি নামিয়ে রাখলেন।
কালো ডায়েরিটি আবার খুললেন।
এর ভেতরে কিছু সংখ্যা, নাম ও অদ্ভুত চিহ্ন লেখা রয়েছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধের আসল রহস্য এখনো অমীমাংসিত।
আর এই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নিজের অতীত।
বহু বছর আগে তাঁর বাবা এক রহস্যময় দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
সেই মৃত্যুর সঙ্গে কি এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
আরিয়ান ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন।
একটি পাতায় লেখা—
“পুরোনো রেলস্টেশন। রাত বারোটা।”
আরিয়ান স্থির হয়ে গেলেন।
কেউ তাঁকে সেখানে ডাকছে।
কিন্তু কে?
আর কেন?
অধ্যায় ৬: শেষ রাতের সাক্ষাৎ
বার্তাটি পাওয়ার পর আরিয়ান বুঝতে পারলেন, সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করেই সব শেষ হয়নি।
কালো ডায়েরির প্রতিটি পাতায় কিছু সংখ্যা, নাম ও অদ্ভুত চিহ্ন লেখা ছিল। সেগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করেও তিনি কোনো স্পষ্ট সূত্র পেলেন না।
একটি পাতায় লেখা ছিল—
“পুরোনো রেলস্টেশন, রাত বারোটা।”
আরিয়ান সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
নির্দিষ্ট সময়ে স্টেশনে পৌঁছে তিনি একজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। লোকটির নাম মাহির চৌধুরী। সে রাশেদের পুরোনো বন্ধু।
মাহির আরিয়ানকে দেখে এগিয়ে এল।
— আপনি এসেছেন, আরিয়ান সাহেব।
— আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন?
মাহির মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
— আপনি যাকে খুঁজছেন, সে অনেক বছর ধরে এই শহরে আছে। আপনার বাবাও তাকে চিনতেন।
বাবার কথা শুনে আরিয়ান থমকে গেলেন।
তাঁর বাবা বহু বছর আগে এক রহস্যময় দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
— আমার বাবা? তিনি কীভাবে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?
মাহির চারপাশে তাকাল। তারপর নিচু কণ্ঠে বলল,
— সব কথা এখানে বলা সম্ভব নয়। আপনার বাবার পুরোনো কাগজপত্র খুঁজুন। সেখানেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাবেন।
আরিয়ান আরও কিছু জানতে চাইলেন।
কিন্তু মাহির আর কোনো কথা না বলে অন্ধকারের মধ্যে চলে গেল।
আরিয়ান স্টেশনের ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর মনে হতে লাগল, এতদিন যে রহস্যের পেছনে তিনি ছুটছেন, সেটি আসলে তাঁর নিজের পরিবারের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
অধ্যায়-৭: বাবার শেষ চিঠি
বাড়ি ফিরে আরিয়ান বাবার পুরোনো আলমারি খুললেন।
বহু বছর ধরে আলমারিটি তেমন খোলা হয়নি। ভেতরে পুরোনো বই, কিছু নথিপত্র ও কয়েকটি স্মৃতিচিহ্ন রাখা ছিল।
কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে তিনি একটি খাম পেলেন।
খামের ওপর লেখা—
“আরিয়ান, যখন সত্য জানার সময় হবে, তখনই খুলবে।”
আরিয়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে খামটি খুললেন।
ভেতরে বাবার হাতের লেখা একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“প্রিয় আরিয়ান,
আমি একটি বড় অপরাধচক্রের সন্ধান পেয়েছি। এই চক্রের সঙ্গে রাশেদ, মাহির, সাজ্জাদ এবং কামাল উদ্দিনের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
আমি অনেক চেষ্টা করেও তার পরিচয় জানতে পারিনি। তবে বুঝতে পেরেছি, এই চক্রের কাজ শুধু অর্থ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তারা নিজেদের অপরাধের প্রমাণ গোপন করে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
আমি সত্য প্রকাশ করতে চাই।
কিন্তু যদি আমার কিছু হয়, মনে করবে, এটা দুর্ঘটনা নয়।”
চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।
তাঁর বাবার মৃত্যুর রহস্যও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
আরিয়ান চিঠিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, এবার তাঁকে শুধু রাশেদের হত্যাকাণ্ড নয়, নিজের বাবার মৃত্যুর রহস্যও উদ্ঘাটন করতে হবে।
অধ্যায় ৮: গোপন ডায়েরি
কালো ডায়েরির পাতাগুলো আবার পরীক্ষা করতে গিয়ে আরিয়ান একটি পুরোনো ঠিকানা পেলেন।
গুলশান, বাড়ি নম্বর ৪২।
বাড়িটির মালিক কামাল উদ্দিন।
আরিয়ান ঠিকানাটি নিয়ে সেখানে গেলেন।
বাড়িটি বাইরে থেকে বেশ পুরোনো মনে হচ্ছিল। ভেতরে ঢুকে তিনি একটি পরিত্যক্ত ঘর খুঁজে পেলেন।
ঘরের দেয়ালে কয়েকজন মানুষের ছবি লাগানো ছিল।
একটি ছবিতে তাঁর বাবা, মাহির, রাশেদ, সাজ্জাদ ও কামাল উদ্দিনকে একসঙ্গে দেখা গেল।
ছবিটি দেখে আরিয়ান বিস্মিত হলেন।
তাঁর বাবা এই মানুষগুলোর সঙ্গে কীভাবে পরিচিত ছিলেন?
ছবিটি হাতে তুলে উল্টাতেই পেছনে লেখা দেখতে পেলেন—
“পাঁচজনের চুক্তি।”
আরিয়ান ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পাঁচজন মানুষ।
একটি গোপন চুক্তি।
আর তাঁর বাবার রহস্যময় মৃত্যু।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই পাঁচজনের মধ্যে কোনো গোপন সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা কথাটির অর্থ কী?
অধ্যায় ৯: পঞ্চম মানুষের পরিচয়
কামাল উদ্দিনের পুরোনো সহকারী রফিকের সঙ্গে আরিয়ানের দেখা হলো।
রফিক প্রথমে কিছু বলতে চাইল না। আরিয়ানের প্রশ্নের উত্তরে সে বারবার বলছিল, এসব বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।
কিন্তু বাবার পুরোনো ছবিটি দেখানোর পর রফিকের মুখের ভাব বদলে গেল।
সে ছবিটির দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল।
— এই ছবিটি আপনি কোথায় পেলেন?
— গুলশানের বাড়ি নম্বর ৪২-এ। এবার বলুন, ছবির মানুষগুলো কারা?
রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— এই লোকগুলো একসময় একটি গোপন সংগঠন তৈরি করেছিল। তাদের কাজ ছিল অবৈধ অর্থ লেনদেন ও অপরাধের প্রমাণ গোপন করা।
আরিয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
— সংগঠনটির নেতৃত্বে কে ছিল?
রফিক মাথা নাড়ল।
— তার পরিচয় কেউ জানত না। একজন সদস্য সবসময় অন্যদের নির্দেশ দিত। সবাই তাকে ভয় পেত।
— তার পরবর্তী ঠিকানা কোথায়?
রফিক নিচু কণ্ঠে বলল,
— চট্টগ্রাম।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, রহস্যের পরবর্তী সূত্র তাঁকে আবার চট্টগ্রামে নিয়ে যাচ্ছে।
অধ্যায় ১০: চট্টগ্রামের গোপন ঘর
আরিয়ান চট্টগ্রামে পৌঁছে একটি পুরোনো গুদামের সন্ধান পেলেন।
গুদামটি বন্দরের কাছাকাছি একটি নির্জন এলাকায় অবস্থিত। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে সেখানে কেউ আসেনি।
ভেতরে ঢুকে আরিয়ান একটি ছোট ঘর খুঁজে পেলেন।
ঘরের টেবিলের ওপর কিছু কাগজপত্র পড়ে ছিল। একটি পুরোনো আলমারির ভেতরে পাওয়া গেল একটি পেনড্রাইভ।
আরিয়ান পেনড্রাইভটি পরীক্ষা করলেন।
এর মধ্যে সংগঠনের কয়েকটি ভিডিও, হিসাবের খাতা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের রেকর্ড ছিল।
একটি ভিডিওতে দেখা গেল, একজন লোক মুখ ঢেকে বসে আছে।
লোকটি বলছে,
— সব কাজ আমার নির্দেশে হবে। কেউ আমার পরিচয় জানতে পারবে না।
ভিডিওর শেষে লোকটির হাতে একটি বিশেষ আংটি দেখা গেল।
আংটিটির নকশা ছিল অদ্ভুত। আরিয়ান আগে এমন আংটি দেখেননি।
তিনি ভিডিওটি কয়েকবার দেখলেন।
লোকটির মুখ দেখা না গেলেও আংটিটি স্পষ্ট।
আরিয়ান বুঝলেন, এই আংটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সূত্র।
অধ্যায় ১১: নতুন সন্দেহভাজন
পেনড্রাইভের তথ্য বিশ্লেষণ করে আরিয়ান জানতে পারলেন, রফিক ইসলাম নামের এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তথ্যটি তাঁকে বিস্মিত করল।
একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কীভাবে এমন অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
আরিয়ান রফিকের পুরোনো ঠিকানায় গেলেন।
কিন্তু বাড়িটি বহুদিন ধরে খালি।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারলেন, রফিক অনেক বছর আগে পরিবার ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর একটি ছেলে ছিল—নাবিল।
আরিয়ান নাবিলকে খুঁজে বের করলেন।
নাবিল প্রথমে কথা বলতে চাইছিল না।
আরিয়ান নিজের পরিচয় দিয়ে রফিক সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
নাবিল বলল,
— আমার বাবার সঙ্গে বহু বছর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি কোথায় আছেন, আমি জানি না।
আরিয়ান তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নাবিলের কথায় অসহায়ত্ব ছিল। কিন্তু তার চোখে যেন আরও কিছু লুকিয়ে আছে।
আরিয়ানের মনে হলো, নাবিল হয়তো এমন কিছু জানে, যা সে প্রকাশ করতে চাইছে না।
অধ্যায় ১২: অদৃশ্য শিকারীর বার্তা
এক রাতে আরিয়ানের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে ছবি এল।
ছবিতে ছিল একটি কালো কার্ড।
কার্ডের ওপর লাল কালিতে লেখা—৪।
সঙ্গে একটি বার্তা—
“তুমি সত্যের কাছাকাছি এসেছ। কিন্তু সত্য সবসময় নিরাপদ নয়।”
আরিয়ান নম্বরটি অনুসন্ধান করলেন। কিন্তু কোনো তথ্য পাওয়া গেল না।
তিনি কার্ডটির ছবিটি পেনড্রাইভে পাওয়া ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেন।
ভিডিওতে দেখা আংটিটির কথা তাঁর মনে পড়ল।
আরিয়ান নাবিলকে ফোন করলেন।
— তোমার বাবার কাছে কি বিশেষ কোনো আংটি ছিল?
নাবিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— হ্যাঁ। ছোটবেলায় বাবার হাতে একটি আংটি দেখেছিলাম। সেটির নকশা ছিল অদ্ভুত।
আরিয়ান বললেন,
— আংটিটির নকশা কি এমন ছিল?
তিনি ভিডিও থেকে পাওয়া আংটির ছবি নাবিলকে পাঠালেন।
ছবিটি দেখে নাবিল বলল,
— হ্যাঁ। ঠিক এমনই।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, রফিক ইসলামের সঙ্গে এই রহস্যের সম্পর্ক আরও গভীর।
অধ্যায় ১৩: সাজ্জাদের স্বীকারোক্তি
আরিয়ান আবার কারাগারে সাজ্জাদের সঙ্গে দেখা করলেন।
তিনি জানতে চাইলেন, রফিক ইসলাম সম্পর্কে সাজ্জাদ কী জানে।
সাজ্জাদ প্রথমে চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— আমি রাশেদকে হত্যা করেছি, কিন্তু সব পরিকল্পনা আমার ছিল না।
আরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।
— তাহলে কে পরিকল্পনা করেছিল?
সাজ্জাদ বলল,
— রফিক আমাকে ব্যবহার করেছিল। সে আমাকে বলেছিল, রাশেদ বেঁচে থাকলে আমাদের সবার বিপদ হবে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করলেন,
— আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে রফিকের সম্পর্ক আছে?
সাজ্জাদ মাথা নিচু করে বলল,
— আপনার বাবার কাছে সংগঠনের আসল হিসাব ছিল। তিনি সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তারপরই তাঁর জীবনে সেই দুর্ঘটনা ঘটে।
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
— আপনি কি জানতেন, আমার বাবার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না?
সাজ্জাদ কোনো উত্তর দিল না।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, বাবার মৃত্যুর পেছনে বড় ষড়যন্ত্র ছিল।
কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রের সবকিছু এখনো তাঁর জানা হয়নি।
অধ্যায় ১৪: গোপন সংগঠন
আরিয়ান সব প্রমাণ একত্র করলেন।
সংগঠনটির নাম ছিল “দ্য শ্যাডো গ্রুপ”।
তারা নিজেদের সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখতে সংখ্যা ব্যবহার করত।
পেনড্রাইভের তথ্য, কালো ডায়েরি এবং বিভিন্ন কার্ড পরীক্ষা করে আরিয়ান একটি তালিকা তৈরি করলেন।
১ নম্বর—সাজ্জাদ।
২ নম্বর—কামাল।
৩ নম্বর—মাহির।
৪ নম্বর—রফিক।
আর ৫ নম্বর সদস্যের পরিচয় এখনো অজানা।
আরিয়ান বুঝলেন, যে কার্ডগুলো তিনি পাচ্ছেন, সেগুলো সংগঠনের সদস্যদের পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু ৫ নম্বর সদস্য কে?
আর সেই সদস্য কি এখনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত?
আরিয়ান ডায়েরির পাতাগুলো আবার পরীক্ষা করতে লাগলেন।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যেন লুকিয়ে আছে একটি করে রহস্য।
অধ্যায় ১৫: পঞ্চম নম্বর
একটি ভিডিওতে আরিয়ান পঞ্চম সদস্যকে দেখতে পেলেন।
লোকটির মুখ ঢাকা, কিন্তু হাতে সেই পরিচিত আংটি।
ভিডিওটি বারবার দেখার পর আরিয়ান বুঝলেন, লোকটির হাঁটার ধরন নাবিলের মতো।
তিনি নাবিলকে ডেকে ভিডিওটি দেখালেন।
নাবিল ভিডিওটি দেখে ভয়ে চুপ হয়ে গেল।
আরিয়ান বললেন,
— এই লোকটি কে?
নাবিল কিছুক্ষণ পর বলল,
— আমি কিছু জানি না। তবে ওই আংটিটি আমার বাবার ছিল।
আরিয়ান ভিডিওটি আবার দেখলেন।
নাবিলের হাঁটার ধরন আর ভিডিওর লোকটির হাঁটার মধ্যে কিছুটা মিল রয়েছে। কিন্তু শুধু এই মিলের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলা যায় না।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, নাবিলের পরিবারও এই রহস্যের বাইরে নয়।
তবে নাবিল নিজে অপরাধচক্রের সদস্য কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অধ্যায় ১৬: নাবিলের অতীত
নাবিল জানাল, ছোটবেলায় তার বাবা রফিক তাকে বলেছিলেন, একদিন সে এমন কিছু জানবে, যা তার জীবন বদলে দেবে।
বাবা চলে যাওয়ার পর নাবিল আর কখনো তাঁকে দেখেনি।
কিন্তু কয়েক মাস আগে একটি অচেনা খাম পেয়েছিল।
খামের মধ্যে ছিল একটি পুরোনো ছবি ও একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“সময় হলে আমার কাছে ফিরে এসো।”
নাবিল এতদিন চিঠিটি লুকিয়ে রেখেছিল।
আরিয়ান চিঠিটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন।
কাগজের ধরন, হাতের লেখা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর মনে হলো, এটি রফিকের লেখা।
— এতদিন চিঠিটি লুকিয়ে রেখেছিলে কেন? — আরিয়ান জানতে চাইলেন।
নাবিল বলল,
— আমি ভয় পেয়েছিলাম। বাবার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানি না। তিনি কেন আমাকে এই চিঠি পাঠিয়েছেন, তা-ও বুঝতে পারিনি।
আরিয়ান চিঠিটি আবার ভাঁজ করলেন।
তিনি বুঝতে পারলেন, রফিকের সঙ্গে নাবিলের সম্পর্ক এই রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অধ্যায় ১৭: শেষ সূত্র
চিঠির কাগজে একটি ব্যাংকের নাম ও হিসাবের কিছু সংখ্যা লেখা ছিল।
আরিয়ান তদন্তের মাধ্যমে জানতে পারলেন, ওই হিসাব থেকে নিয়মিত টাকা পাঠানো হতো সমুদ্রতীরের একটি বাড়িতে।
বাড়িটির মালিকানা ছিল রফিকের নামে।
আরিয়ান নাবিলকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
যাওয়ার আগে তিনি সব তথ্য পুলিশকে জানিয়ে রাখলেন।
তিনি জানতেন, এবার হয়তো আসল শিকারীর মুখোমুখি হতে হবে।
কিন্তু তাঁর মনে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছিল—
রফিক কি সত্যিই সংগঠনের একমাত্র নেতা?
নাকি তারও ওপরে কেউ রয়েছে?
আরিয়ান গাড়িতে উঠলেন।
সমুদ্রতীরের বাড়িটির দিকে যাত্রা শুরু হলো।
অধ্যায় ১৮: সমুদ্রতীরের বাড়ি
সমুদ্রের পাশে নির্জন বাড়িটি বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হচ্ছিল।
চারপাশে ঝাউগাছ। দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে আরিয়ান বুঝলেন, বাড়িটি নিয়মিত ব্যবহার করা হয়।
দেয়ালে অনেক মানুষের ছবি। টেবিলে ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র। একটি ঘরে পাঁচটি ডায়েরি রাখা।
প্রতিটি ডায়েরির মলাটে একটি করে সংখ্যা লেখা ছিল।
আরিয়ান ডায়েরিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
— অবশেষে তুমি এখানে পৌঁছেছ, আরিয়ান।
আরিয়ান ঘুরে দাঁড়ালেন।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রফিক ইসলাম।
অধ্যায় ১৯: অদৃশ্য শিকারীর মুখ
রফিক শান্তভাবে বলল,
— তোমার বাবা অনেক কিছু জেনে ফেলেছিলেন। তিনি আমাদের সংগঠনের হিসাব প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
আরিয়ান বললেন,
— তাহলে রাশেদকে হত্যা করার পরিকল্পনাও আপনার?
রফিক উত্তর দিল,
— সাজ্জাদ নিজের অপরাধ ঢাকতে রাশেদকে হত্যা করেছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি তৈরি করেছিলাম আমি। সবাইকে নিজের মতো ব্যবহার করেছি।
আরিয়ান বললেন,
— আপনি ভেবেছিলেন, কেউ কোনোদিন সত্য জানতে পারবে না।
রফিক হেসে বলল,
— আমি এত বছর অদৃশ্য ছিলাম। আমাকে কেউ ধরতে পারবে না।
আরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— আপনি ভুল করেছেন। সত্যকে চিরকাল লুকিয়ে রাখা যায় না।
ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আরিয়ান আগেই পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন।
পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রফিক ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হলো।
আরিয়ান জানতেন, এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বহু বছরের রহস্যের একটি বড় অংশের সমাধান হয়েছে।
কিন্তু এখনো কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি।
অধ্যায় ২০: শেষ ডায়েরি
পুলিশ বাড়িটি তল্লাশি করে পাঁচটি ডায়েরি উদ্ধার করল।
সেখানে সংগঠনের হিসাব, সদস্যদের নাম এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেল।
একটি ডায়েরিতে আরিয়ানের বাবার নাম লেখা ছিল।
নামের পাশে লেখা—
“সবচেয়ে বড় বাধা।”
আরিয়ান ডায়েরিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
এত বছর পর তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর বাবার মৃত্যুর পেছনে কী ভয়ংকর ষড়যন্ত্র ছিল।
তাঁর বাবা অপরাধচক্রের হিসাব প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে একটি প্রশ্ন এখনো রয়ে গেল—
রফিক কি একাই সবকিছু পরিচালনা করত, নাকি তারও ওপরে কেউ ছিল?
আরিয়ান ডায়েরির শেষ পাতাটি খুললেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“সব সত্য একদিন প্রকাশিত হবে।”
অধ্যায় ২১: কামাল উদ্দিনের প্রত্যাবর্তন
রফিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশ কামাল উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল।
প্রথমে সে সব অস্বীকার করলেও পরে প্রমাণের মুখে ভেঙে পড়ল।
কামাল স্বীকার করল, সে সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিল। অর্থের লোভে সে বহু বছর অপরাধচক্রকে সাহায্য করেছে।
সে আরও জানাল, মাহিরও সংগঠনের কিছু গোপন কাজে যুক্ত ছিল। কিন্তু মাহির পরে সংগঠন থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, এই অপরাধের জাল অনেক গভীর ছিল।
তবে মাহিরের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
কামালের স্বীকারোক্তি থেকে জানা গেল, সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে সংখ্যার ব্যবহার করত।
আরিয়ান বুঝতে পারলেন, কালো কার্ডগুলোর রহস্যের একটি বড় অংশের সমাধান হয়েছে।
অধ্যায় ২২: আদালতের বিচার
সব প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হলো।
রাশেদ হত্যার জন্য সাজ্জাদ এবং অপরাধচক্র পরিচালনা ও ষড়যন্ত্রের জন্য রফিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা চলল।
দীর্ঘ বিচার শেষে অপরাধীদের দোষ প্রমাণিত হলো।
আদালত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি ঘোষণা করল।
আরিয়ান আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবলেন, সত্য প্রতিষ্ঠা করতে অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপরাধীরা আইনের মুখোমুখি হয়েছে।
তিনি বাবার ছবিটি হাতে নিয়ে বললেন,
— বাবা, আজ আপনার জন্য ন্যায়বিচারের পথ তৈরি হলো।
বহু বছরের অন্ধকার যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু আরিয়ানের মনে হলো, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে।
সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু সত্যের পথে থাকা আরও কঠিন।
অধ্যায় ২৩: নাবিলের নতুন জীবন
সব ঘটনা শেষ হওয়ার পর নাবিল নতুনভাবে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল।
সে আরিয়ানের কাছে এসে বলল,
— আমি আমার বাবার অতীতের জন্য সারাজীবন লজ্জা নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমি মানুষের উপকার করতে চাই।
আরিয়ান বললেন,
— মানুষের পরিচয় শুধু তার পরিবারের অতীত দিয়ে হয় না। নিজের কাজ দিয়েই নিজের পরিচয় তৈরি করতে হয়।
নাবিল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সে আরিয়ানের সঙ্গে কাজ শুরু করল। দুজন মিলে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল।
অনেক দিন পর আরিয়ানের জীবনে শান্তি ফিরে এল।
তবে তিনি জানতেন, একজন গোয়েন্দার কাজ কখনো শেষ হয় না।
প্রতিটি নতুন দিন নিয়ে আসে নতুন প্রশ্ন, নতুন রহস্য।
আর সত্যের সন্ধান চলতেই থাকে।
অধ্যায় ২৪: শেষ কার্ড
এক সকালে আরিয়ানের অফিসে একটি ছোট খাম এসে পৌঁছাল।
খামের ওপর কোনো প্রেরকের নাম ছিল না।
তিনি খাম খুলে দেখলেন, ভেতরে একটি কালো কার্ড।
কার্ডে লাল কালিতে লেখা—২।
আরিয়ান কার্ডটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
নাবিল জিজ্ঞেস করল,
— আবার কি নতুন কোনো রহস্য?
আরিয়ান বললেন,
— হতে পারে। তবে এবার আমরা কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্দেহ করব না।
কার্ডের পেছনে ছোট করে লেখা ছিল—
“সব সত্য প্রকাশিত হয়নি।”
আরিয়ান কার্ডটি প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করলেন।
তিনি জানতেন, পুরোনো মামলার প্রতিটি সূত্র আবার পরীক্ষা করতে হবে।
অধ্যায় ২৫: অদৃশ্য শিকারীর শেষ
কয়েক সপ্তাহ পর তদন্তে জানা গেল, ২ নম্বর কার্ডটি সংগঠনের পুরোনো নথির অংশ।
সেটি নতুন কোনো অপরাধীর পরিচয় নয়; বরং কামাল উদ্দিনের সদস্য নম্বর।
আরিয়ান বুঝলেন, কার্ডটি হয়তো পুরোনো প্রমাণেরই একটি হারিয়ে যাওয়া অংশ ছিল।
তিনি সব নথি পুলিশের কাছে জমা দিলেন।
বাবার মৃত্যুর মামলাও নতুন করে তদন্ত করা হলো। রফিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে পাওয়া প্রমাণে পুরোনো ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলো।
এক সন্ধ্যায় আরিয়ান তাঁর বাবার ছবির সামনে দাঁড়ালেন।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। সেই প্রথম রাতের মতোই বৃষ্টি।
নাবিল এসে বলল,
— স্যার, সব রহস্যের কি শেষ হয়?
আরিয়ান মৃদু কণ্ঠে বললেন,
— প্রতিটি রহস্যের উত্তর খুঁজতে হয়। আর সত্যকে কখনো ভয় পাওয়া যায় না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন, অদৃশ্য শিকারী যতই লুকিয়ে থাকুক, একদিন সত্যের আলোয় তার মুখ প্রকাশ পাবেই।
বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
আরিয়ানের মনে হলো, সেই প্রথম রাতের রহস্যময় ফোন কল যেন আবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু এবার তিনি জানেন, সত্যের পথ যতই কঠিন হোক, তাকে থামানো যায় না।
সমাপ্ত



0 মন্তব্যসমূহ