রূপান্তর/ ফ্রানজ কাফকা

 

এক সকালে অস্বস্তিকর স্বপ্ন থেকে গ্রেগর সামসা জেগে ওঠে, দেখে একটা বিরাট বড়ো পোকায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। শুয়ে আছে শুক্ত কিছুতে, বলতে গেলে বর্মের ঢালের উলটো দিকে, মাথাটা একটু তোলে, দেখতে পায় তার টোমের মতো বাদামি পেটের উপরিভাগটা যেখান থেকে দুটো ভাগ হয়ে গেছে, কোনোরকমে লেপটা লেগে রয়েছে, যেন পিছলে পড়ে যাচ্ছে। তার বিদঘুটে পা-গুলো শরীরের আয়তনের তুলনায় করুণভাবে খুবই সরু, তার চোখের সামনে অসহায়ভাবে দুলছে।

আমার কী হয়েছে, ভাবে সে। এতো স্বপ্ন নয়। তার ঘর, একজন মানুষ নিয়মিত থাকে এমনই এক শোয়ার ঘর, কেবল একটু ছোট, পরিচিত চার দেওয়ালের মাঝে ঠিক আর কী। টেবিলের ওপরে রয়েছে কিছু কাপড়ের নমুনা, খোলা, ছড়ানো ছিটানো—সামসা একজন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভ্রাম্যমান ক্যানভাসার—সাম্প্রতিককালের এক ম্যাগাজিন থেকে সুন্দর ছবি কেটে সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো এমনই একটা ছবি দেওয়ালে টাঙানো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন মহিলা তার ফার টুপি, ফারের স্ট্রোল, বসে আছে সোজা। এক ফারের বড় দস্তানা ধরে রয়েছে দর্শকদের দেখানোর জন্য, আর হাত দুটো পুরো ঢাকা পড়ে গেছে তারই আড়ালে। 

পাশের জানালার দিকে চোখ ফেরায় গ্রেগর, আকাশ মেঘে ঢাকা, জানালার খাঁজের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ শুনতে পায়, তাকে সম্পূর্ণ বিষণ্ন করে তোলে। আরও একটু ঘুমিয়ে নিলে হয়, এইসব আজেবাজে ব্যাপারটা ভুলে যাওয়া যাবে, ভাবে সে, তা আর হলো না। কারণ ডান কাতে শুয়েই সে অভ্যস্ত, তার এখনকার অবস্থা অনুসারে পাশই সে ফিরতে পারে না। তবুও সে নিজেকে ডান দিকে দারুণভাবে পাশ ফেরাতে চেষ্টা করে। সব বারই সে আগের জায়গায় গড়িয়ে আসে। কম করে একশো বার চেষ্টা করে, তার পা-গুলো যেমনভাবে নাড়াচাড়া করছে তা যেন না দেখতে হয় সে কারণে চোখ দুটো বন্ধ রাখে সে, যখন অস্পষ্ট এক ব্যথা পাশে অনুভব করতে শুরু করে তখনি কেবলই চেষ্টাটা বন্ধ করে, তার তো এর আগে কখনও এ রকম অভিজ্ঞতা হয়নি।

ওহ্ ভগবান, ভাবে, কী ক্লান্তিকর চাকরিই-না আমি জোগাড় করেছি। দিন নেই রাত নেই শুধু ঘোরা আর ঘোরা, অফিসে কাজ কম্মোর চেয়ে এ অনেক বেশি বিরক্তিকর, আর তার ওপর অনবরত ঘুরে ক্যানভাসের ঝামেলা, ট্রেন ধরার চিন্তা, বিছানা আর অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, হঠাৎ পরিচয় হওয়া লোকজন যারা সব সময় নতুন, এবং কখনও বন্ধু হয় না, তাদের নিয়ে ভাবা। জাহান্নামে যাক! তার পেটের ওপর সামান্য ব্যথা অনুভব করে; ধীরে ধীরে নিজেই পিঠের ওপর ঠেলে, বিছানার ওপর দিকটার কাছাকাছি আসে, এতে আরও সহজে মাথাটা ওপরে তুলতে পারে, ব্যথার জায়গাটা ধরতে পারে। সেই জায়গাটা অনেক সাদা সাদা দাগে ভরা, ব্যাপারটা সে বুঝতে পারে না। কোনো একটা পা-দিয়ে তা স্পর্শ করতে যায়, কিন্তু তখনি পা-টা টেনে আনে, কারণ স্পর্শ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়।

আবার সে তার আগের জায়গাতেই পিছলে পড়ে। এত তাড়াতাড়ি উঠা, ভাবে সে। এ তো সম্পূর্ণ বোকামি। মানুষের ঘুমের দরকার। অন্যসব ক্যানভাসাররা হারেমের বিবিদের মতো থাকে। যেমন, সকাল বেলায় যেসব অর্ডার পেয়েছি সেগুলো সব লিখে ফেলি হোটেলে ফিরে এসে, অন্য সবাই ব্রেকফাস্টের জন্য কেবল বসে থাকে। এ নিয়ে আমার বসের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা যায়; সেখানে ঐ মুহূর্তেই আমার চাকরি খতম। যাই হোক ওটা হলে আমার পক্ষে মন্দ নয়, ভালোই হবে, কিন্তু বলবেটা কে? যদি বাবা মার জন্য আমার নিজেকে সংযত না রাখতে হতো তবে কবেই আমি নোটিশ ধরিয়ে দিতাম। আমি বসের কাছে যেতাম, আর তাকে বলতাম যা কিছু ভাবনা রয়েছে আমার। সে তো তাহলে ডেস্ক থেকে পড়ে যেত! কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওপরে বসে থাকা এবং সেখান থেকে কথা বলতেই তারা অভ্যস্ত, বিশেষ করে যখন তাদের কাছে যেতে হয় কারণ তারা কানে কম শোনে। বেশ, এখনও আশা করা যায়, আশা আছে, কিছুটা টাকা জমাতে পারি তবে আমার মা বাবার দেনাটা শোধ হয়ে যাবে—আমরা পাঁচ বা ছ বছর লাগবে—সবকিছু ফেলে এটা আমি করবই। তারপর আমি অবশ্য সম্পূর্ণ যোগাযোগটা আলগা করে কেটে দেবো। এখন ব্যাপারটা থাক, উঠে পড়াটাই ভালো, আমার ট্রেনটা তো পাঁচটায় ছাড়ে। 

আলমারির ওপর রয়েছে এ্যালার্ম ঘড়িটা, টিকটিক করছে, সেদিকে তাকায়। হায় পরম পিতা! ভাবে সে। সাড়ে ছটা বেজে গেছে, কাঁটা দুটো বেশ চলছে, আধ ঘণ্টা হয়ে গেল, পৌনে সাতটা বাজতে চলল। ঘড়িটা কী ঠিকমতো চলছে না? বিছানা থেকে তো দেখা যায়, চারটের সময়ই এলার্ম দেওয়া ছিল; নিশ্চয়ই এটা বন্ধটন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, তবে কান-ঝালা দেওয়া শব্দের ভেতর কী ঘুমানো সম্ভব? আচ্ছা, ওর ঘুমটা ঠিকঠাক হয়নি। আপাতভাবে আরেকটু হলে বোধহয় ঠিক হতো। কিন্তু এখন তার কী করতে হবে? পরের ট্রেনটা যায় সাতটাতে, সেটা ধরতে হলে তো পাগলের মতো হুটোপুটি করতে হবে। আর স্যাম্পলগুলোও এখন বাঁধাছাদা গোছানো হয়নি। আর নিজেও তো সতেজ আর ঝরঝরে অনুভব করছে না। আর, এমন যদি হয় সে ট্রেনটা না ধরতে পারে, বসের বকাঝকা এড়াতে পারবে না, ফার্মের কুলিটা পাঁচটার ট্রেন পর্যন্ত অপেক্ষা করে যাবে আর সে পৌঁছতে পারেনি সে খবরটা ঠিক দিয়ে দেবে। কুলিটা বসের বড় চামচে, মেরুদণ্ডহীন, নির্বোধ। আচ্ছা ধরাই যাক, বলা যাবে সে অসুস্থ? কিন্তু সেটা হবে অস্বস্তিকর, সন্দেহের উদ্রেক করবে কারণ তার পাঁচ বছরের চাকরিতে সে একবারও অসুস্থ হয়নি। বড়কর্তা নিজেই নিশ্চয় সিক-ইনসিওরেন্স ডাক্তার নিয়ে হাজির হবে, তার বাবা মায়ের কাছে ছেলের আলসেমি নিয়ে সাতকাহন গেয়ে গালমন্দ করবে, সব অজুহাত নাকচ করে দিয়ে ইনসিওরেন্সের ডাক্তারকে বলবে, আর ওই ভদ্রলোক তো সব মানুষকে মনে করে গাবদা মালবাহী বলদের মতো। এ রকম ক্ষেত্রে সে কি সত্যি ভুল। গ্রেগর সত্যিই বেশ ভালোই অনুভব করে, কেটে গেছে তার ঝিমুনি ভাব। এই সুন্দর দীর্ঘ ঘুমের পর বেশ তরতাজাই, এমনকি তার খিদেটাও পেয়েছে অস্বাভাবিক ভাবেই জব্বর। 

সামর্থ্য ছাড়াই বিছানাটা ছাড়বে কিনা এ কথা বেশ দ্রুতগতিতে এ ভাবনা তার মনের ভেতর চলতে থাকে। অ্যালার্ম ঘড়িটায় সবে পৌনে সাতটা বেজে গেছে। তার বিছানার মাথার পেছনে দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ে। “গ্রেগর” এক স্বর শোনা গেল—এ তার মায়ের গলা—“পৌনে সাতটা তো বাজে। তুমি কি ট্রেন ধরবে না?” কোমল স্বর। তার গলার স্বর শুনে আহত হয় গ্রেগর। তার নিজের গলার স্বরে তার মাকে যে উত্তর দেয়। ভুল হবার কথা নয়। এ-যে তার গলা। এ সত্য, যে শব্দটি বেরয় তা নিচু স্বরে জোর করে ভয়ানক কাঁপা কাঁপা চিঁ চিঁ স্বর। প্রথমে তো স্পষ্ট কিছুই হলো না। তাদের অর্থ নষ্ট করে এমন কেঁপে শব্দ হলো, কেউ নিশ্চিত হতে পারে না সেই শ্বদগুলো আদতে কী। উত্তর দিতে চায় গ্রেগর এবং সবকিছু ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অবস্থানুসারে সে নিজেই নির্দিষ্ট করে বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধন্যবাদ, মা। এখনই উঠছি।” তাদের মাঝে কাঠের দরজার জন্য স্বরের পরিবর্তনটা অবশ্য বজায় থাকলেও, বাইরে থেকে ধরা পড়ে না। কারণ তার মা খুশি মনেই চলে যায়। তবুও এই সংক্ষিপ্ত শব্দের বিনিময়ে পরিবারের অন্যরা সচেতন থাকল যে গ্রেগর এখনও বাড়িতে রয়েছে, এ-তারা আশাই করে না, আর অন্য দরজায় তার বাবা ইতোমধ্যে আস্তে আস্তে হাত মুঠো করে দরজায় ঠোকা দেয়। অবশ্য আস্তে আস্তে, “গ্রেগর গ্রেগর” ডেকে ওঠেন তিনি, “তোমার কী হলো?” একটু পরে আবার ডেকে উঠলেন, আরও একটু গভীর স্বরে: “গ্রেগর! গ্রেগর!” আর পাশের দরজায় বোন নিচু স্বরে ডেকে ওঠে, সন্ধিগ্ধ স্বরে, “গ্রেগর? তোমার শরীর ভালো নেই? কিছু প্রয়োজন তোমার?” তখুনি দুটোর উত্তর দেয়: “আমি এখনই তৈরি হচ্ছি?” গলা যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে স্বাভাবিক করে কথাগুলো উচ্চারণ করে। তাই বাবা ফিরে গেলেন প্রাতরাশে, কিন্তু তার বোন ফিসফিস করে বলে: “গ্রেগর, দরজাটা খোলো, খোলো।” যাই হোক, দরজা খোলার কথা সে ভাবে না। ক্যানভাসের সময় নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি করে রাতের বেলায় দরজা বন্ধ করার যে অভ্যেসগুলো রপ্ত করেছে তাতে সেই বিচক্ষনতাকে কৃতজ্ঞ বলেই অনুভব করে, এমনকি বাড়িতেও। 

কোনোকম ঝামেলা-টামেলা না করে ওর এখনকার ইচ্ছে হলো ধীরে সুস্থে উঠা। পোশাক-টোশাক পরে এবং সবার আগে প্রাতরাশ করা। তারপর কেবল কী করবে ভাবা। যতক্ষণ বিছানায়, ভালোই সচেতন, তার ভাবনার কোনো সুষ্ঠু সমাধান হবে এমন নয়। মনে পড়ে বিছানায় সে প্রায়তই সামান্য ব্যথা ও যন্ত্রণা অনুভব করেছিল, সম্ভবত বিদঘুটে ভঙ্গিতে থাকার জন্যই, তাতেই প্রমাণিত হয়েছিল, ওসব সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক, ও একবার উঠে পড়লেই শেষ হবে, আগ্রহভরে সামনের দিকে তাকায় আজ সকালের ভুলভাল দেখা, ক্রমশই তা কমে যাচ্ছে। তার স্বরের বদলটা কিছু নয় কিন্তু ওটা বেশ ঠান্ডা লাগার দরুণই, বাণিজ্যিক ক্যানভাসারদের এটা নিত্য ব্যাপার-ট্যাপার। এ-যন্ত্রণা এ-কাজের অঙ্গ, সন্দেহ নেই এটার সেটাই সম্ভাবনা। 

লেপ থেকে বেরুনো বেশ সহজ; কেবল একটু নিজেকে ছড়াতে হয়, তবে ওটা নিজেই পড়ে যাবে। পরেরটা হয়ে যাবে কঠিন, বিশেষত কারণ এতই সে অস্বাভাবিক চওড়া আকার হয়ে উঠেছে। নিজেকে চাগানের জন্য তার তো বাহুর দরকার, হাতের দরকার, তার বদলে রয়েছে কেবল খুদে খুদে কতকগুলো পা, সেগুলো সবদিকে ক্রমাগত লাফাচ্ছে, লাফাচ্ছে, কখনও থামছে না, আর সে নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না। যখন তাদের একটিকে বাঁকানোর চেষ্টা করে, প্রথমটা নিজে সোজা করে টানতে হয়। তা করার জন্য অবশেষে সে কি সফল হয়েছিল, সে কী চেয়েছিল, অন্য পাগুলো সব ইতিমধ্যে দুলতে থাকে, আরও প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে লাফাতে থাকে। “আর অযথা বিছানায় অলস হয়ে শুয়ে থেকে কী দরকার,” নিজেকে গ্রেগর বলে। 

ভাবে প্রথমে তার শরীরের নিচের অংশটা বিছানার থেকে বের করতে পারবে, কিন্তু নিচের অংশটা এখনও সে দেখেনি, আর তার সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণাও করতে পারেনি, সরিয়ে প্রমাণ করাটাও বেশ কষ্টের। খুবই ধীরে ধীরে সরায়, যখন চূড়ান্তভাবে সরায়, প্রায় তীব্র বিরক্তিতে, জোরে, সকল জোর একত্র করে, সব শক্তি দিয়ে আর কি, এলোমেলোভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে। গোত্তা-টোত্তা দিয়ে, দিকটার হিসেবটা ভুল হলো তার আর বিছানার নিচের দিকটায় দারুণভাবে পড়ে গেল, তীব্র ব্যথা তাকে জানান দেয় নির্দিষ্ট রূপে তার শরীরের নিচের অংশটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।

তাই প্রথমে সে তার শরীরের উপরের অংশটা বের করার চেষ্টা করে। বেশ সতর্কতার সঙ্গে মাথাটা সরিয়ে নিয়ে আসে বিছানার কিনারে। সেটা বেশ সহজই হলো; এর বিশাল আকৃতি ও তার শরীরের স্থ’ূলতা সত্ত্বেও অবশেষে মাথার নড়াচড়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে দেহটা এগোয়। তবুও যখন সে বিছানার কিনারা থেকে মাথাটা মুক্ত করে সে অনুভব করে ক্ষতটা বেড়ে চলেছে, সর্বোপরি এভাবে যদি সে নিজেকে ছেড়ে দেয়, তাহলে সে পড়ে গেলে মাথাটায় চোট পাওয়া থেকে বাঁচানোটা একটা অলৌকিক ব্যাপার হবে। আর এই পরিস্থিতিতে জ্ঞান হারালে তো চলবে না, এর থেকে এখন, অন্তত এইসময়, বিছানায় থাকাটাই বরং ভালো। 

কিন্তু বার বার একই চেষ্টা করেও সেই আগের জায়গাতেই সে পড়ে আছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, লক্ষ করে তার ছোট ছোট পা-গুলো প্রচণ্ড বেগে একে-অন্যের সঙ্গে নড়তে থাকে, কিলবিলই করছে বলা ভালো। তা যদি সম্ভব হতো,        এ-রকম ঝামেলা থেকে যদি রেহাই পেত, কোনো উপায়ই সে দেখতে পায় না, নিজেকেই সে আবার বলে এরকমভাবে বিছানায় থাকা অসম্ভব। এর থেকে পালানোর যদি সামান্যতম কোনো উপায় দেখতে পেতো তাতে যদি ঝুঁকিও থাকত সেটাই সে নিত। একই সময়ে সে এটাও মনে আনতে ভুলল-না মাঝে মাঝে হঠকারিতার চেয়ে শান্ত ধীর থাকা অনেক বেশি ভালো। এ-রকম সময়ে সে তার চোখ দুটো জানালার দিকে যতটা সম্ভব তীক্ষ্মভাবে রাখে, কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, সকালের কুয়াশা ভালোই, সরু রাস্তার অপর পারও ঢেকে রেখেছে, সামান স্বস্তি তাকে দিল, সামান্য আরাম। “এরমধ্যে সাতটা তো বেজে গেছে,” মনে মনে বলে সে। যখন অ্যালার্ম ঘড়িটা আবার জানান দেয়, “সাতটা তো বেজে গেছে, এখনও এত ঘন কুয়াশা।” কিছু সময় সে চুপচাপ স্রেফ শুয়ে থাকে, হালকাভাবে নিঃশ্বাস নেয়, সম্ভবত যেন আশা করছে এভাবেই সবকিছু আবার ঠিকঠাক হবে এবং স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

কিন্তু তারপর সে নিজেকে বলে: “সোয়া-সাতটার আগে, যে করেই হোক, আমি অবশ্য বিছানা থেকে উঠতে পারব। আর সেইসময়ের মধ্যে অফিস থেকে কেউ না কেউ চলে আসবে। এসে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, অফিস খোলে সাতটার আগে।” শরীরটাকে দোলানোর জন্য নিজেকে স্থির করে তখনি, একটা নিয়মিত তালে, বিছানা থেকে ওঠার জন্য এইভাবে দুলতে থাকে। যদি ওভাবে নামাতে পারে তাহলে মাথাটাকে চোট থেকে বাঁচাতে পারে, আর সেটা যদি ঠিকঠাক কোণ পড়ে, তার পড়ার সময়। মনে হচ্ছে পিঠটা বেশ শক্ত, কার্পেটের ওপর পড়লে ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তার সবচেয়ে বড় ভাবনা পড়ার সময় শব্দটা যদি জোরে হয় তবে তো কারোর সাহায্য নিতে পারবে না, সম্ভবত সেটাই দুর্ভাবনার কারণ। যদি ভয়ংকর না-হয়, সবই তো দরজার আড়ালে। তবুও, অবশ্যই সে ঝুঁকিটা নেবে। 

যখন সে বিছানা থেকে আর্ধেক বেরিয়ে এসেছে—চেষ্টার চেয়ে নতুন পদ্ধতিটা একটা খেলা হয়ে ওঠে, কারণ কেবল প্রয়োজন এদিক-ওদিক দুলে নিজেকে সোজা নামানো—সে-সময় তার মনে হলো কী সহজই না হতো যদি কেউ সাহায্য করত। দুজন শক্ত সামর্থ্য লোকের দরকার, ভাবে তার বাবার কথা আর কাজের মেয়েটির কথা—ওরাই যথেষ্ট হতো, ওর উত্তল পিঠের নিচে ওদের হাতের জোরালো ধাক্কা দিলেই হতো, বিছানা থেকে বেরিয়ে আসত, তাদের ভারে নুয়ে পড়ত, তারপর ধৈর্য ধরে তাকে মেঝেতে ছেড়ে দিত, তারপর তার পা-গুলোর চলার সামর্থ্য দেখতে পেত। আচ্ছা ঘটনার কথা না ভেবে, আরে দরজাগুলো সবই তো তালা লাগানো, তার কী সাহায্যের জন্য চিৎকার করা উচিত? একথা মনে হতে তার করুণ অবস্থা সত্ত্বেও তার হাসি চেপে রাখতে পারে না।

যখন সে নিজেকে দোলাতে থাকে, তা এতটাই বেশি হয়ে ওঠে, তার ভারসাম্যটা কোনোক্রমে রাখতে পারে, সোয়া সাতটা বাজতে তো আর পাঁচ মিনিট বাকি, এরমধ্যে তার স্নায়ু শক্ত করে শেষ সিদ্ধান্তটা নিতে হবে—সামনের ডোরবেলটা বেজে ওঠে। নিজেকেই বলে ওঠে, “ঐ অফিস থেকে কেউ এসেছে,” প্রায় শক্ত হয়ে ওঠে, বেশ জোরেই তার ক্ষুদ্রে ক্ষুদ্রে পা-গুলো দুলছে, মুহূর্তেই সব সম্পূর্ণ থেমে যায়। “ওরা দরজাটা খুলে দিতে যাচ্ছে না,” গ্রেগর নিজেকে বলে, এক ধরণের অবান্তর আশা করেই বলে! অবশ্যই কাজের মেয়েটি যেমন থপথপ করে জোরে যায় সেভাবে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। গ্রেগরের কেবল আগন্তুকের প্রথম সুপ্রভাত সম্ভাষণটা শোনা দরকার এখুনি, তাহলে জানতে পারবে, কে—অফিসের বড়বাবু নিজেই। কী ভাগ্য! অফিসের কাজের জন্য সন্দেহ, সামান্য না যাওয়ার জন্য গভীর সন্দেহ জাগল! সব কর্মচারীই এক ধাচের শয়তান ছাড়া কিছু নয়, একজন অনুগত মানুষও কি নেই, যে তার এক ঘণ্টা সময় নষ্ট করে অথবা সরকারের সময় ফার্মের (অফিসের) সময় ব্যয় করে, তার মনের ভেতর বিবেক তাড়িত হয়ে চলেছে, আর সত্যি কি সে তার বিছানা ছেড়ে উঠতে অক্ষম? খোঁজ নেওয়ার জন্য একজন শিক্ষানবীশকে পাঠালে কী যথেষ্ট হতো না—আর আদৌ যদি খোঁজ নেওয়াটা প্রয়োজন থেকে থাকত—বড়বাবুর নিজেকেই আসতে হবে, এইভাবে পুরো পরিবারকে, একটা নিরীহ পরিবারকে জানান দেওয়া, এ-রকম এক সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করে পরিস্থিতিকে অনুসন্ধান, এমন এক সন্দেহ যে অন্য কেউ না এসে, হাজার কাজ ফেলে আমাকে আসতে হয়েছে? এই ঘটনায় এমনই উত্তেজিত হয়ে পড়ে গ্রেগর নিজেই দুলতে থাকে বিছানার বাইরে, তার সকল শক্তিতে, এসব তার উত্তেজনার প্রতিফলন। বেশ জোরেই এক ঝপাস শব্দ হলো, তবে তেমন কোনো মড়াত করে পড়ার শব্দ নয়। তার পড়ার ফলে অল্পবিস্তর কার্পেটের ক্ষতি হলো, লাগল পিঠেও, তবে তার পিঠ যতটা শক্ত ভেবেছিল, তা নয়, মেঝেতে কার্পেটের ওপর পড়ায় মৃদু ধপাস শব্দ হয়, চমকে ওঠার মতো নয়। কেবল সে তার মাথাটা সাবধানে ততটা তুলতে পারেনি, তাই মাথাতে চোট লাগে। মাথাটা ঘোরায়, কার্পেটের ঘষা লাগায়, ব্যথা লাগে, জ্বালাও করে।

“ওদিকে কী যেন পড়ল”, বাঁ দিকে পাশের ঘর থেকে বড়বাবু (প্রধান কেরানি) বলে। গ্রেগর নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে তার আজ যা ঘটেছে তা তো যে কোনোদিন তার বড়বাবুরও ঘটতে পারে; কেউই তো আর জোর দিয়ে বলতে পারে না যে, এ তার নিজের ঘটবে না। এ অসম্ভব। বড়বাবু পাশের ঘরে কয়েকবার রূঢ় অসামাজিকভাবে দুবার দৃঢ় পা ফেলে যেন সে উত্তর দেয়, আর তার পেটেন্ট চামড়ার জুতোর মচমচ শব্দ হয়। ডান দিকের পাশের ঘর থেকে বোন ফিসফিস করে তাকে জানায় অবস্থার কথা: “গ্রেগর, বড়বাবু এসেছে।” গ্রেগর নিজেকেই আওড়ে বিড়বিড় করে বলে, “আমি জানি,” কিন্তু তার বোন শুনতে পায় ততটা জোরে স্বর তুলে বলতে সাহস পায় না। 

“গ্রেগর”, বাবা বাঁ দিকের ঘর থেকে ডেকে ওঠে, বলেন, “বড়বাবু এসেছেন, জানতে চেয়েছেন, কেন তুমি সকালবেলার ট্রেনটা ধরোনি। আমরা জানি না, কী বলতে হবে। এছাড়া, উনি নিজে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। সেজন্য দরজাটা খোলো অন্তত। তোমার ঘরের সব অগোছালো থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সজ্জন, এসব তোমাকে ক্ষমার চোখেই দেখবেন।” ইতোমধ্যে বড়বাবু ডাকতে লাগল, এসে উপস্থিত হয়ে বলে, “সুপ্রভাত মিস্টার সামসা,” বড়বাবুর উদ্দেশ্যে মা বলে ওঠেন, “ওর শরীরটা ভালো নেই,” এসময় বাবা দরজার ভেতর বলে চলে, “ও ভালো নেই, স্যার, আমাকে বিশ্বাস করুন। নাহলে কেন ট্রেন ধরবে না বলুন। ছেলেটা কাজ ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। আমার তো ভয়ই করে ও কখনও সন্ধেতে বের হয় না পর্যন্ত; গত আটদিন ধরে এখানেই থাকে, বাড়িতেই রয়েছে সবদিন সন্ধেতে। এখানে টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ে, আর টাইম-টেবিলের পাতা উলটে পড়ে। আঁকাজোকা করেই ও আনন্দ পায় কেবল। দেখুন, দু-তিন সন্ধে ধরে কাটাকুটি করে ফ্রেমে কী সুন্দরই না ছবি সেটেছে, দেখে আপনি অবাক হয়ে যাবেন কী সুন্দরই না হয়েছে, ওর ঘরে সেটা টাঙানো; আপনি সেটা দেখতে পাবেন মিনিট-খানেকের মধ্যে, গ্রেগর দরজাটা খুলল। আপনি এসেছেন, কী সৌভাগ্য আমার, খুব খুশি হয়েছি, স্যার, আমরা নিজেরা কখনই দরজায় তালা দিয়ে রাখি না, ও এক ধরনের জেদি, আমি নিশ্চিত ওর শরীরটা ভালো নেই, যদিও এমন আজ সকালে না হলে ভালো হতো।” “আমি এই আসছি” খুব ধীরে ধীরে এবং সতর্ক হয়েই গ্রেগর বলে। কথা বলার মাঝে কিছুই যে ছাড় না যায় তারই ভয়ে ভয়ে এক চুলও নড়ে না। বড়বাবু বলে, “ম্যাডাম আমি তো এর কোন ব্যাখ্যা করার কথাই ভাবতে পারছি না। মনে হয় সিরিয়স কিছু হয়নি। যদিও আমি অবশ্য বলি, সৌভাগ্যবশত বা দুর্ভাগ্যবশত আমরা ব্যবসায়ী মানুষেরা প্রায়ই কাজে সামান্য গাফিলতি সহ্য করতে পারিনা, কাজে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।” অর্ধৈর্য হয়ে গ্রেগরের বাবা জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, বড়বাবু কি এখন আসতে পারেন?” দরজায় টোকা দেন। “না,” গ্রেগর বলে। বাঁ-দিকের ঘরে এক যন্ত্রণাময় নীরবতা এই অস্বীকারকে অনুসরণ করে, ডান-দিকের ঘরে তার বোন ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

অন্যদের সঙ্গে বোন যোগ দেয়নি কেন? সম্ভবত নতুনভাবে বিছানা ছেড়ে উঠেছে, এখনও ওর পোশাক পরা হয়নি। তা ভালো, ও কাঁদছে কেন? কারণ গ্রেগর উঠেনি, বড়বাবুকে ভেতরে আসতে দেয়নি, কারণ ওর চাকরি হারানোর ভয়ে রয়েছে, কারণ বড়বাবু আবার পুরনো দেনা নিয়ে জোর তাগাদা দিতে শুরু করবে? এখন নিশ্চয় এসব নিয়ে কারও চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। গ্রেগর এখনও বাড়িতে, আর পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার ভাবনায় নেই। এই মুহূর্তে, সত্য, সে শুয়ে আছে কার্পেটের ওপর, আর কেউই জানে না তার অবস্থাটা, বড়বাবুকে ঢুকতে দেবে বড়রকম আশা করতে পারে। কারণ এ একরকম অভদ্রতা, পরে যাই হোক, একটা ব্যাখ্যা করতে পারে, তা ন্যায়সঙ্গতভাবেই, গ্রেগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে পারা যায় না। কান্না, কাকুতি-মিনতি করার অস্বস্তি থেকে গ্রেগরের মনে হয় তাকে যদি শান্তিতে থাকতে দেয় তবে সেটাই হবে সংবেদনশীল। তবু, অবশ্য, তাদের অনিশ্চয়তা তাদের সকলকে বিভ্রান্ত করে এবং তাদের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা পেয়ে যায়।

“মিস্টার সামসা,” বড়বাবু এখন গলা চড়িয়ে ডেকে ওঠে “তোমার ব্যাপারটা কী? তুমি এখানে, তোমার ঘরে তোমাকে বদ্ধ করে রেখেছে, উত্তর দিচ্ছ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলে। তোমার মা-বাবার অযথা যথেষ্ট কষ্টের কারণ হচ্ছো, তাদের অবহেলা করছো। আমি বলছি এ কেবল অদ্ভুতভাবে তোমার ব্যবসার কাজে অবহেলা। সময় নষ্ট করে চলেছ। তোমার মা বাবার দোহাই, তোমার বসের দোহাই এখানে আমি বলছি, আমি অনুরোধ করছি। অন্তর দিয়ে বলছি, এখনি, তোমার কথা আমাকে বলো। তুমি আমায় অবাক করেছ, সত্যি আমাকে অবাক করেছো। ভেবেছিলাম তুমি ঠিক আছো, নির্ভর করা যায় তোমাকে। সব মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে, তুমি যা নির্লজ্জ ব্যাপার দেখালে তোমার আজ সকালের অনুপস্থিতি নিয়ে যা-সব ইঙ্গিত করে বলেছে আমাকে বস্—তোমাকে যে নগদ টাকাটা দেওয়া হয়েছে সেটার কথা তুলে, তোমার ওপর হালে একটা অবিশ্বাস এসেছে—কিন্তু আমি প্রায় দৃঢ়তার সঙ্গে আপত্তি জানিয়ে বলেছি—না এ হতে পারে না। কিন্তু এখন আমি দেখছি কীভাবে তুমি অবিশ্বাস্য রকম একজন জেদি, একগুঁয়ে। এক মুহূর্তও তোমার সঙ্গে এতটুকু থাকার ইচ্ছে আমার নেই। ফার্মে তোমার অবস্থা বলা যায় না। এসেছিলাম তোমাকে সব ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগতভাবে বলব, এ-রকমই ইচ্ছে ছিল, তখন থেকে তুমি আমার সময় নষ্ট করেছ এত অকারণে। আমি ভেবে পাচ্ছি না কেন তোমার বাবা-মা এসব না শোনা উচিত। কারণ কিছু সময় হলো তোমার কাজকম্মো অত্যন্ত অসন্তোষজনক। বছরের এ-সময়টা কখনও ব্যবসার কাজে ঢিলেঢালা ফেলা যায় না, অবশ্য আমরা মানি বছরের একটা সময় একদম ব্যবসা দেয় না, সেটা তো এ-সময় নয়, মিস্টার সামসা, অবশ্য তা তো সব সময় থাকবেও না।”

“কিন্তু, স্যার” চিৎকার করে ওঠে গ্রেগর। এছাড়া তার ব্যথা ইত্যাদি সবকিছু ভুলেই বলে ওঠে, “এখুনি আমি দরজাটা খুলতে যাচ্ছি। সামান্য অসুস্থতা, ম্যাজম্যাজ ভাবটা আমাকে উঠা থেকে আটকে রেখেছে। এখনও আমি বিছানায় শুয়ে আছি। কিন্তু আবার আমি পুরো ঠিক আছি অনুভব করি, এখন আবার বিছানা থেকে উঠছি। আর দুয়েক মুহূর্ত সময় দিন কেবল! যেমনটা আমি ভেবেছিলাম ততটা ভালো নেই। কিন্তু আমি ঠিকই আছি, সত্যি। ও-রকম একটা জিনিস কী বিপদে হঠাৎ না ফেলে! কেবল গত রাতে আমি পুরো ভালো ছিলাম, বাবা-মা বলতে পারে আপনাকে, বা এর একটা বরং সামান্য পূর্বাভাস বা একটা লক্ষণ আমার ছিল। এতে কিছু লক্ষণ আমি অবশ্য দেখিয়েছি। কেন আমি অফিসে জানাইনি! কিন্তু একজন তো সব সময় ভাবে বাড়িতে না থেকেই এই অসুস্থতা দূর হয়ে যেতে পারে। ওহ্ স্যার, আমার মা-বাবাকে রেহাই দিন! যে ব্যাপারে আমাকে দোষারোপ করছেন তার কোনো ভিত্তি নেই; কেউই আমাকে এ-নিয়ে একটা শব্দও বলেনি। আমি যে শেষ অর্ডার পাঠিয়েছি সম্ভবত আপনি তা দেখেননি। যাই হোক, আমি এখনও আটটার ট্রেনটা ধরতে পারি। কয়েক ঘণ্টা বিশ্রামের পর আমি আরও ভালো হবো। এখানেই আপনাকে আটকাতে না-হয় আমাকে; শীঘ্রই আমি কাজে উপস্থিত এবো, বস্কে বলবেন দয়াপরবশত একথাটা বলবেন। বলবেন আমাকে যেন ক্ষমা করেন!”

আর এর সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যখন উলট-পালট হয়ে বের হয়, গ্রেগর কিছু জানে না সে কী সব বলছে, সিন্দুকটার কাছে সহজেই পৌঁছয়, সম্ভবত তার যেহেতু বিছানা তোলার অভ্যেস রয়েছে হয়তো তাই, যেকোনো ভাবে নিজেকে সোজা করে দাঁড় করার জন্য চেষ্টা করে চলেছে। মানে সে দরজাটা খুলতে চাইছে, দেখাতে চায় নিজেকে, বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলতে চায়; তাকে দেখে অন্যান্যরা কী বলে তা দেখার জন্য আগ্রহী, সর্বোপরি তাদের জেদ, তাকে দেখে কী বলে। তারা যদি ভয় পেয়ে যায় এতে তার ওপর আর দায়িত্ব বর্তাবে না। সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। যদি ওরা একে শান্তভাবে নিতে পারে, তাহলে তো তার আর ঘাবড়ানো ব্যাপার নেই। যদি সে তাড়াহুড়ো করে তবে আটটার ট্রেনটা ধরতে পারবে। সিন্দুকের মসৃণ গা বেয়ে উঠতে গিয়ে প্রথমে বেশ কয়েকবার পিছলে পড়ে গেল, কিন্তু শেষ বারের প্রবল চেষ্টায় সে দাঁড়াতে পারে; তার শরীরের নিচের ভাগ যে যন্ত্রণা তার দিকে কোনো নজরই দিল না। যাই হোক, ওরা সবাই ঠিকঠাক থাকে। কাছের একটা চেয়ারের পেছনে নিজেকে পড়ে যেতে দেয়, তার থুদে খুদে পা-গুলো চেয়ারের ধারগুলো আঁকড়ে ধরে। আবার নিজেকে আয়ত্তে আনার ক্ষমতায় আসে, কথা বন্ধ করে দেয় কারণ বড়বাবু কী বলছে তা সে শুনতে পারবে।

“আপনারা কী ওর একটা কথাও বুঝতে পারছেন?” বড়বাবু জিজ্ঞেস করে। “নিশ্চয় আমাদের বোকা বানানোর জন্য চেষ্টা করছে ও-তা পারবে না?” ওর মা কেঁদে বলে, “ওহ্ সামসা, বাবা!—সম্ভবত ও খুবই অসুস্থ, ওকে আমরা কষ্ট দিচ্ছি, গ্রেটে! গ্রেটে!” ডেকে ওঠেন মা। অন্যদিক থেকে বোন চিৎকার করে সাড়া দেয়, “হ্যাঁ, মা?” গ্রেগরের দুপাশের ঘর থেকে দুজন-দুজনকে ডেকে চলেছে। “এখুনি ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসো, গ্রেগর অসুস্থ। শীঘ্রি, ডাক্তারের কাছে যাও। তোমরা কী শুনতে পাচ্ছো ও কী বলছে?” “ওটা মানুষের গলা নয়,” মায়ের তীক্ষ্ম স্বর লক্ষ্য করে নিচু গলায় বলে বড়বাবু। “আন্না! আন্না!” হলঘর থেকে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে ডেকে বলেন তার বাবা; হাত তালি দিয়ে, “এখুনি একজন তালার মিস্ত্রিকে ডেকে আনো!” আর এরমধ্যে দুটো মেয়ে হলঘরের ভেতর ছোটাছুটির সময় ওদের স্কার্টের সাঁইসুঁই শব্দ হতে থাকে, ওর বোন কী করে এত তাড়াতাড়ি পোশাক পরল?—সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আবার যে শব্দ হয় তা শোনা গেল না; ওরা যাওয়ার সময় খুলে রাখার প্রমাণ স্বরূপ রেখে যায়, যে বাড়িতে কোনো বড়ো দুর্ভাগ্যের কিছু ঘটেছে।

কিন্তু গ্রেগর এখন আরও শান্ত। যেসব কথাগুলো সে বলেছে তা আপাতত বোধগম্য নয়, যদিও তা তার কাছে মনে হয় যথেষ্ট রকম স্পষ্ট, এমনকি আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট, সম্ভবত কারণ তার এ-শব্দের সঙ্গে অভ্যন্ত হয়ে উঠেছে। তথাপি যেকোনো বিচারে লোকে এখন বিশ্বাস করবে যে তার কিছু গোলমাল ঘটেছে, তাকে সাহায্য করতে তৈরি হতে হবে। স্থির নিশ্চয়তার জন্য যা কিছু নেওয়া হবে তা তার পক্ষে আরামদায়কই হবে। নিজে অনুভব করে মানুষের আবর্তে আরও একবার ডাক্তার, তালামিস্ত্রি উভয়েরই মহান ও উল্লেখযোগ্য ফল আশা করে। প্রকৃতপক্ষে স্পষ্টত কোনো তফাত সে করে না। যেসব কথা বলতে হবে তার জন্য সে যতটা সম্ভব গলাটা পরিষ্কার করে, এখন সামান্য কেশে, যতটা সম্ভব, শব্দটা শুনে বোঝা যেতে পারে এটা মানুষের, তা বিচার করার মতো সমর্থ্য হলো সে। এ-সময় পাশের ঘর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। সম্ভবত বাবা-মা দুজনে বড়বাবুর সঙ্গে টেবিলে বসে আছে। আস্তে আস্তে কথা বলছে, সম্ভবত ওরা দরজার দিকে ঝুঁকে কান খাড়া করে রেখেছে, কিছু শোনার জন্য।

ধীরে ধীরে গ্রেগর দরজার দিকে চেয়ারটা ঠেলে, সেটাকে ছেড়ে দেয়, সাহায্যের জন্য দরজাটা ধরে, তার খুদে খুদে পা-গুলোর নিচটা অল্পবিস্তর আঠালো হয়ে লেগে রয়েছে—তার চেষ্টা করার পর এক মুহূর্তের জন্য লেগে থাকল। তারপর মুখে চাবিটা নিয়ে নিজেকে ঠিক করে নেয়। মনে হলো, অসুখী মনেই, যেন তার কোনো দাঁত নেই, তবে ধরবে কী করে?—কিন্তু অন্যদিকে তার চোয়ালদুটো নিশ্চয় বেশ শক্ত, তার সাহায্যে চাবিটা লাগিয়ে ঠিক ঘোরাতে পারবে, অসতর্ক ব্যাপার হলো কোথাও, সন্দেহ নেই কোথাও ক্ষতি হলো, তার মুখ থেকে বাদামি রংয়ের রস গড়াল, ঝরে পড়ে চাবিটির ওপর, মেঝের ওপর ও পড়ে। “ওদিকে শুনুন” বড়বাবু বলে পাশের দরজায়, “চাবিটা ঘোরাচ্ছে ও।” গ্রেগরের কাছে এ-শোনাটা বেশ উৎসাহজনক; ওদের সকলের চ্যাঁচিয়ে উৎসাহ দেওয়া উচিত। ওর মা-বাবারও: “ঘোরাও, ঘোরাও, ঘোরাও গ্রেগর,” ওদের চ্যাঁচিয়ে বলা উচিত, “চেষ্টা করে যাও, চাবিটা ঠিক করে ধরো!” তার চেষ্টাটা সকলেই অত্যন্ত আস্থা ভরে নজর রাখছে, কোনোরকম অন্যদিকে নজর না রেখে চোয়ালদুটো শক্ত করে, পুরো জোরটা চাবির ওপর দেয়। চাবিটা ঘুরতেই সে তালার চারদিকে ঘোরাতে থাকে। মুখ দিয়ে কেবল চেপে রাখে, চাবিটা ঠেলে ধরে। যেমনটা দরকার, বা শরীরের সমস্ত ওজন আবার চাপিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তালাটা খোলার ক্লিক শব্দটা জোরে হয়, গ্রেগরও তাড়াতাড়ি সেটা খোলার চেষ্টা করে। গভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে বলে: “যাক তালামিস্ত্রির আর দরকার হলো না।” দরজাটা হাট করে খোলার জন্য মাথাটা হাতলে রাখে।

তাকে দরজাটা টানতে হলো তার দিকে, তবুও হাট হয়ে দরজাটা খুলল বটে সে তখনও আড়ালে থেকে যায়। দুটো পাল্লার অর্ধেকের কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে দরজার ধারে নিতে হয়, আর এ করতে হয় অতি সতর্কতার সঙ্গে, যেন পিঠের ভাড়ে দড়াম করে পড়ে না-যায় ঢোকার মুখটায়। তবু সে টেনে নিয়ে যায় কঠিন চেষ্টায়, কোনোকিছু লক্ষ রাখার মতো তার সময় নেই যখন সে শোনে বড়বাবুর চিৎকার “ওহ!”—দমকা বাতাসের মতো শব্দ হয়—লোকটা দেখতে পায় এখন, যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে সবচেয়ে কাছের দরজায়, খোলা মুখটা হাত দিয়ে চেপে রয়েছে, ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায় যেন কোনো এক অদৃশ্য সবল চাপ তাকে পেছনে টেনে নিয়ে যায়। ওর মা, বড়বাবু থাকা সত্ত্বেও চুল বাঁধেনি, ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে—প্রথম হাতদুটো জোড় করে চেপে থাকে, বাবার দিকে তাকায়, তারপর দু-পা এগিয়ে এলো গ্রেগরের দিকে। মেঝেতে ঝুলে থাকা স্কার্টের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ওর স্তনের ওপর তার মুখটা আড়াল হয় থাকে। বাবার মুখটা ভয়ানক-ভয়ে বীভৎস হয়ে হাত দুটো মুঠো হয়ে যায়, যেন বলতে চাইছে ঘুষি মেরে গ্রেগরকে ঘরে পাঠিয়ে দেবে। তারপর ঘরের দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ দৃষ্টি মেলে ধরে, দু-হাত দিয়ে মুখ ডেকে ফেলে, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, যতক্ষণ বিশাল কান্না তার বুক ভরে থাকে। 

গ্রেগর ফিরে গেল না, দরজার পাল্লাটা জোর চেপে ধরে ভেতরে ঝুঁকে থাকে, তাই শরীরের অর্ধেকটা দেখা যায়, আর মাথাটা উঁচু করে ঝুঁকিয়ে রাখে যাতে অন্যদের দেখতে পায়। এরমধ্যে আলোটা জোরালো হয়, রাস্তার অন্য পারে একদিকে স্পষ্ট দেখা যায়, দীর্ঘ লম্বা হয়ে শেষ হয়ে গেছে, বিপরীতে রয়েছে ঘন ধূসর এক বাড়ি—এটা একটা হাসপাতাল—ধারাবাহিক জানালাগুলো সারি সারি, হঠাৎ থেমে গেছে; এখনও বৃষ্টি পড়ছে, কেবল একা একা উপলব্ধি করতে হয়, আক্ষরিকভাবে একটি একটি করে ফেলে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। বেশ ভালোরকম প্রাতরাশের ডিশগুলো সাজানো, কারণ গ্রেগরের বাবার কাছে প্রাতরাশটা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। তিনি বেশ সময় কাটান নানা ধরণের সংবাদপত্র পড়ে। বিপরীতে ডানদিকে টাঙানো গ্রেগরের নিজের ছবি, মিলিটারি সার্ভিসে থাকাকালীন, যেমন লেফটেন্যান্ট হিসেবে হাতে তরবারি, মুখে একটা নিশ্চিত হাসি, যেন তার পোশাককে শ্রদ্ধা করতে বলে এবং মিলিটারি আচরণকে সম্মান জানাতে আহ্বান করে। হলঘরের দরজাটা খোলা, সামনেটা যে কেউ দেখতে পারে সামনের দরজাটাও খোলা, নেমে গেছে, আর নেমে যাওয়া সিঁড়ির শুরুর অংশটুকু।

“বেশ,” গ্রেগর বলে, সব জেনেই সেই কেবল স্থৈর্য রেখেছে, “এখুনি আমি পোশাক পরে নিচ্ছি, স্যাম্পলগুলো গুছিয়ে নিয়ে, রওনা দিচ্ছি। আমাকে কেবল যেতে দিন, দেবেন? দেখবেন, স্যার, একগুঁয়ে নই আমি, আমি কাজ করতে চাই; ক্যানভাসারদের জীবনটা বেশ কষ্টকর, তবুও আমি এছাড়া বাঁচতে পারি না। স্যার আপনি কোথায় যাচ্ছেন? অফিসে? হ্যাঁ? আপনি যা দেখলেন তাই তো গিয়ে বলবেন? সাময়িকভাবে কেউ হয়তো অসমর্থ হতে পারে, সেই দিয়েই কেবল আগের কাজগুলো বিচার করা ঠিক নয়, এটা একটু সহ্য করে নিলে, পরে যখন তার অসুবিধা দূর হয়ে যাবে, দেখবেন সে নিশ্চয় আরও পরিশ্রম করতে পারবে, মনোযোগ দিতে পারবে। অনুগত হয়ে বসের সেবা করতে বাধ্য আমি আর আপনি ভালো করেই জানেন। এছাড়া আমাকে বাবা-মাকে ও বোনকে দেখতে হবে, ওদের চালাতে হবে। আমি খুব অসুবিধেয় আছি, দেখবেন আমি কিন্তু আবার এর থেকে বেরিয়ে আসব। আমার ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না যাতে ওদের ক্ষতি হয়। ফার্মে আমার সমর্থনে বলবেন। ক্যানভাসাররা তো ওখানে জনপ্রিয় নয়। আমি জানি। লোকেরা মনে করে ক্যানভাসাররা থলে ভরতি টাকা রোজগার করে আর তারা শুধু ভালো সময়ই কাটায়। তাদের ভুল ধারণা ভাঙাবার জন্য কেএনা বিশেষ কারণ নেই। কিন্তু আপনি স্যার অন্যান্য কর্মীদের চেয়ে একটু বেশি যুক্তিসঙ্গত আচরণ করুন, হ্যাঁ স্যার স্থির বিশ্বাস নিয়ে আমায় বলতে দিন, বস্, নিজে মালিক হয়ে তার কর্মচারীদের একজনের বিরুদ্ধে সহজেই যে রায় দিয়ে থাকেন তার চেয়ে আপনার বিবেচনা ভালো। আর আপনি তো ভালো করেই জানেন ক্যানভাসারদের প্রায় সারা বছর কোনো সময়ই অফিস চত্বরটায় দেখাই যায় না। আর তাই সহজেই নানা রকম কদর্য উক্তির, তাদের সম্পর্কে কুৎসা, ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয়। এ তাদের দুর্ভাগ্য। আর সেইসব সম্পর্কে প্রায়শই কিছুই জানেন না, যখন সে তার ঘোরা শেষ করে আসে ক্লান্ত হয়ে তখনই সে তাদের বিশ্রি ফলগুলোর যন্ত্রণা ভোগ করে, তার মূল কোথায় তা আর সে খুঁজে পায় না। স্যার, স্যার আমার সঙ্গে একটা কথা না-বলে যাবেন না। আমাকে দেখান অন্তত আপনি আমার সম্পর্কে ঠিক ভেবেছেন, কমপক্ষে তা ভাবার মতো আস্থা আপনার আছে।”

কিন্তু গ্রেগরের প্রথম কথাগুলোর সময় বড়বাবু এর মধ্যেই পিছিয়ে যায়, ঠোঁট দুটো ভাগ করা অর্থাৎ হাঁ করে কেবল ওর দিকে তাকিয়ে, কাঁধটা থরথর করে কাঁপছে। যখন গ্রেগর কথা বলছিল সেসময় বড়বাবু এক মুহূর্তও স্থির হয়ে দাঁড়ায়নি, গ্রেগরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে, কেবল এক ইঞ্চি করে করে চোরের মতো দরজার দিকে পিছিয়ে যেতে থাকে, যেন কোনো গোপন শপথ রয়েছে তার যে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে হলে চলে যায়, তারপর শেষ পদক্ষেপটা বসার ঘর থেকে হঠাৎই এমনভাবে টেনে নেয়, তা দেখলে মনে করবে তার পায়ের তলা পুড়িয়ে ফেলেছে। হলঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েই ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় সিঁড়ির দিকে, যেন কোনো অলৌকিক শক্তি তাকে ঠেলে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। 

গ্রেগর মনে করে ফার্মে একটা চরম ক্ষতি হতে পারে এ-রকম মনোভাব নিয়ে বড়বাবু চলে যাক, এভাবে তাকে যেতে দেওয়া যায় না। বাবা-মা কেউই এ ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে পারেনি। তাদের ধারণা হয়েছে এতদিন ধরে গ্রেগর ফার্মে কাজ করছে ফলে তার কাজ স্থায়ী হয়ে গেছে, এখানেই সে আজীবন কাজ করবে। এছাড়া তাদের বর্তমান অবস্থায় এত বেশি গ্রস্ত হয়ে পড়েছে তারা তাদের দূরদৃষ্টি পুরো লোপ করে ফেলেছে। তবুও গ্রেগরের বোধবুদ্ধি লোপ পায়নি এখনও। বড়বাবুকে অবশ্যই আটকে রাখতে হবে, ভেজাতে হবে ওর মনকে, ওকে বোঝাতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত ওর মন জয় করতে হবে। গ্রেগরের ভবিষ্যতের ওপর পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। যদি ওর বোন কেবল থাকত! ও একটু বুদ্ধিমান; ও কাঁদতে শুরু করেছে যখন নাকি গ্রেগরকে পিঠের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে থাকতে হচ্ছে। সন্দেহ নেই, বড়বাবু মেয়েদের দেখলে ভজে যায়, একটু পক্ষপাতিত্ব করে থাকে, বোন যা বলত বড়বাবু তা শুনত; ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, বড়বাবুকে হলঘরে এনে এই ভয়ংকর পরিবেশ কাটিয়ে ওকে বোঝাতে পারত। ও সেখানে নেই, গ্রেগরকেই সবকিছু সামলাতে হবে। সেটা মনে না করেই তখনও সে তার চলাফেরায় কতটা শক্তি রয়েছে, কতটা তার সামর্থ্য তার, এসব সম্পর্কে ধারণা না-করেই, তার কথার কতটা সম্ভবনা রয়েছে তার ধারণা না-করেই, বোধবুদ্ধির তোয়াক্কা না-করেই। এর ফল কী হতে পারে এসব গ্রাহ্যের ভেতর না-এনে, দরজার পাল্লা সরিয়ে সে খোলা জায়গা দিয়ে আস্তে আস্তে বড়বাবুর দিকে এগোতে থাকে, আর বড়বাবু এরই ভেতর কিম্ভূতভাবে দুহাত দিয়ে রেলিং ধরে নামছে। কিন্তু তখনি, কিছু ধরার জন্য অনুভব করে গ্রেগর, তার খুদে খুদে পা-গুলোতে অসহ্য রকম আর্ত-যন্ত্রণা শুরু হওয়ায় সে পড়ে যায়। আজকের সকালে প্রথমবারের অভিজ্ঞতায় সে শারীরিক আরাম বোধ করে, পড়ে যায় না, পায়ের তলায় বেশ শক্ত ভূমি; আনন্দের সঙ্গে সে দেখে, পা-গুলো পুরো অনুগত, যেদিকে সে চাইছে সে-দিকেই চালনা করতে পারা যাচ্ছে, আর বিশ্বাস করতে মন বলছে সে এখন তার অবস্থা থেকে মুক্ত। সব কষ্ট থেকে এখন সে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সে নিজেকে মেঝেতে দেখে, চলার জন্য একটা চাপা উদগ্রীব নিয়ে নড়ে ওঠে, মায়ের থেকে এখন বেশি দূরে নয়। বলা যায় মায়ের সামনেই, তাকে দেখে মনে হয় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, তাকে দেখে মা লাফিয়ে ওঠে, হাত-পা-আঙুল ছড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে, “বাঁচাও, দোহাই ঈশ্বর, সাহায্য করো,” মাথাটা নামায় যেন সে গ্রেগরকে আরও ভালো করে দেখার জন্য, আদতে ব্যাপারটা হলো উল্টো, বেখেয়ালে তিনি পেছনে সরে যেতে থাকেন, ভুলে যান তার পেছনে খাওয়ার টেবিলটা; যেন অন্যমনস্ক হয়ে টেবিলের ওপর বসলেন লাফিয়ে, এতে ধাক্কা খেলেন বিরাট কফির পাত্রটায়, তার পাশেই উলটে পড়ে যায়। কফি পড়ে, উপচে ওঠে, তা মেঝের কার্পেটের ওপর পড়ে ভেসে যায়।

“মা, মা” গ্রেগর নিচু গলায় বলে, তার দিকে তাকায়। সেই মুহূর্তে তার মন থেকে বড়বাবুর কথা পিছলে যায়। পরিবর্তে গড়িয়ে পড়া কফি দেখে তার চোয়াল দুটো না নড়িয়ে পারে না। তা দেখে মা আবার চিৎকার করে ওঠে, টেবিল থেকে পালায়, বাবার কোলে গিয়ে পড়ে। তিনি তাড়াতাড়ি জড়িয়ে ধরে বলা যায় লুফে নিলেন। কিন্তু গ্রেগরের এখন মা-বাবার ওপর সময় খরচ করার সময় নেই, এরই মধ্যে বড়বাবু সিঁড়ির ওপর চলে গেছে, রেলিংয়ের ওপর থুতনিটা রেখে শেষ বারের মতো পেছন ফিরে তাকায়। তাকে ধরার জন্য গ্রেগর লাফ দেয়, তাকে ধরতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নিয়েই এটা করে, বড়বাবু ওর মনোভাবটা ধরতে পেরে কয়েক ধাপ লাফিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। “আহ-খ” যে শব্দটা পালানোর সময় বড়বাবু করে তা এখনও পুরো সিঁড়িতে প্রতিধ্বনি হতে থাকে। 

গ্রেগরের বাবা এতক্ষণ শান্ত হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত বড়বাবুর পালানোতে মনে হয় সম্পূর্ণ মুষড়ে পড়লেন। বড়বাবুর পেছনে না-ছুটে বা গ্রেগরের ধেয়ে আসার দিকে নাগিয়ে তিনি বরং ডান হাতে বড়ো বাবুর চেয়ারের পেছনে ফেলে যাওয়া ছড়িটা তুললেন। সঙ্গে টুপি ও গ্রেটকোটটা টেবিল থেকে বড় একটা খবরের কাগজ বাঁ হাত দিয়ে সড়াৎ করে টেনে নিলেন। শুরু করলেন পা ঠুকতে, লাঠি আর কাগজটা তুলে গ্রেগরকে তাড়া করলেন ঘরে ঢোকার জন্য। গ্রেগরের কোনো কাতর অনুরোধ টিকল না, এমনকি তার কাকুতি-মিনতি কেউই বুঝতেও পারে না, যাই হোক শান্তভাবে তার বাবার কাছে মাথা নোওয়ায়, বাবা মেঝেতে আরও জোরে পা ঠুকতে থাকে। যেমন করে জন্তু-জানোয়ার তাড়ায় সেভাবে। বাবর পেছনে মা একটা জানালা দড়াম করে খুলে দেয়, এত ঠান্ডা সত্ত্বেও, দু-হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে হুমড়ি খেয়ে নিচু হলেন। রাস্তা থেকে একটা তীব্র-তীক্ষ্ম বাতাসসিঁড়ি-ঘরে এসে পড়ে, জানালার পর্দাগুলো উড়ে। টেবিলের ওপর খবরের কাগজগুলো পতপত করে ঝাপট দেয়, খোলা কাগজগুলো ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। নির্দয়ভাবে গ্রেগরের বাবা হিসহিস করে, চিৎকার করে, “শু শু” যেন কোনো জন্তু-জানোয়ার সে, এমন করে তাড়ায় গ্রেগরকে। পেছনে যাওয়ার অভ্যেস এখনও রপ্ত হয়ে ওঠেনি। তাকে ধীরে, অতি ধীরে যেতে হলো। অন্তত একবার যদি সে সুযোগ পেত তাহলে ঘরে যেতে পারত। কিন্তু বাবা এতটাই রেগে গেছে যে ভয় পেয়ে যায়, তার এই ধীরে ধীরে ঘোরার ফলে যেকোনো মুহূর্তে তার পিঠে বা মাথায় লাঠিটা এসে পড়তে পারে। গুরুতর আঘাত পেতে পারে। শেষ পর্যন্ত যাই হোক কোনো কিছুই পড়ল না, ভয়ংকর অবস্থায় সে দেখে যে পেছনে ফেরার সময় নিজে যেভাবে চলতে চায় তা তার আয়ত্তে নেই। তাই সব সময়ে বাবার ওপর এক ভীত সন্ত্রস্ত চোখ রাখতে হচ্ছে, কারণ তার কাঁধে কী জানি কখন লাঠিটা এসে পড়ে। যতটা সম্ভব দ্রুত চলতে পারে সেই চেষ্টাই করে চলেছে, তবে বাস্তবে কিন্তু তা ধীরে, অতি ধীরেই হচ্ছে। সম্ভবত ওর অনুগত হয়ে ফিরে যাওয়াটা ওর বাবা দেখছেন, কোনো কিছুতে তিনি বাড়াবাড়ি করলেন না, কেবল মাঝে মাঝে লাঠিটা উঁচিয়ে তার ফিরে যাওয়ায় সাহায্য করলেন। যদি তিনি কেবল ঐ অসহ্য ‘হিসহিস’ তাড়া দেওয়ার শব্দটা বন্ধ করতেন! এতে গ্রেগরের মাথাটা পুরো ঘুলিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সে সম্পূর্ণটা ঘুরে গেছে কিন্তু ঐ হিস-হিস শব্দটা তাকে এমনই অস্বস্তি দিচ্ছে যে সে আবার ভুল দিকে একটু ঘুরতে লাগল। কিন্তু অবশেষে যখন সৌভাগ্যবশত দরজার দিকে ঠিক চলল, দরজার সামনে হাজির হলো। দেখা গেল তার শরীরটা এত বেশি চওড়া যে যতটুকু খোলা রয়েছে সেখান দিয়ে ভেতরে ঢোকাটা অসম্ভব। অবশ্য তার বাবার এখন যা মেজাজ, দরজাটা বাকি অর্ধেকটা খুলে দেওয়ার আশাই করা যায় না। খুলে দিলে গ্রেগরের ঢোকার যথেষ্ট জায়গায় হতো। তার বাবা এখন যত তাড়াতাড়ি পারে গ্রেগরকে তাড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে চায়। অবস্থা অনুযায়ী গ্রেগরের যে একটু সময় দেওয়া দরকার সেই কষ্টটুকু সে করতে আর রাজি নয়। হতে পারে গ্রেগর এগিয়ে যাওয়ার যে ইচ্ছেটা রয়েছে তার জন্য অপেক্ষা করতে চায় না সেইজন্যই তার এত চ্যাঁচামেচি। যেন তার সামনে কোনো বাধা নেই। আর গ্রেগরের কাছে মনে হচ্ছিল এখন আর শুধু বাবার গলা মনে হচ্ছে না, সত্যিই এটা কোনো রসিকতা নয়। গ্রেগরের নিজেই নিজেকে ধাক্কা দিয়ে চলেছে—কী হতে পারে—দরজার ভেতর দিয়ে এক প্রবল চেষ্টা করে। শরীরের একটা দিকে উঠে এলো, তার পাঁজর, তার উরুতে ঘষা লেগে ছড়ে যায়, সাদা দরজায় লেগে যায় লাল রক্তের দাগ, শীঘ্রি আরও জোরে লাগে, ওর বাঁ-দিকটা, আদৌ সে নাড়তে পারে না, একদিকে তার পা-গুলো শূন্যে ছটফট করে কাঁপতে থাকে, অন্যপাশের পা-গুলো মেঝেতে পিষে গেল যন্ত্রণায়—পেছন থেকে বাবা জোরে ধাক্কা দেয়, বলা যায় একে সদ্গতি করলেন, আর ঘরের বেশ কিছুটা উড়ে পড়ে, মুক্তভাবে রক্ত ঝরতে থাকে। লাঠি দিয়ে দড়াম করে তার পেছন থেকে বন্ধ করে দেওয়া হলো। আর তারপর নেমে এলো নিঃসীম নিস্তব্ধতা।



২


তখন সন্ধের গোধূলি, গ্রেগর গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠে, ঘুমের চেয়েও তা ছিল অবসন্ন ঘোর। অবশ্যই তা বেশি সময় নেয়নি, নিজের সময় অনুযায়ীই সে জেগে উঠে, কারণ বিশ্রামটা যথেষ্ট ছিল আর ঘুমটা ভালোই হলো। কিন্তু তার মনে হলো যেন দ্রুত ও ক্ষণিকের পায়ের শব্দ, খুব সাবধানে দরজাটা খোলে আবার তখুনি বন্ধ করে দেয়, চলে যায় হলঘরের দিকে, তার ঘুম ভেঙে যায়। বিদ্যুতের আলোগুলো রাস্তায় ম্লান আলো ছড়িয়ে দিয়েছে, এখানে ওখানে সিলিংয়ের ওপরে এবং আসবাবপত্তরের মাথার ওপরেও, কিন্তু নিচে, যেখানে সে শুয়ে আছে, সে জায়গাটা অন্ধকার। ধীরে ধীরে, এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে তার অনুভবগুলো বুঝতে চেষ্টা করে। প্রথমে অভিজ্ঞতায় তার মনে হয় ভালো, খুশিই হলো সে। ওখানে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য দরজার দিকে ঠেলতে থাকে নিজের শরীরটা। তার বাঁ-দিকে লম্বা এক সারি, অস্বস্তিকর যন্ত্রণা অনুভব করে, আসলে তার দু-সারি পা, তার ওপর ভর করে চলতে থাকে। সকালবেলার ঘটনাগুলো থেকে তার একটি পায়ে বেশ ভালোরকম আঘাত পেয়েছে, তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, শুধুমাত্র একটি পা-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—আর সেটা অকারণ পেছনে ঝুলছে।

তার জন্য কী টেনে আনা হয়েছে, তা দেখার আগে দরজার কাছে পৌঁছে যায়: খাবারের গন্ধ পায়। একটা গামলা, টাটকা দুধে ভরা, তার ওপর ভাসছে সাদা রুটির ছোট ছোট কয়েকটা টুকরো। খুশিতে প্রায় হেসে ওঠে, সকালের চেয়ে এখন অনেক বেশি খিদে পেয়েছে। প্রায় মাথাটা চোখের সমান তুলে দুধে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে। তুলে নেয় মাথাটা, শুধু যে খাওয়াটা কষ্টের, তা নয় তার বাঁ-দিকের ব্যথাটা বেশ করতে থাকে—তার সমস্ত দেহের স্পন্দনের সাহায্যে সে কেবল খেতে পারে।—এ তার পছন্দ হলো না, দুধটাও পছন্দ হলো না, অথচ দুধ তার কি প্রিয় পানীয়, এ ব্যাপারটা বোন অবশ্য জানত সেজন্যই হয়তো বোন ওখানে রেখে গিয়েছে, একটা অনীহা তার ভেতর এলো, গামলা থেকে ফিরিয়ে নেয় মুখ, হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের মাঝে ফিরে যায়। 

দরজার ফেটে যাওয়া ফাঁক দিয়ে দেখতে পায় বসার ঘরে গ্যাসবাতি জ্বলছে; তবে এ-সময় তার বাবা একটা অভ্যেস করেছিলেন সন্ধের কাগজগুলো বেশ জোরে জোরে পড়ার, তার মাকে শোনাতেন, মাঝে মাঝে বোনও থাকত। এখন আর সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সম্ভবত বাবা এ-অভ্যেসটা ছেড়ে দিয়েছে, কথাবার্তায় বোন প্রায়শই বলত এবং চিঠিপত্রে তা লিখেছেও। চারপাশে এখন একই নিস্তব্ধতা, ফ্ল্যাট তো এখন নিশ্চয়ই জনশূন্য নয়। “কী শান্ত জীবন না আমাদের পরিবারে কাটছিল,” মনে মনে গ্রেগর বলে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে স্থির সে রয়েছে, এ-রকম সুন্দর ফ্ল্যাট তার বাবা-মা এবং বোনের জন্য করে দিতে পেরেছিল, এজন্য সে বেশ গর্ব অনুভব করে। যদি এই সকল শান্ত, আরাম, স্বস্তির জীবনযাপন আতঙ্কে শেষ হয়ে যায় কি? এ রকম চিন্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে গ্রেগর দিশাহীন হয়ে নড়াচড়া করতে থাকে, ঘরের এদিক-ওদিক বুকে হেঁটে চলতে থাকে। 

দীর্ঘ এ সন্ধেবেলায় একবার দরজাগুলোর একটা একটুর জন্য খোলা হয়েছিল, আবার তা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়, পরে অন্য দরজাটাও তাই করা হয়েছিল; কেউ হয়তো ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল। তারপর হয়তো ভেবেছে বন্ধ করে দেওয়াটাই ভালো। শোয়ার ঘরের সামনে গ্রেগর চুপ করে থাকে। ঠিক করে কে তাকে দেখতে এসেছিল, ইতস্তত মন নিয়ে, সেই আগন্তুকের দেখার জন্য যদি সে ভেতরে ঢোকে, বা ব্যক্তিটিই-বা কে হতে পারে তা জানার জন্য অপেক্ষা করে। দরজা আর খোলে না, বৃথাই সে অপেক্ষা করে। সকালবেলায়, যখন দরজাগুলো তালা লাগানো ছিল, তখন সবাই ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল, এখন সে একটা দরজা খোলা রেখেছে আর দিনের বেলায় অন্য দরজাটা খোলা রেখেছে, কেউই ভেতরে আসে না, এবং এমনকি অন্যদিকের দরজাগুলো সব বাইরের দিক দিয়ে তালা লাগানো।

বসার ঘরের গ্যাসের-বাতি নেভার আগে, রাত গভীর হলো, সহজেই গ্রেগর বলতে পারে তার বাবা-মা ও বোন এখনও জেগে রয়েছে, কারণ স্পষ্ট সে শোনে তারা পায়ে চলার শব্দ গোপন করে চলেছে আঙুলের আলতো ভরে। সম্ভবত কেউই তাকে দেখতে আসবে না, সকালের আগে তো নয়, সেটা নিশ্চিত, এই বিশ্রামের অবসরে যথেষ্ট সময় সে পারে গভীরভাবে ভাববার, কীভাবে জীবনটা পুনরায় নতুনভাবে শুরু করবে। কিন্তু ফাঁকা, উঁচু বিরাট ঘরটা, যেখানে মেঝেতে তাকে সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে হবে। শঙ্কায়-ভরা চেতনায় তাকে ভরে রেখেছে তা সে আগে বুঝতে পারেনি—এ ঘরটায় তো গত পাঁচ বছর ধরে অত্যন্ত নিজের ঘর বলে থেকে এসেছে—অর্ধেক অসচেতনতার প্রতিক্রিয়ায়, সামান্যতম লজ্জার অনুভব ছাড়াই সে সোফার তলায় সেধিয়ে দেয় নিজেকে। তখনই সে যেখানে আরামবোধ করে, যদিও তার পিঠটা সামান্য বাঁকানো। তার মাথাটা সে তুলতে পারে না, তার কেবল দুঃখ যে তার শরীরটা একটু চওড়া বেশি, তাই পুরো শরীরটা সোফার নিচে ঢোকাতে পারে না।

সারারাত সেখানে থাকে, হালকা ঘুম বা তন্দ্রায় কাটল তার বেশ কিছু সময়, খিদেয় চমকে উঠে, জেগে উঠে সে; কিছুটা সময় উদবিগ্নেœ কাটে, কিছুটা সময় অবান্তর আশার নকশা আঁকে, পরিনতি সবগুলি একই হয়, বর্তমানে নিচু হয়ে থাকতে হবে। ধরতে হবে ধৈর্য, যথাসাধ্য রাখতে হবে বিবেচনা, তার বর্তমান অবস্থার জন্য তার পরিবারকে অসুবিধের ভেতর কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, তাকে তো ওদের সাহায্য করতে হবে।

খুবই ভোর। প্রায় এখনও রাত। তার নতুন সিদ্ধান্তের শক্তিটা পরখ করার সুযোগ এলো গ্রেগরের, কারণ তার বোন পুরো পোশাকই পরেছে। হলঘরের দিকের দরজাটা খোলে এবং ভেতরে ঢোকে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখেনি। যখন সে তাকে সোফার নিচে দেখতে পায়—বেশ। তাকে তো কোথাও-না-কোথাও থাকতে হবে। সে তো আর উড়ে যেতে পারে না। পারে কি? বোন এত চমকে উঠে, তাকে কোনো সাহায্য না-করে দড়াম করে দরজা খোলে, সঙ্গে সঙ্গে আবার বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এরকম আচরণে দুঃখবোধ করে তখনি আবার দরজাটা খোলে। পায়ের আঙুলের ডগায় আলতো ভর দিয়ে ভেতরে আসে। যেন সে কোনো পঙ্গুকে অথবা অচেনা কাউকে দেখছে। সোফার অত্যন্ত কিনারের দিকটায় তার মাথাটা গ্রেগর ঠেলে দেয় এবং তার বোনকে দেখতে থাকে। সে কী দেখেছে, সে দুধটাকে খায়নি, তার যে খিদে কম ছিল তা নয়, তার কাছে পছন্দমতো বা রোচে এমন অন্য ধরণের খাবার কি এনেছে? যদি সে এনে না-থাকে নিজের বোধ অনুসারে, যদিও সে সোফার নিচে থেকে খুব ক্ষুধার্ত বোধ করছে, তার পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে নিজেকে। কিছু খাবারের জন্য কাকুতি করে। কিন্তু তার বোন তখুনি লক্ষ করে। অবাক হয়ে দেখে, গামলাটা এখনও ভরা রয়েছে, গামলাটার চারপাশে সামান্য দুধ ছলকে পড়েছে মাত্র। তখনই সে তুলে নেয়, যদিও তা খালি হাতে নয়। কাপড় দিয়ে ধরে গামলাটা এবং সেটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। তীব্রভাবে গ্রেগর জানতে কৌতুহলী থাকে যে তার বোন এর বদলে কী আনে। এ-নিয়ে তার নানা জল্পনা চলতে থাকে। তবু প্রকৃতপক্ষে এরপরে সে কী আনে, তার সুকুমার মনে, সে কিছুই অনুমান করতে পারে না। দেখতে চায় কী সে পছন্দ করে, সে একটা পুরনো খবরের কাগজে তার সকল ধরণের পছন্দের খাবার গ্রেগরের জন্য নিয়ে এলো। তাতে রয়েছে পুরনো, বাসি সবজি, গত রাতের খাবারের হাড়, জমে যাওয়া ঝোল, গাজর, শালগম, এক টুকরো চিজ দুদিন আগে হলে গ্রেগর এই অখাদ্য বলে ফেলে দিত, শুকনো রুটির রোল, মাখন দেওয়া রোল। মাখন মাখানো নুন দেওয়া রোল। এসব ছাড়া, একই গামলা যেটায় দুধ দেওয়া হয়েছিল সেটাতে জল ঢেলে দেয় অর্থাৎ ঐ গামলাটা একান্তভাবে তার ব্যবহারের জন্য রাখা। তার সামনে গ্রেগর খেতে নাও বেরোতে পারে। চালাকি করে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, এমনকি তালাও লাগিয়ে দেয়, তাকে বোঝাতে চাইল সে যেমন খুশি সহজভাবে তার খাবারটা খেতে পারে। গ্রেগরের পাগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় খাবারের দিকে। পুরো সেরে গেছে ওর ক্ষতগুলো, তার কোনো যন্ত্রণা, অসুবিধে হচ্ছে না, এতে তাকে অবাকই করেছে, তার মনে পড়ে গেল মাসখানেক আগে ছুরিতে একটা আঙুল কিছুটা কেটে গিয়েছিল। গতকালের আগেরদিনও সে যন্ত্রনাটা ছিল। এখন নেই। আমার কি এখন অনুভূতিটা কমে গেল? ভাবে সে। আর সে চিজটা লোভীর মতো চুষতে থাকে আর সর্বোপরি যা কিছু খাওবার মতো রয়েছে তার প্রতি ওর আকর্ষণ বেড়ে যায় বেশ। একটার-পর-একটা, তার চোখে ঝরে পড়ে খুশির জল। তৃপ্তি বা আনন্দ যাই বলা হোক-না-কেন, সে বেশ তাড়াতাড়ি শেষ করে চিজ, সবজী, সুপ, অপরদিকে টাটকা তাজা খাবারগুলোর প্রতি ওর কোনো ঝোঁক ছিল না, সেইসব গন্ধও সে সহ্য করতে পারছিল না, আর যেগুলো খেতে ইচ্ছে করছিল সেগুলো একটু দূরে টেনে নিয়ে যায়। অনেকক্ষণ আগেই তার খাওয়া শেষ হয়ে যায়, অলসভাবে সেখানেই সে শুয়ে থাকে। ধীরে ধীরে তার বোন চাবিটা ঘোরায়, তার মানে তাকে পিছিয়ে যেতে হবে। তাকে তখনই উঠতে হলো। যদিও তখন সে তন্দ্রাতে আচ্ছন্ন ছিল, তাড়াতাড়ি সে আবার সোফার নিচে চলে যায়। সোফার নিচে থাকাটা তার আত্মসংযমেরই পরিচয়। এটা সে মেনেও নিয়েছে, অর্থাৎ যে অল্প সময়টা বোন ঘরের ভেতর ছিল, এই বিশাল রকম খাবারটা খেয়ে অল্পবিস্তর ফুলেও উঠেছে, শরীরটা বেশ আড়ষ্ট বোধ করছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। সামান্য দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা তাকে কষ্ট দেয়। তার মাথা থেকে চোখ দুটো অল্প বেরিয়ে আসে, যেন সে দেখছে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য তার বোন ঝেঁটা দিয়ে ঝাঁট দিয়ে সব এক জায়গায় জড়ো করছে। শুধু যা সে খেয়েছে তার টুকরো-টাকরা তাই নয় যা সে ছোঁয়ওনি সেগুলোও। যেন সেগুলো আর কারও প্রয়োজন নেই, একটা ঝুড়িতে সেগুলো বেলচা জাতীয় কিছু দিয়ে তাড়াতাড়ি তোলে, কাঠের একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে নিয়ে যায়। পেছন ফিরে তাকায়ও না যখন সোফার নিচ থেকে বেরোয়, টেনে টেনে বের করে এবং হাঁফাতে থাকে সে।

এইভাবেই গ্রেগরের খাওয়া দাওয়া চলতে থাকে, একবার এক বেশ ভোরে, তখনও তার বাবা-মা ও কাজের মেয়েটি ঘুমোচ্ছে, দ্বিতীয়বার তাদের সকলে দুপুরের খাবার খাওয়া শেষ করে। তার বাবা-মা সামান্য গড়িয়ে নেয়। কাজের মেয়েটিকে কোনো অজুহাতে বা কাজে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তার বোনই এ কাজটা করত। অবশ্য ওরা কেউই চাইত না সে না খেয়ে মরে যাক, কোনো গুজব অপেক্ষা তার খাওয়া-দাওয়াটা বিশেষ করে কেউ দেখুক, বিশেষ করে বোন চাইত না। চাইত না তাকে নিয়ে কেউ ভাবনা চিন্তায় জড়িয়ে পড়ুক। তা যেমন চলছে তা চলুক, এ সহ্য করে শান্ত থাকুক তারা। 

সেই প্রথম সকালে ডাক্তার ও তালা-মিস্ত্রির থেকে কীভাবে ছাড় পেল তা অবশ্য গ্রেগর এখনও জানতে পারেনি, কারণ সেদিন থেকেই সে যা বলেছে তা কেউই আদৌ বোঝেনি। তাতে কারও কোনও প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়নি, এমনকী তার বোনেরও নয়। তবে তারা যে বলেছে তা সে বুঝেছে। তাই তার বোন যখন ঘরে ঢুকে মাঝে সাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেলত, মাঝে মাঝে সেইন্টদের (সন্ত) কাছে প্রার্থনা করত। পরে যখন সে অবস্থায় অল্পসল্প অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। অবশ্য কখনওই সে পুরো অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। মাঝে মাঝে সে মন্তব্য ছুড়ে দিত, সেগুলোর অর্থ হয়ে উঠত বা করা যেত। “ভালোই, আজকের খাবারটা ও পছন্দ করেছে,” সে বলত যখন গ্রেগর তার খাবারটা বেশ চেটেপুটে খেত। আর যখন সে খেতো না, এটা ক্রমশই বেড়ে যেতে থাকে, তা প্রায়ই এ-রকম হতে থাকে। বিষণ্নভাবে সে বলত, “আবার সবই পড়ে রয়েছে।”

যদিও গ্রেগর সরাসরি কোনো খবরই পেতো না, বরং পাশের ঘর থেকে অনেক খবরই ভেসে আসত, যখন কোনো কথা শোনার মতো হতো, সে ছুটে যেত সেই দরজার দিকে, দরজায় পুরো শরীরটা চেপে রাখত। বিশেষ করে প্রথম কয়েকদিন এমন কোনো কথা থাকত না যার ভেতর তাকে নিয়ে হয়নি, এমনকি পরোক্ষভাবে তা হতো। কারণ পুরো দুটো দিন খাবার সময় তাকে নিয়ে পরিবারে আলোচনা হতো, কী করা উচিত, খাবার চলাকালীনও একই ব্যাপার আলোচনা হতো, কারণ সব সময় পরিবারের দুজন অবশ্যই বাড়িতে থাকত, কেউই ফ্ল্যাটে একা থাকতে চাইত না, খালি রেখে যাওয়া তো ভাবাই যায় না। এইসব দিনে প্রথম কয়েকদিন বাড়ির রাঁধুনিটির কাছে ততটা স্পষ্ট ছিল না, বাড়িতে কী হয়েছে কেমন করে হয়েছে তা কতটা জেনেছে কে জানে—হাঁটু গেড়ে তার মায়ের কাছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাতর অনুরোধ করে, তার চলে যাওয়ার পনেরো মিনিট পর, যাওয়ার সময় চোখেতে জল এনে, এই যে তার প্রতি সদয় হওয়ায় ধন্যবাদ জানায়। তার যে এত উপকার করেছে তা আর কখনও সে পায়নি, উচ্চারণ না করে শপথ নেয় যা কিছু ঘটেছে তার একটি কথাও কাউকে সে বলবে না।

এখন গ্রেগরের বোনকেও রাঁধতে হয়। তার মাকে সাহায্য করে; তবে এ সত্য, বেশি কিছু রাঁধতে হয় না, কারণ তারা খুবই কম খাওয়া দাওয়া করে। গ্রেগর প্রায়ই শোনে পরিবারের কেউ-না-কেউ অপরকে খেতে অনুরোধ করছে, কিন্তু কোনো উত্তর শুনতে পেতো না তবে: “ধন্যবাদ, আমার যা নেওয়ার তা তো নিয়েছি,” অথবা এমনতর কোনো কথা। সম্ভবত ওরা কেউ কিছু পান করত না। তার বোন আবার কখনও সখনও বাবাকে জিজ্ঞেস করত বিয়ার খাবে কিনা, এবং উঠে যেত। নিজেই নিয়ে আসত, সেটা পরিবেশ আন্তরিক করে তোলার জন্য, যখন কোনও উত্তর করতেন না বাবা, কোনো কিছু যেন মনে না করে, বাড়ির কাজের মেয়েটিকে দিয়ে আনিয়ে নিত। তিনি হয়তো জবাব দিতেন, তবে ঘুরিয়ে বলতেন ‘না’। আর এ-সম্পর্কে আর কিছুই শোনা যেত না।

সেই প্রথম দিন, যেদিন গ্রেগরের বাবা পারিবারিক আর্থিক অবস্থাটা তাদের বিস্তারিত বললেন, তার মা ও তার বোন, উভয়কেই এসব জানালেন। মাঝে মাঝে টেবিল থেকে বাবা উঠে কিছু রশিদ বা অন্যসব মেমোরান্ডামগুলো ছোট সিন্দুকে যা পেলেন নিয়ে এলেন, পাঁচ বছর আগে তার ব্যবসাটা মার খেয়েছে, এসব কাগজপত্তর তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন। জবর তালাটা খোলার শব্দ যে কেউ শুনতে পেতো, হতো কাগজপত্তরের ঝরঝর শব্দ। আবার তিনি সেসব বন্ধ করে দেন। তার বন্দিত্বের দিনগুলোর ভেতর তার বাবার এই খবর তাকে খুবই আনন্দ দেয়। তার মনে হয় বাবার ব্যবসায় সম্ভবত আর টাকাপয়সা কিছু নেই, বাবাও এ ব্যাপারে কোনো কিছু বলেনি। অবশ্য সে-ও কখনও সরাসরি জিজ্ঞেস করেনি। তাদের এই যে চরম বিপদের সময়ে, তাদের ব্যবসাটা পুরো ভেঙে পড়ে। তার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, তাদের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য যতটা পারা যায় সেই ইচ্ছেটা গ্রেগরের ছিল। আর তাই অপরিচিত একটা বাজে কাজে লেগে যেতে হলো, নিতে হলো প্রায় রাতারাতি কেরানির চাকরি থেকে বাণিজ্যিক ক্যানভাসারের কাজ। এতে বেশ টাকা রোজগারের সুযোগ রয়েছে, আর সাফল্য মানে গোল গোল মুদ্রায় অনুবাদ হওয়ায়, এই টাকায় সে টেবিলে শুয়ে থাকতে পারে, ব্যাপারটা তার কাছে অবাক হওয়ার মতো, তাদের পরিবারে সুখ এলো। হাসি ফুটে উঠল সবার মুখে। সময়টা ভালো চলছিল। কখনও কোনও অভিযোগ শোনেনি। তবে আগেকার সেই উজ্জ্বল দিনগুলো ফিরে আর আসেনি। যদিও পরে গ্রেগর এত টাকা রোজগার করেছে, পুরো পরিবারের সকল খরচপাতি বহন করতে সমর্থ হয়, করেও ছিল। তারা সহজভাবেই তাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, পরিবারের সবাই এবং গ্রেগর নিজেও। খুশি মনেই গ্রেগর টাকা দি, ওরাও নিত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে, তবে আবার এও ব্যাপার এরজন্য বিশেষ কোনো খুশি দেখা যায়নি। উষ্ণ অনুভূতিও নয়। তার বোনের সঙ্গে বেশ হৃদ্যতাই ছিল। তার সঙ্গেই, হয়েছিল একটা গোপন চুক্তি। তার বোন সঙ্গীত ভালোবাসে, যদিও তার এ-ব্যাপারে কোন স্পৃহা ছিল না, কিন্তু ওর বোন বেহালা ভালোই রপ্ত করেছিল, পরের বছরে তাকে কনজাভেটিরিয়মে বাজনা শেখার জন্য পাঠানো হবে, যদিও তার জন্য বেশ বড় খরচপাতি হবে, যা হোক ওটা অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থা করে ফেলবে। সে যখন বাড়িতে অল্প সময়ের জন্য আসত, ঐ কনজাভেটিরিয়মের কথা বোনের সঙ্গে অবশ্যই চলে আসত, কিন্তু সব সময়ই যেন এক সুন্দর স্বপ্নের মতো, এ আর বাস্তবে রূপ পেল না, এ আর সত্য হলো না। বাবা-মা দুজনেই এই সরল ইচ্ছেকে নিরুৎসাহ করতেন; তবুও গ্রেগর দৃঢ়ভাবে মনস্থির করে ফেলে এ-নিয়ে, খ্রিস্টমাস ডে-তে বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সারবে এর ঘোষণাপর্ব। 

এমনই ছিল ভাবনা চিন্তাগুলো। তার বর্তমান অবস্থায় তা পুরো ফালতু, দরজায় সেঁটে থেকে শুনতে চাইত, কখনও কখনও উৎসাহ হারিয়ে ফেলত। অবহেলার দরুণ মাথাটা ঠুকে যেত দরজায়। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার সোজা হয়ে উঠত। এই সামান্য আওয়াজই পাশের ঘর থেকে শোনা যেত, তখনি পাশের ঘরের কথা বন্ধ হয়ে যেত। “ও এখন কী করছে?” বাবা বলে উঠত সে সময়, অবশ্যই দরজার দিকে মুখ রেখে। তারপরই তাদের যা আলোচনা চলছিল সেটা আবার শুরু হয়ে যেত।

যতই জানার সেটুকু গ্রেগর জানতে পেরেছে। কারণ তার বাবা বোঝার জন্য সেটা আবার বলতে চাইতেন, বলতেন কারণ কিছুটা তার অভিজ্ঞতা রয়েছে তা অনেক সময় ধরে বলতেন। কিছুটা কারণ তার মা চট করে সেসব বুঝতে পারতেন না বলে—যে পরিমান টাকা ব্যবসায় ঢালা হয়েছিল, সেটা সত্য যে তা খুবই অল্প টাকা। তাদের দুর্ভাগ্যের ধাক্কাতেও কিছুটা রক্ষা পেয়েছে, এমনকি কিছুটা বেড়ে গেছে, এর কারণ ডিভিডেন্ডগুলোতে এখনও হাত পড়েনি। এছাড়া যে টাকা গ্রেগর প্রতিমাসে ঘরে আনত—তার সামান্য টাকাই সে নিজের জন্য খরচ করত—সে টাকা সব খরচ হয়ে যায়নি, অতএব কিছু টাকা তো জমে গেছে, সে-ও তো ছোটখাটো মূলধন হয়েছে। দরজার পেছন থেকে আগ্রহভরে গ্রেগর মাথা নাড়ায়, এই আশাতীত মিতব্যয় ও দূরদৃষ্টির জন্য আনন্দ পায়। এ-কথা সত্যি। এ টাকা দিয়ে তার বাবার দেনা কিছুটা সে মিটিয়ে দিতে পারে, তাতে তার চাকরি ছাড়ার দিনটাকে কিছুটা এগিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সন্দেহ নেই তার বাবা যেমন করে ব্যবস্থাটা করেছেন তা আরও ভালোই বলতে হবে।

কিন্তু মূলধনটা তেমন বেশি বলা যায় না, তার সুদে তাদের সংসারটা অক্লেশে ভালো মতেচলে যাবে। সম্ভবত এক বছর, বড়োজোর দু-বছর চলে যেতে পারে। সময়-অসময়ের জন্যও তো টাকা রাখতে হবে। তাই এ-টাকাতে হাত দেওয়া চলবে না। বাবার স্বাস্থ্য এখনও ভালোই বলতে হবে, যদিও তিনি বুড়ো হয়েছেন। গত পাঁচ বছর ধরে তো উনি কোনো কাজ করেননি, তার কাছ থেকে আশাও করা যায় না। অবসরের প্রথম বছরে তো কঠোর পরিশ্রম আর কী করেছেন তার এই ব্যর্থ জীবনে। তিনি বরং কিছুটা মুটিয়ে গেছেন, আর স্লথগতি হয়ে পড়েছেন। আর গ্রেগরের বুড়ো-মা তিনিই-বা রোজগার করবেন কী করে, তার তো আবার হাঁফানি, ফ্ল্যাটে যখন হাঁটাহাটি করেন তাতেই তার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে ওঠে, তাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য জানালার পাশে সোফায় শুইয়ে রাখা হয়। আর গ্রাসাচ্ছদনের জন্য বোন বা কী করে রোজগার করবে? সে তো এখন সতেরো বছরের শিশু। ওর কাছে জীবনটা এখন বড়োই মনোময়, সুন্দর পোশাক-টোশাক পরে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবে। আর কাটাবে লম্বা ঘুম দিয়ে। আর মাঝে মাঝে টুকিটাকি বাড়ির কাজে সাহায্য করবে। কখনো-সখনো এদিক-ওদিক ঘুরবে। আর সময় সুযোগে বেহালার ছড় টেনে কাটাবে। প্রথমেই টাকা রোজগারের কথা উঠতেই, সে লজ্জায় দুঃখে এতই উত্তপ্ত হয়ে উঠে, সে দরজাটা ছেড়ে দেয়, ছুড়ে দেয় নিজেকে চামড়ার ঠান্ডা সোফার ওপর।

আদৌ না ঘুমিয়ে সারারাত ধরে সোফায় প্রায়ই সে শুয়ে থাকে। এপাশ-ওপাশ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায় চামড়ার সোফায়। অথবা অনেক চেষ্টা করে চেয়ারটা ঠেলে ঠেলে জানালার কাছে নিয়ে যায় সে, হামাগুড়ি দিয়ে বসে জানালার গোবরাটে, ঠেস দেয় চেয়ারে, আর ঝুঁকে পড়ে জানালার পাল্লার দিকে। সে সব সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, তাতে অবশ্যই কিছু স্মৃতিচারণের ভেতর দিয়ে এক মুক্তির আস্বাদ পেতো। আসলে দিনের-পর-দিন এমন অবস্থা হতে থাকে যে ক্রমশ সামান্য দূরের জিনিসও আবছা দেখতে থাকে। তার চোখের সামনে রাস্তা পেরিয়ে যে হাসপাতালটি রয়েছে। সেই রাস্তাটিতে সে যা কিছু দেখে বিরক্তি আসত, ঘৃণা আসত, এখন সেসব দৃষ্টির বাইরে, তা এখনও শান্ত। তবু তো এ শহুরে রাস্তা, সেই শার্লট স্ট্রিটে বাস করত, এখন যেন তা আর জানে না, বিশ্বাস করতে পারে তার জানালার সামনে এক-নির্জন জনশূন্য এক-পরিত্যক্ত শহর, এই শহরে রয়েছে ধূসর আকাশ ধূসর ভূমি, মিলে-মিশে পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। তবে তার বোন তো বেশ বুদ্ধি ধরে। তার প্রয়োজন দুবার লক্ষ করে বোঝা যে চেয়ারটা জানালার পাশে রয়েছে। ঘরটা ঝাঁট দিয়ে আবার চেয়ারটা ওখানেই রেখে যায়। আর এমনকি ভেতরের পাল্লাগুলো খুড়ে রেখে যায়। 

যদি সে তার বোনের সঙ্গে কথা বলতে পারত, তার জন্য সে যা কিছু করছে, ধন্যবাদ জানাত, তার যে দেখভাল তা আরও ভালোভাবে মেনে নিতে পারত, এ তো বলতে হয় কখনও সখনও তা উৎপীড়ন হয়ে ওঠে। সে নিশ্চয়ই যতটা সম্ভব ভালো করতে চাইত তবে এও তো সত্য ওর অনেক ব্যাপারও মেনে নেওয়া যেত না। যতই সময় চলতে থাকে সে অবশ্য সফল হতে থাকে, আরও হ্যাঁ আরও আর গ্রেগরের কাছেও সময় সবকিছুই খুলে দেয় স্পষ্ট করে। এভাবে এসে বোন তাকে কষ্টই দিত। ঘরে ঢুকেছে কি ঢোকেনি সে ছুটে গিয়ে জানালার কাছে ছুটে যেত, দরজা বন্ধ করার দিকে কোনো সময়ই দিত না। আর গ্রেগরের ঘরের দৃশ্য আর কারও চোখে না পড়ে। এজন্য সে যথেষ্ট সতর্ক হয়ে থাকত। মনে হতো তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে, জানালার পাল্লাগুলো খুলে দিত, জানালার সামনে শুকনো ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিত কিছু সময়। তার এই হুটোপুটি ঝাপট গ্রেগরকে দুবার উলোটপালট করত। সারা-সময় সোফার নিচে গুটিসুঁটি হয়ে কাঁদতে থাকত। এ ভালোই জানত-তার বোন যদি জানত জানালা না-খুলে এ-ঘরে থাকত তবে তার পক্ষে থাকা সম্ভব হতো, তবে কখনও তাকে বিরক্ত করত না।

গ্রেগরের রূপান্তরিত হওয়ার এক মাস পরে, একবার, তখন তাকে দেখে শিউরে উঠার তেমন কোনো কারণ ছিল না, বোন আগের দিনের চেয়ে একটু আগেই আসে। দেখে সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে, স্থির, এমনভাবে রয়েছে যেন মনে হয় ভূত। সে যে ভেতরে আদৌ আসেনি তার জন্য গ্রেগর বিস্মিত হয়নি, কারণ তখনই সে জানালাটা খুলতে পারেনি যেহেতু সে সেখানে রয়েছে, সে যে কেবল পেছনে চলে গেল তাই নয়, ভয়ে সে লাফিয়ে সরে যায় এবং দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়; একজন অপরিচিত হলে না-হয় ভাবতে পারত। সে শুয়ে অপেক্ষা করছে, ওৎ পেতে রয়েছে কামড়ানোর জন্য। অবশ্য তখনই সে নিজেকে সোফার নিচে লুকিয়ে ফেলে, তাকে সেই দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ-না তার বোন আবার আসে, তাকে আগের মতো আর স্বাভাবিক মনে হলো না। এ-থেকে সে বুঝতে পারে এখনও তাকে দেখলে তা কী রকম গা ঘিনঘিন করে উঠে ওর বোনের, তার দেহের অল্প অংশ দেখেও যেন তাকে পালাতে না হয় সেজন্য কোনো মূল্যেই তা দেখতে হবে, কী প্রয়াস সে নিতে পারে। সোফার নিচে কাত হয়ে থাকতে হয়। তার জন্য একদিন সে চার ঘণ্টার চেষ্টায় একটা কাগজের শিট সোফা থেকে নিয়ে পিঠে জড়ায় যাতে সে নিজেকে পুরোটা আড়াল করে সোফার নিচে থাকতে পারে, এতে তার বোন ঝুঁকেও তাকে দেখতে পাবে না। এ শিটটা কি বোনের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হলো, এটা সে আবার নিশ্চয় খুলে ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখবে, স্পষ্টতই এই আড়াল করা এবং নিজেকে চৌহদ্দিতে আটকে রেখে সম্ভবত গ্রেগরের আরাম বা শান্তি হয়নি। তবে ওটা যেখানে ছিল বোন সেখানেই রেখে দেয়। বরং গ্রেগর কল্পনা করে তার বোনের চোখে কৃতজ্ঞতার চাহনি সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটু মাথা তুলে দেখে এই নতুন ব্যবস্থায় বোন কীভাবে নিল। 

প্রথম পনের দিন তার মা-বাবা গ্রেগরের ঘরে ঢোকার কথা ভাবতেই পারেনি, আর সে প্রায়ই শুনত বাবা-মা দুজনেই বোনের কাজকম্মোর খুবই প্রশংসা করতেন, এর আগে তো ওরা প্রায়শই তাকে বকাঝকা করতেন। মনে করতেন ও একটা অপদার্থ অলস মেয়ে। কিন্তু এখন, প্রায়ই দুজনে দরজার বাইরে অপেক্ষা করতেন, বাবা-মা উভয়েই, যখন তার বোন ঘরটা পরিষ্কার করত। যখন সে বেরিয়ে আসত, তাদের কাছে গ্রেগর সম্পর্কে যা যা দেখে এসেছে, তা বলতে হতো, গ্রেগর কী খেয়েছে, এই সময়ে ওর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছে, তার কী অবস্থার কোনোরকম উন্নতি হয়েছে। তার মা গ্রেগরকে দেখতে চাইত, কিন্তু তার বাবা ও বোন বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে ভেতরে যেতে দিতে চাইত না। অতি মনোযোগের সঙ্গে গ্রেগর সেইসব শুনত এবং সেটা যে ঠিক তা মনে করত। যাই হোক তাদের জোরের সঙ্গে পেরে উঠতেন না মা। তখন জোর চিৎকার করে বলতেন: “আমাকে গ্রেগরের কাছে যেতে দাও, ও আমার হতভাগ্য ছেলে! তোমরা বুঝতে পারছ না-কেন। আমাকে ওর কাছে যেতেই হবে।” গ্রেগর ভাবে মা ভেতরে এলে ভালোই হয়, তবে প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে অন্তত একবার। তিনি সবকিছু ভালোই বুঝবেন। অন্তত বোনের চেয়ে অনেক বেশি ভালো হবে। আর বোন তো অনেক ছোট, ও আর কতটাই-বা পারে। ওর ছেলেমানুষি ভাবনায় এমন একটা কঠিন কাজ সামলানো কী সম্ভব!

গ্রেগরের মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হতো, শীঘ্রই সে মনোবাসনা পূর্ণ হলো। দিনেরবেলায় সে জানালায় এনে নিজেকে দেখা দিত না, তার বাবা-মার কথা ভেবেই। সে বেশিদূর বুকে হেঁটে চলাফেরা করতে পারত না, ঘরের মেঝেতে জায়গা খুবই অল্প, কয়েক গজ মাত্র, রাতে চুপচাপ শুয়ে কাটাতে ভালো লাগত না, প্রথমে তার খাবার সম্পর্কে অনীহা আসে, না-খেয়েই থাকে, তাই কেবল আনন্দ পাওয়ার জন্য সে কেবল দেয়ালে, ভেতরের ছাদে গুড়িগুড়ি করে সেঁটে চলার অভ্যেস রপ্ত করে। ছাদের গায়ে ঝুলে থাকতে ভালোই লাগে, মেঝেতে শুয়ে থাকার চেয়ে বেশি ভালো লাগত, খুশি ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে, দোল খায়, হালকাভাবে ঝুলে থাকে। এই যে তার সাময়িক অবসরের এই আত্মনিমগ্নতা প্রায় আশীর্ব্বাদের মতো, তার কাছে তো এক-বিস্ময়ের মতো, সে নিজেকে ছেড়ে দেয়, পড়ে ধপাস করে মেঝের ওপর। যেহেতু তার শরীরটা আগের চেয়ে অনেক বেশি আয়ত্তের ভেতর। এত উঁচু থেকে পড়া সত্ত্বেও তেমন ক্ষতি কিছু হলো না। এই নতুন খেয়াল দেখে তখুনি তার বোন বলে ওঠে গ্রেগর দেখবে যেখান দিয়ে তুমি বুকে হেঁটে গিয়েছ সেইসব জায়গা একটা চটচটে দাগ হয়ে যায়। গ্রেগর যেন আরেকটু জায়গা বেশি পায়, একথা মনে হলো তার। যতটা সম্ভব জায়গা করা যায় এই উদ্দেশ্যে, ঘরের যত আসবাবপত্তর সরিয়ে দেয়, সিন্দুক, এমনকি লেখার টেবিলটা পর্যন্ত। যতটা সে নিজে পারে ততটা জায়গা করে দেয়, বাবাকে আর সাহায্যের জন্য ডাকতে সাহস পেল না, আর কাজের মেয়েটি, ষোলো বছর মাত্র বয়স ওর; রাঁধুনি কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে ও সাহস করে থেকে গেছে, তাকে সাহায্য করার জন্য ডাকা যায় না, কারণ সে আগেই একটা বিশেষ সুবিধে চেয়ে নিয়েছে, রান্নাঘরের তালাটা বন্ধ থাকবে। কেবলমাত্র দরকার হলে তা খোলা হবে। তাই বাবা যখন বাইরে থাকবে মাকে কাজে লাগানো ছাড়া আর উপায় রইল না। আর বুড়ো মহিলা এলো। আনন্দের উৎসাহের বিস্ময়ময়তা। গ্রেগরের দরজা কাছেই এসে মিলিয়ে যায়। গ্রেগরের বোন অবশ্য প্রথমে ঘরে ঢোকে, তার মা ঢোকার আগে দেখে নেয় সব ঠিকঠাক আছে কিনা। কাগজটা তাড়াতাড়ি নামিয়ে নেয়, কুচকে থাকে কাগজটা দিয়ে ঢেকে রাখে, দেখে যেন মনে হয় আচমকা এটা সোফায় এসে পড়েছে, এর নিচ থেকে উঁকি আর মারে না, যদিও তার মাকে দেখার দারুণ ইচ্ছে, মা যে এই ব্যাপারে এখানে এসেছে তাতেই সে দারুণ খুশি, অবশেষে মা তো এলো! “ভেতরে এসো, ওকে দেখা যাচ্ছে না।” বোন বলে, অবশ্যই মার হাত ধরে সেই আগে আগে আসে। বিশাল পুরনো সিন্দুকটা সরানোর জন্য দুজন মহিলা যে পরিশ্রম করছে সেটা গ্রেগর শুনতে পায়। বোনই অপেক্ষাকৃত বেশি পরিশ্রম করবে এটাই স্বাভাবিক, মায়ের ভর্ৎসনা সে শুনতে পায় না তবে সে ভয় পাচ্ছিল এত টানাটানিতে আবার চোট না-লাগে। বেশ সময় লাগে। কম করে পনেরো মিনিট ধরে সিন্দুকটা টানাটানি করার পর মা বললেন, এটা যেখানেই আছে সেখানেই থাকুক, প্রথম কারণ এটা বেশ ভারী আর তোমার বাবা না এলে সরানো যাবে না। আর ঘরের মাঝখানে আনলে গ্রেগরের চলাফেরায় অসুবিধে হবে। আর আসবাবপত্তর দ্বিতীয় কোনো জায়গায় রাখলেই যে গ্রেগরের সুবিধে হবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। দেওয়ালটা খালি দেখে মনটা বেশ ভার হয়ে যায়, ভাবে গ্রেগরের তাই হবে, মনে হলে এতদিন ধরে এইসব আসবাবপত্তর সে ব্যবহার করে আসছে, এসব না-থাকলে সে যে অবহেলিত অনুভব করতে পারে। নিচু গলায় বলে, “এ-মনে হবে না?” সব সময় তিনি ফিস ফিস করে কথা বলেন যেন গ্রেগর শুনতে না পায়, সত্যি কথা কী তিনি তো জানেন না গ্রেগর কোথায়, তিনি মনে করছেন তার কথা গ্রেগর বুঝতে পারে না—“সবকিছু বের করে নিয়ে গেলে এ-মনে হবে না-যেন আমরা দেখছি যে ওর ওপর আমরা আশা ছেড়ে দিচ্ছি, ও আর ভালো হবে না, ওকে আমরা নির্বিকার ছেড়ে যাচ্ছি? আমার মনে হয় যা কিছু ওর ঘরে আছে সে রকম থাকুক, তাই যখন সে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। দেখবে সবকিছু অপরিবর্তিত হয়ে আছে, সবকিছুই ভুলে যেতে পারবে যা কিছু তার হয়েছিল।”

মায়ের কথাগুলো শুনে গ্রেগর উপলব্ধি করে গত দুমাস ধরে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা না বলায় তার পরিবারের সঙ্গে যে একঘেঁয়েমি তৈরি হয় তাতে মনে এক দ্বিধা চলে এসেছে, তা না হলে ঘরটা আসবাবশূন্য হয়ে পুরো খালি হয়ে যাক এই একান্ত চাওয়াটা তার কখনও হতো না। সত্যি কী তার গরম ঘর, পুরনো পারিবারিক আসবাবে সাজানো আরামদায়ক ঘরটি খালি করে শূন্য গুহা তৈরি করে সে ঘরে সে হয়তো নিরুপদ্রব বুকে হেঁটে ঘরের সব কোণে ঘুরে বেড়াতে পারবে। কিন্তু পাশাপাশি তার মানব পটভূমি থেকে সব স্মৃতি ভোলার মূল্যে এ চাইতে পারে। স্মৃতিহীনতার কিনারে আসলে সে পৌঁছে গিয়েছিল, তার মায়ের গলা, যা দীর্ঘদিন ধরে না-শোনায়, আজ তা শোনায় তাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তার ঘর থেকে কোনো কিছু নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যেমন ছিল সবকিছু অবশ্যই থাকবে। এইসব আসবাবপত্তর তার মনের ভেতর এমনভাবে এতো সুন্দর প্রভাব ফেলেছে, এই আসবাবপত্তর যদি তার কোনো ক্ষতি করে, তার এই চেতনাহীন বুকে হেঁটে চলাতে, তবু অসুবিধে হবে না এবং বড় রকম সুবিধেই হবে। 

দুর্ভাগ্যবশত তার বোন ভিন্ন মত পোষণ করে, সে অভ্যন্ত হয়ে উঠেছে। কোনো যুক্তি ছাড়াই তার বোন মনে করে তার বাবা-মা অপেক্ষা গ্রেগরের সম্পর্কে বেশি জানে। তার মায়ের উপদেশ সত্ত্বেও সে ঠিক করে শুধু সিন্দুকই নয় লেখার ডেস্কটাও সে সরিয়ে ফেলতে চায়, এ দুটোই প্রথম সে সরাবে, সব আসবাবপত্তরগুলো সরাবে, শুধু সোফাটা বাদ দিয়ে। এটাই সে ঠিক করে ফেলে। অবশ্য এ শুধু শিশুসুলভ জেদের প্রকাশ নয়, আর এই আত্মবিশ্বাস ওর ইদানীংকালে হয়েছে, এ অবিশ্বাস্য এ সে ভালোই বুঝেছে, গ্রেগরের বুকে হেঁটে চলার জন্য বেশ খালি জায়গার প্রয়োজন। আর তাছাড়া গ্রেগর আদৌ কোনো আসবাবপত্তর ব্যবহার করে না। দেখাও যায় না। অন্য একটা কারণ হলো উঠতি কিশোরীদের হতে পারে উৎসাহ প্রবণ মেজাজের, প্রতিটি সুযোগের লাভ করতে চায়, তার ভাইয়ের এই ভয়ংকর অবস্থা দেখে গ্রেগরের জন্য অতিরিক্ত কিছু করার ইচ্ছেটা জাগে, ভাবে তার জন্য অনেক কিছু করতে পারে। ঘরের ভেতর গ্রেগরই রাজা, সমস্ত খালি দেওয়ালে কারও পা ফেলার ক্ষমতা নেই।

সে যা করবে তা থেকে তার মা নড়াতে পারে না। তাকে দেখে মনে হয় বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন গ্রেগরের ঘরেতে। নিজে ঠিকও করতে পারছেন না। চুপ হয়ে গেলেন, যতটা সম্ভব তার মেয়েকে সাহায্য করতে শুরু করেন, সিন্দুকটা ঠেলে বাইরে নিয়ে যায়। এখন, সিন্দুক ছাড়াই গ্রেগরের কাজকম্মো চলতে পারে, প্রয়োজন হলেও হতে পারে, কিন্তু লেখার ডেস্কটা অবশ্যই সে রাখবে। শীঘ্রই দুই মহিলা ঘর থেকে সিন্দুকটা বের করে, তাদের ঠেলার সময় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয়। গ্রেগর সোফার নিচ থেকে মাথাটা বের করে দেখতে থাকে, কীভাবে যতটা শান্ত ও সতর্কতার সঙ্গে ওদের এ-ব্যাপারে বাধা দিতে পারে। দুর্ভাগ্য, তার মা প্রথমে ফিরে আসে, গ্রেটে তখন পাশের ঘরে একা সিন্দুকটা ঠিক করে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু সে একদম নড়াতে পারে না। যাই হোক, তার মা তাকে দেখে অভ্যস্ত নয়। তার মা অসুস্থ হতে পারে, তাই সাবধানতার জন্য গ্রেগর তাড়াতাড়ি সোফার অন্যদিকটায় সরে যায়। তবু সামনের দিকে একটু দুলে ওঠে, সে এটা আটকাতে পারে না। তাকে সাবধান করার জন্য এটা যথেষ্ট ছিল না। মা থামে কিছুক্ষণ, এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে থাকে, তারপর গ্রেটের কাছে ফিরে যায়। 

যদিও গ্রেগর নিজেকে বোঝাতে চাইছে, তেমন কিছু হচ্ছে না। কেবল কয়েকটা আসবাবপত্তর বদলানো হচ্ছে, তবু সে মেনে নিল যে দুজন মহিলা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে, তাদের কথাবার্তা, আসবাবপত্তর টানাটানিতে ঘড়ঘড় শব্দ। তা চারপাশ থেকে এসে তাকে বড়রকম বিরক্তিকর আওয়াজে ভরিয়ে তুলছে, এতে তার মাথা, পা এবং মেঝেতে ছড়িয়ে সমানভাবে তাকে অসহনীয় লাগছে, এ স্বীকার করতে বাধ্য করে। বেশিক্ষণ সে সহ্য করতে পারবে না। ওরা তার ঘরটা খালি করে ফেলেছে, যেসব জিনিস ভালোবাসে সবই নিয়ে যাচ্ছে, সিন্দুকটার ওপর আঁকা জোকা ফ্রেমগুলো রেখেছিল সেগুলো দেখে, এর যন্ত্রপাতিগুলো আগেই নিয়ে গেছে, ওরা এখন লেখার ডেস্কটা খুলছে, সেটা এখন মেঝেতে গড়াচ্ছে, ওতে রাখা বইপত্তর মেঝেতে ছড়ানো। কমার্সিয়াল একাডেমিতে যখন সে ছিল, এর আগে গ্রামার স্কুলে, ও হ্যাঁ প্রাইমারি স্কুলে পড়ত। সব বাড়ির কাজ ঐ ডেক্সে সে করে এসেছে।—ঐ দুই মহিলার সদিচ্ছার হিসেবনিকেশ করার সময় আর এখন নেই, ওদের অস্তিত্বের কথা সে প্রায় ভুলেই গেছে, কারণ তারা এতই ক্লান্ত, নীরবে কাজ করে চলেছে। ওরা কিছুই শুনবে না কিন্তু তাদেও ক্লান্ত শ্রান্ত পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। 

আর তাই সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে—তার মা ও বোন এই দুজন মেয়ে মানুষ পাশের ঘরে লেখার ডেস্কটায় শুধু হেলান দিয়ে দম নিচ্ছে—আর সে চারদিক ঘুরে দেখছে, সে জানে না কী বাঁচাতে হবে। উলটো দিকের দেওয়ালটা, যা ইতোমধ্যে ফাঁকা করে দিয়েছে বলা যায়। দেখতে পায় ছবিটা। তার বড় মায়া হয়, ফার দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে মহিলা। তাড়াতাড়ি বুকে হেঁটে ছবিটা ধরে, কাচের সুন্দর সমতলে নিজেকে চেপে ধরে, তার গরম পেটটায় বেশ আরাম দেয়। কম করে ছবিটা শরীরের নিচে পুরোটা লুকিয়ে রাখে, কেউই এটা সরাতে পারবে না। কখন ঐ দুজন মহিলা ফিরে আসবে দেখার জন্য শোয়ার ঘরের দরজার দিকে গ্রেগর তার মাথাটা ঘোরায়। 

বেশিক্ষণ তারা দম নেয়নি, ফিরে আসে তাড়াতাড়িই, গ্রেটে তার দুহাতে মাকে জড়িয়ে ধরে, প্রায় তার ওপর ভর দেয়। “আচ্ছা, এখন আমরা কী নেব?” গ্রেটে বলে, চারিদিকে চোখ বুলিয়ে। দেওয়ালে গ্রেগরের সঙ্গে চোখাচোখি হয়। তাকে ভাবলেশহীনভাবে রাখে, কারণ তার মায়ের জন্য। মায়ের দিকে মাথা নিচু হয়ে বলে। মায়ের চোখ যেন ওদিকে না পড়ে। বলে, যদিও তাকে মন ভোলানোর জন্য, পূর্বচিন্তা ছাড়াই সে বলে, “এসো, আমরা বরং কিছু সময় বসার ঘরে ফিরে গেলে ভালো হবে?” গ্রেগরের তার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। তার মাকে নিরাপদে রাখতে চাইছিল এবং তারপর তাকে দেওয়াল থেকে তাড়া করে নামাবে। বেশ, দেখাই যাক বোন তাকে কীভাবে তাড়ায়। ছবির সঙ্গে সে সেঁটে থাকে এবং ছবিটা সে ছাড়বে না। বরং সে গ্রেটের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

গ্রেটের কথায় কিন্তু মা অস্থির হয়ে উঠলেন। পাশে এক-পা সরে দাঁড়ালেন। দেখতে পান বিরাট বড় এক ফুল আঁকা ওয়ালপেপার, তার ওপর বাদামি রংয়ের স্তূপ। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, তিনি যা দেখলেন তা তো গ্রেগর। তা বোঝার আগে জোরে ককিয়ে ওঠেন এবং খেসখেসে স্বরে বলে ওঠেন, “হায় ঈশ্বর, হায় ঈশ্বর!” সোফার ওপর হাত ছড়িয়ে পড়ে গেলেন, যেন তিনি সব ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি আর নড়তে চড়তে পারবেন না। “গ্রেগর!” বোন চিৎকার করে ওঠে, ঘুষি উঁচিয়ে ধরে। জ্বলজ্বল চোখে তাকায় তার দিকে। তার রূপান্তরের পর এ-পর্যন্ত এই প্রথম সরাসরি নাম ধরে কথা বলে তার বোন। পাশের ঘরে দৌড়ে যায় কিছু ঝাঁঝালো ওষুধ আনতে, যাতে তার মায়ের জ্ঞান ফিরে আসে। গ্রেগরেরও তাকে সাহায্য করার ইচ্ছে হলো—এখনও সময় আছে ছবিটাকে বাঁচানোর, কাচের সঙ্গে এমন লেপটে আছে তাকে নিজেকে তার থেকে ছাড়াতে হবে; তারপর সে বোনের পেছন পেছন ছুটে যায় পাশের ঘরে যেন তাকে সে উপদেশ দিতে পারবে। যেমন সে দিয়ে থাকত। কিন্তু এখন অসহায়ভাবে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এর মধ্যে বোন নানা ধরণের কয়েকটা ছোট বোতল খোঁজে, যখন সে ঘোরে তাকে দেখে আঁতকে ওঠে; একটা বোতল মেঝেতে পড়ে এবং ভেঙে যায়, ভাঙা বোতলের একটা টুকরো লেগে গ্রেগরের মুখ কেটে যায়, জ্বালা করে এমন কিছু ছিটকে পড়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে গ্রেটে বোতলগুলো জড়ো করে যাতে সে নিয়ে যেতে পারে এবং ওগুলো নিয়ে দৌড়ে যায় মায়ের কাছে, দড়াম করে পা দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। মায়ের থেকে আলাদা হয়ে পড়ে গ্রেগর, তার জন্য প্রায় মা মরণাপন্ন, তার বোন ভয় পেতে পারে এজন্য সে দরজাটা খুলতে সাহস পেল না, বোনকে মায়ের সঙ্গে থাকতে হয়, সে তো কিছুই করতে পারে না কেবল অপেক্ষা ছাড়া। আত্মগ্লানিতে এবং অস্বস্তিতে সে এদিক-ওদিক বুকে হেঁটে ঘুরতে থাকে—সব জিনিসের ওপর দিয়ে, দেওয়ালে, আসবাবপত্তরের এবং সিলিংয়েও। শেষে হতাশায় তার যখন মনে হলো পুরো ঘরটা তার ঘোরা হয়ে গেছে। বড় টেবিলের মাঝখানে সে পড়ে যায়। 

কিছুক্ষণ কেটে গেল। গ্রেগর তখনও ঝিম মেরে শুয়ে থাকে এবং চারিদিক শান্ত। সম্ভবত এটা একটা ভালো লক্ষণ। তারপর ডোরবেলটা বেজে ওঠে। কাজের মেয়েটি নিশ্চয়ই রান্নাঘরটা তালা বন্ধ করে রেখেছে, গ্রেটেকে দরজাটা খুলতে হবে। তার বাবা। “কী হয়েছে?” তার প্রথম কথা; গ্রেটের মুখ দেখে বোঝা যায় সব কথা বলেছে তাকে। জড়ানো গলায় গ্রেটে উত্তর দেয়, আপাতভাবে ওর বুকে মাথা লুকিয়ে বলে, “মা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে, এখন একটু ভালো আছে। গ্রেগর ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।” “আমি যা ভেবেছিলাম,” ওর বাবা বলেন, “যা আমি তোমাদের বলেছিলাম, কিন্তু তোমরা মেয়েরা কখনও শোনোনি।” গ্রেগরের কাছে পরিষ্কার হলো, গ্রেটের এই অল্প কথায় তার বাবা এটাকে খুবই খারাপ অর্থ করে নিয়েছে। তিনি ধরেই নিয়েছেন গ্রেগর কিছু হিংস্র কাজ করে অন্যায় করেছে। সুতরাং এখন বাবাকে শান্ত করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। এর ব্যাখ্যা করা বা বোঝানোর মতো সময়ও নেই বা উপায়ও নেই। তাই সে ছুটে তার নিজের ঘরে দরজা দিয়ে ফিরে এলো এবং গুটিশুটি মেরে থাকে। বাবা এসেই যেন বুঝতে পারে যে তার ছেলের ভালো ইচ্ছেই ছিল, হলঘর থেকে আসতে আসতে এটা যেন মনে করতে পারে, তার তাড়াহুড়ো এখুনি আসার দরকার। দরজাটা খুললেই সে সড়াৎ করে তখনই অদৃশ্য হতে পারে।

বাবার এখন আর এমন সুন্দর পরিবেশ বলে মেনে নেওবার মানসিকতায় নেই। এসেই চিৎকার করে ওঠেন, “আহ্!” সেই মুহূর্তে এমনই গলা যে বোঝা যায় রাগে ক্ষোভে তিনি ফেটে পড়ছেন। দরজার পেছন থেকে গ্রেগর তার মাথাটা টেনে নেয়, মাথাটা একটু তোলে বাবাকে দেখার জন্য। সত্যি কথা কি তার এই বাবাকে সে কখনও কল্পনা করেনি। 

মেনে নেয় সিলিং-এ বুকে হেঁটে বেড়িয়ে যে আনন্দ পায় তাতে সে নতুন রকম বিনোদনে মজে যায়, এতে বাড়ির অন্যত্র কী ঘটে চলেছিল তা সে ভুলে যায়, সত্যিই তো এজন্য তাকে প্রস্তুত রাখা উচিত ছিল, তাকে বদলানো উচিত ছিল। আর হ্যাঁ তবু, হ্যাঁ তবু। তার কি বাবা এমন হতে পারে? যখন ব্যবসার কাজে বাইরে যেত গ্রেগর এই লোকটাই চিন্তায় ভাবনায় বিছানায় শুয়ে থাকতেন, সন্ধ্যেয় ফিরে এলে লম্বা চেয়ারে ড্রেসিংগাউন পরে থাকতেন, সেই অবস্থায় তাকে স্বাগত জানাতেন, বাবা উঠে দাঁড়াতে পারতেন না কিন্তু হাত দুটো তুলে সস্নেহে আহ্বান জানাতেন, আর খুবই কম। কখনো কখনো বছরে এক-দুই রবিবার বা দীর্ঘ ছুটিতে যখন পরিবারের সঙ্গে বেরোতেন, গ্রেগর ও মায়ের মাঝখানে হাঁটতেন। খুবই ধীরে এবং ধীরে। তারা যেমন তার চেয়েও ধীরে হাঁটতেন। তার পুরনো গ্রেটকোটটা জড়িয়ে, তাঁর বাঁকানো-হাতল ছড়িটার সাহায্যে অতি কষ্টে হেঁটে চলতেন, আর প্রতিটি পদক্ষেপ অতি সাবধানে এগোতেন, যখন তিনি কিছু বলতে চাইতেন, সবসময় একেবারে থেমে যেতেন, তার সঙ্গীরা যতক্ষণ-না সামনে আসছে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এখন বেশ সুন্দর আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, পরে আছেন সোনালি বোতাম লাগানো এক ভদ্র ধোপদুরস্ত নীল পোশাক, ব্যাংক-সংবাদ পরিবাহকের মতো। তার শক্ত সবল দু-ভাজ চিবুক তার উঁচু শক্ত কালার তুলে দেওয়া জ্যাকেটের ওপর দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে, ঘন ভ্রূর তলা দিয়ে তার কালো দুটো চোখ তীক্ষ্ম সতেজ এবং অন্তর্ভেদী জ্বলজ্বল, তার এক সময়ের অগোছালো সাদা চুল দুদিকে পাট করে আঁচড়ানো। তা চকচক করছে এবং অতি যত্নের সঙ্গে পরিপাটি করে রাখা। ওর টুপিটা রং করা, তাতে সোনালি মনোগ্রাম করা, ব্যাজটা মনে হয় কোনো ব্যাংকের। দুরন্তবেগে পুরো ঘরটা ডিঙিয়ে সোফার দিকে ছুটে যায়। জ্যাকেটে প্রান্ত ঠেলে পেছনে সরিয়ে দেয়। দু-হাত দুটো ট্রাউজারের পকেটে রেখে, হিংস্র মুখ করে গ্রেগরের দিকে এগিয়ে গেলেন। সম্ভবত তিনি ভালো করেই নিজেই জানতেন না তিনি কী করবেন, যে-কোনোভাবেই হোক অস্বাভাবিকভাবে তার পা উঁচুতে তোলেন, তার জুতোর সোলের বিশাল আকার দেখে গ্রেগর হতভম্ব হয়ে যায়। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝুঁকি নিতে পারে না, তার এই নতুন জীবনের প্রথম দিন থেকেই সে যেমন সচেতন, তার বাবা বিশ্বাস করেন যে তার সঙ্গে কেবল কঠোর ব্যবস্থা নিলেই সেটাই হবে উপযুক্ত ব্যবস্থা। আর তাই সে বাবার আগে ছুটতে থাকে, যখন বাবা থামে তখন সে-ও থামে। বাবা একটু এগোলে সে-ও একটু এঁকে-বেঁকে যায়। অর্থাৎ বাবার চলাফেরা দেখে সে-ও তার কৌশল ঠিক করে। কোনোরকম মারাত্মক কিছু ঘটার আগ পর্যন্ত তারা কয়েকবার গোল করে ঘুরে ফেলে। পুরো ব্যাপারটা অনুসরণের মতো মনে হচ্ছিল না কারণ এ-ঘটছিল অতি ধীরে ধীরে। আর তাই গ্রেগর মেঝে ছেড়ে যাচ্ছিল না। কারণ তাহলে ওর বাবা যদি দেখে সে দেওয়ালে বা সিলিং-এ চলাফেরা করে। তবে একে সে শয়তানি মনে করতে পারে। সবই সমান, এভাবে বেশিদিন সে থাকতে পারে না, তার বাবা এক-পা এগোলে সে-ও সমান তালে এগোয়। ইতোমধ্যে অনুভব করতে শুরু করে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, তার আগের জীবনেও তার ফুসফুস খুব বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল না। যখন সে দোলাচলে ছিল, সে শুধু দৌড়নোর জন্য মনসংযোগে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করছিল, চোখ খুলে রাখতে পারছিল না। এ-রকম ভয়ংকর অবস্থায় পালানোর জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন কিছু ভাবতে পারছিল না, সে প্রায় ভুলেই গিয়েছে তার কাছে দেয়ালটা মুক্ত রয়েছে, এই ঘরের দেওয়ালে ভরা রয়েছে বাঁকা ও সুন্দর খাঁজ, আসবাবপত্তরের গাঁট ও ফাটল—হঠাৎই তার পেছন থেকে তার কাছে কিছু একটা ছিটকে এলো, তারপর তার সামনে গড়িয়ে এলো। একটা আপেল, দ্বিতীয় আপেলটা পর মুহূর্তে এলো; ভয়ে গ্রেগর থেমে যায়; দৌড়বার কোনো দিক নেই, ওর বাবা ঠিক করেছে তাকে বোম মেরে উড়িয়ে দেবে। পাশের তাক থেকে বাবা তার পকেটগুলোতে ডিশ থেকে ফল নিয়ে ভরে, একটার-পর-একটা আপেল ছুড়ে ফেলছেন, সেই মুহূর্তে তার তেমন লক্ষও ছিল না। ছোট লাল আপেলগুলো মেঝেতে গড়াতে থাকে যেন সেগুলো চুম্বকে আটকে যাচ্ছে এবং একটার-পর-একটা ধাক্কা খাচ্ছে। অল্প জোরে একটা আপেল এসে পড়ে গ্রেগরের পিঠে, কিছুটা থ্যাতলানো, তবে তা তেমন চোট পায়নি। তারপরেই একটা আপেল ডানদিকে পিঠে এসে লাগে আর থ্যাঁতলেও গেল। গ্রেগর তাকে টেনে সামনে নিতে চাইল যেন আকস্মিক। অসহ্য যন্ত্রণা তাকে ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু অনুভব করে পেরেক ঠুকে তাকে যেন আটকে দিয়েছে আর সকল জ্ঞান হারিয়ে সম্পূর্ণ বিহ্বল হয়ে সটান হয়ে পড়ে থাকে। তার জ্ঞান হারানোর আগে দেখে মা দরজা খুলে বোনের আগে আর্তনাদ করতে করতে ছুটে আসছেন। পরনে শুধু অন্তর্বাস। তার নিঃশ্বাস নেওয়ার সুবিধের জন্য সব পোশাক টোশাক আলগা করে দেয়া যায়। ছুটে এসেছেন জ্ঞান ফিরেই। দেখে মা ঢিলে রাখা নিম্নবাসগুলো একের-পর-এক খুলে ফেলে মেঝেতে, তাতে হোচট খেতে খেতে বাবার দিকে ছুটে যায়। জড়িয়ে ধরেন বাবাকে, তার শরীরের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যান—কিন্তু এখানেই গ্রেগর দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকে, দু-হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে যেন সে তার পুত্রের জীবন ভিক্ষা করছেন।



৩


যে মারাত্মক আঘাত গ্রেগরকে করা হয়েছিল, এতে তাকে এক মাসের বেশি পঙ্গু করে রেখেছিল, আপেলটি তার শরীরে লেগেছিল, স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখনও দৃশ্যমান, সেটা সারাতে কেউ সাহস দেখায়নি, মনে হয় তার বাবার মনে পড়ে যায় আসলে গ্রেগর তো তাদের পরিবারেরই একজন। তার বর্তমান দুর্ভাগ্যজনক ও ভীতিজনক আকার সত্ত্বেও, তার সঙ্গে শত্রুর মতো ব্যবহার করা উচিত হয়নি বরং এর বিপরীত হলেই ভালো হতো, পরিবারের উচিত ছিল বিরক্তি চেপে রাখা, শুধু ধৈর্য, ধৈর্য ছাড়া আর তার তো কোনো সমাধান ছিল না।

আঘাতটি তাকে দুর্বল করে দেয়, সম্ভবত চিরদিনের জন্য, দুর্বল করে দিয়েছে তার চলার শক্তি, কারণ সেই সময়ে একজন বৃদ্ধ পঙ্গুর মতো ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে বুকে হামাগুড়ি দিয়ে পেরোতে অনেক, অনেক মিনিট লেগে যায়। আর দেওয়াল বেয়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না—তবু তার মত সে এই তার চরম খারাপ অবস্থার জন্য যথেষ্ট রকম ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, সন্ধের সময় এক বা দু-ঘণ্টা আগে শোয়ার ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হতো, এ-সময় আগ্রহভরে সেদিকে তাকিয়ে থাকত, সে তার ঘরে অন্ধকারে শুয়ে থাকে, পরিবারের কেউ তাকে দেখতে পায় না, আর ওদের টেবিল-বাতির আলোয় দেখে যেত আর শুনত তাদের কথাবার্তা, বলা যায় এটা হয়েছিল সকলের মত নিয়েই, এসব আগের দেখার সঙ্গে মিলত না, সবই আলাদা। সবই আলাদা।

সত্যি কথা, তাদের আগেরদিনের যে প্রাণবন্ত জীবন ছিল তা এই মিলনে বড়ই অভাব, সেই ছোট হোটেলের শোয়ার ঘরে যেখানে সে ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটা ছুঁড়ে রোমন্থন করে আনন্দ পেতো। অধিকাংশই এখন অতি নীরব। রাতের খাবারের পর বাবা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন চেয়ারে, তার মা, তার বোন উভয়েই পরস্পরকে চুপ থাকার জন্য ইশারা করেন। তার মা নিচু হয়ে আলোর নিচে নিচু হয়ে আন্ডারওয়্যার ফার্মের জন্য সূক্ষ্ম সেলাইয়ের কাজ করে চলেন; বোন একটি সেলস্গার্লের চাকরি নিয়েছে, উন্নতির জন্য শর্টহ্যান্ড আর ফরাসি ভাষা শেখে সন্ধেতে। মাঝে মাঝে বাবা জেগে উঠেন, যেন তিনি জানেন-না যে ঘুমিয়ে পড়েছেন তা তার মাকে জানায়, বলেন, “আজ তুমি কী এত সেলাই করছো!” আবার তখুনি ঘুমিয়ে পড়েন। আর তখন দুই রমণী ক্লান্ত হাসি হাসতেন।

বাবা এক ধরনের জেদি হয়ে উঠেছেন। বাড়িতেও অফিসের পোশাক পরে থাকবেন। তার ড্রেসিং-গাউনটা দেওয়ালের আংটাতে অব্যবহৃত অবস্থায় ঝুলে থাকে, যেখানে বসেন সেখানেই অফিসের পরেই ঘুমিয়ে পড়েন, যেন তিনি অফিসের কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন, কেবল তার প্রধানের ইশারায় আর ডাকের অপেক্ষায়। ফলে তার পোশাকটা নতুন না-থাকায়, শুরুতে তা নোংরা ছিল, তার মা ও বোনের ভালোরকম যত্ন সত্ত্বেও তা পরিষ্কার রাখতে পারত না, নোংরাই দেখাত। আর গ্রেগর সারা সন্ধে, তার বাবার পোশাকে নানা ময়লা দাগ সত্ত্বেও চড়া পালিশের দরুন সব সময়ই সোনালি বোতামের ঝলকানি দেখত, বৃদ্ধ লোকটি অস্বাভাবিক জায়গায় বসে ঘুমালেও সে শান্তিতে কাটাচ্ছে।

দশটা বাজলেই তার মা তার বাবাকে নরম কথায় উঠে বিছানায় যেতে বলতেন, এখানে বসে ঘুমোলে ঘুমটা ঠিক হবে না, আর ঘুমটা তো তার দরকার, তাকে তো ছটার সময় কাজে যেতে হবে। কিন্তু তার জেদি ভাবটা তাকে ভোগাচ্ছিল যখন তেকে সে ব্যাংকের খবর সরবরাহকারী হন, দীর্ঘ সময় ধরে টেবিলে থাকার জন্য জোর করতেন। তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। শেষে বহু কষ্টে চেয়ার থেকে তুলে বিছানায় নিয়ে যাওয়া হতো। জোর করেই গ্রেগরের মা ও বোন তাকে নরমভাবে স্মরণ করিয়ে দিতেন, প্রায় পনেরো মিনিট বাদে, চোখ বন্ধ অবস্থায় মাথাটা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে যেত, দুটো পা তুলতে চাইত না, মা কানে ফিসফিস করে লক্ষ্মীসোনা বলে। তার হাত ধরত এবং বোন পড়া রেখে মাকে সাহায্য করার জন্য আসত কিন্তু তেমন ভালোভাবে ধরা যেত না, সে আরও বেশি চেয়ারে বসে পড়ত। ঐ দুজন নারী তার বগলে হাত দিয়ে চাগিয়ে ধরে তাকে তুলত, চোখ খুলে তাদের দুজনের দিকে একের পর-এক-তাকিয়ে বলতেন: “এই তো জীবন! আমারা বুড়ো বয়সে এই স্বস্তি এই শান্তি।” আর দুজনের মাঝে ঝুঁকে পড়তেন, নিজেকে দাঁড় করাতেন ওদের ওপর ভর দিয়ে, অনেক কষ্টে, যেন তিনি নিজেই তাদের বড় গলগ্রহ, তাদের কষ্ট দিচ্ছেন, যতটা দরজার কাছে নিয়ে যেতেন। তাদের বিদায় জানাতেন। বাকিটুকু একাই যেতেন, মা তার সেলাইয়ের কাজ রেখে এবং বোন কলম রেখে তার দিকে ছুটে আসত, এবং তাকে আরও সাহায্য করত।

এত কাজের চাপে আর ক্লান্ত পরিবারের পক্ষে কার এমন সময় রয়েছে যে প্রয়োজনের বেশি সময় দিয়ে নজর রাখতে পারে গ্রেগরের দিকে? দিনের-পর-দিন ক্রমশ বাড়ির জিনিস কমে যেতে থাকে, ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়ির কাজের মেয়েটিকে, বাড়ির টুকিটাকি কাজের জন্য থলবলে বিশাল আকারের এক মহিলাকে রাখা হয়েছে, সকাল সন্ধেতে আসে তার সাদা চুল উড়িয়ে, আর বাকি কাজটা করতেন গ্রেগরের মা, এবং আর গাদাগুচ্ছের সেলাইয়ের কাজও। এমনকী পারিবারিক যেসব গয়নাগাটি তার মা ও বোন গর্ব সহকারে পার্টিতে ও নানা রকম উৎসব অনুষ্ঠানে পরে যেত সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হতে থাকে, গ্রেগর সন্ধ্যের সময় ওদের গয়না বিক্রি করে কত পেয়েছে সে নিয়ে কথাবার্তা শুনে এ-আবিষ্কার করে। তাদের বর্তমান অবস্থা অনুসারে তাদের এ-প্রয়োজনের থেকে বেশি মনে হচ্ছে, তবে বাড়িটা ছেড়ে চলে যেতে পারছে না। এজন্য তাদের বাড়িটা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে কারণ গ্রেগরকে কোনোমতে স্থানান্তরিত করার কথা তারা ভাবতে পারে না। তবুও তাকে সরানোর অসুবিধের জন্য তারা বাড়িটা ছাড়তে পারছে না একথা গ্রেগর মেনে নিতে পারে না। কারণ যেকোনো বাক্সে কয়েকটা ফুটো করে তার ভেতরে রেখে নিয়ে যেতে পারে। আসলে এটাই বড় কারণ নয়, এক ফ্ল্যাট থেকে আরেক ফ্ল্যাটে যাওয়ার থেকে বরং তারা নিজেরাই রয়েছে সম্পূর্ণ হতাশায়, এবং বিশ্বাস করে দুর্ভাগ্য যেন তাদেরই রয়েছে, আর এমন কপাল খারাপ তাদের আত্মীয় পরিজনদের আর কারও নেই। গরীব মানুষদের কাছ থেকে পৃথিবী যা চায় তারা যথাসাধ্য তা পূরণ করেছে। বাবা ছোটখাটো কেরানিদের জন্য প্রাতরাশ এনে দিতেন, মা অচেনা লোকেদের জন্য অন্তর্বাস সেলাই করে দিতেন আর বোন কাউন্টারের পেছনে খদ্দেরদের হুকুম তালিম করার জন্য এদিক-ওদিক চক্কর লাগাতো। কিন্তু এর বেশি করার তাদের শক্তিও ছিল না। গ্রেগরের পিঠের ব্যথাটা নতুন করে চাগাড় দেয়, যখন তার মা, বোন তার বাবাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। সব কাজ ফেলে তারা মুখোমুখি বসে। দরজার দিকে তাকিয়ে বলতেন, “দরজা এখন বন্ধ করে দাও গ্রেটে,” আবার তাকে অন্ধকারে রেখে দেওয়া হতো, পাশের ঘরে টেবিলেতে দুজন নারী মিলে চোখের জলে অথবা সম্ভবত শুকনো চোখে তাকিয়ে থাকত।

দিনে বা রাতে গ্রেগর প্রায় ঘুমোতেই না। নানা ভাবনা তাকে দোলা দিত। সে আবার দরজা খুলে পরিবারের সব দায়িত্ব নেবে, যেমন সে আগে করে থাকত, আবার নেবে। দীর্ঘ সময় বাদে, তার ভাবনায় আসত বড়কর্তা অর্থাৎ মালিক, বড়বাবু। ব্যবসায়ীকে ক্যানভাসার, শিক্ষানবীশ এবং বোকাসোকা কুলিটির কথা, অন্য ফার্মের দুয়েকজন বন্ধুর কথা, গ্রামের হোটেলের দেখভাল করত যে মেয়েটি, মিষ্টি, কেনাবেচা হতো দোকানটিতে, তার ক্যাশিয়ার স্মৃতিতে আনাগোনা করে। যাকে সে কামনা করত এবং অতি ধীরে—তারা সবাই আসত, চেনা-অচেনা লোক ভীড় করে আসত যাদের সে ভুলে গেছে, তাকে সাহায্য করা বা তাদের পরিবারকে সাহায্য করার কথা বলা যায় না, যখন তারা মিলিয়ে যেত সে খুশিই হতো। অন্য সময়ে তার পরিবারকে নিয়ে তেমন মাথা ঘামাত না। বরং তারা তাকে অবহেলা করত বলে রেগে যেত, তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না সে কী খাবে, সে মাঝে মাঝে মতলব আটত ভাঁড়ারের ঘরে গিয়ে খাবার নেবে। তার তো একটা প্রাপ্য আছে। তার খিদে পাক বা না পাক। আগে যেমন বিশেষভাবে তাকে খুশি করার কথা ভাবত না। সকালে বা দুপুরে হুড়োহুড়ি করে কাজে যাওয়ার আগে রেখে যেত, যা থাকত তাই রেখে যেত, সন্ধেতে এসে ঝাঁটা দিয়ে একবারে ঝেঁটিয়ে ফেলে দিত, সে কী খেয়েছে বা না-খেয়েছে তার দিকে আর নজর দিত না। ইদানীং তো প্রায় সবই পড়ে থাকত, গ্রেগর ছুঁয়েও দেখত না—প্রায়ই এমন হতো। তার ঘরটা বোনই পরিষ্কার করত, সব সময় সন্ধেতেই করত, তাড়াহুড়োতে ভালো করে পরিষ্কার করা হতো না, দেওয়ালে ময়লা লেগে থাকত, এখানে-সেখানে ময়লার ঢ্যালা জমে গিয়েছে, বেশ স্যাঁতসেঁতে এক কোনে তাড়াতাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিত কারণ, বোন এসে তাকে বকাঝকা করা শুরু করে দিত। কোনো উন্নতির আশায় বসে থেকে দেখে এর হেরফের কিছু হয়নি। বোন দেখতে পেতো ময়লা এবং সে-ও তাই দেখত। কিন্তু তার বোন ঠিক করেছে সে কিছুই করবে না, যেমন আছে তেমনই থাকুক। তবুও এই সংবেদনশীলতা তার কাছে নতুন, এ-সারা পরিবারে সংক্রামিত হয়। এক গভীর ঈর্ষাতে ঢেকে রাখে তার দাবি যে সেই গ্রেগরের একমাত্র দেখভাল করছে। একবার তার মা ঘরটাকে আগাপাছতলা পরিষ্কার করে, কেবল কয়েক বালতি জল ঢেলে তাকে কাজটা করতে হয়, এসব স্যাঁতসেঁতে ব্যাপার গ্রেগরকে অস্থির করে তোলে, সোফার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে দেয়, নীরবে নিথর হয়ে থাকে। এর-জন্য তার মাকে যথেষ্ট কথা শুনতে হলো। তার ঘরের ভেতরে যে বদল হলো তা না-দেখে সেই সন্ধেতে এসব তাকে খুশি করতে পারে না তাই রেগে গিয়ে ছুটে যায় শোয়ার ঘরে, কোনোরকম মায়ের অনুরোধ টনুরোধের ধার না ধেরে মার দিকে হাত তোলে, ভয়ানক কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন তার বাবা মা, বিশেষ করে তার বাবা চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে ওঠেন—প্রথম তার দিকে অবাক হয়ে তাকান, তারপর তারাও বলতে শুরু করেন; বাবা বলতে শুরু করলেন তার মাকে, ওকে আর গ্রেগরের ঘর পরিষ্কার করতে দেওয়া হবে না, বাঁ-দিকে ঘুরে বেশ ঝাঁঝিয়ে বললেন, তাকেও আর ওই ঘর পরিষ্কার করতে হবে না, তার বাবা রাগে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন যে, মা-বাবাকে ধরে শোয়ার ঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বোন ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে, তারপর ছোট হাত দুটো মুঠো করে টেবিলে মারতে থাকে। গ্রেগর হিসহিস শব্দ করে রাগে ফুসতে থাকে। এইসব হল্লা তার অপছন্দ, তারা কেন দরজা খোলা রেখেছে।

এখন, যদি তার বোন কাজের থেকে এসে শ্রান্ত হয়ে পড়ে, যেমন আগের মতো ক্লান্ত হয়ে আসার পর গ্রেগরকে দেখাশুনা করত, আর মায়েরও এ-কাজে হস্তক্ষেপ করার আর কিই-বা অবহেলা হয়ে থাকে গ্রেগরের তার তো আর প্রয়োজন নেই। এখন তো ঠিকে কাজের মহিলা রয়েছে। ঐ বৃদ্ধ বিধবার শক্ত সমর্থ শরীর, ওর ঐ শরীরের কারণে জীবনের বহু দুঃসময় কাটিয়ে এখনও বেঁচে বর্তে রয়েছে, কোনোভাবে সে গ্রেগরকে দেখে গুটিয়ে থাকবে। কোনোরকম কৌতূহলী না হয়ে হঠাৎই সে ওর দরজাটা খুলে ফেলে, গ্রেগরকে দেখে, অবাক হয়ে তাকে কেউ তাড়া করতে এসেছে এই ভেবে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে শুরু করে, আর ঐ মহিলা হাত দুটি জোড় করে কেবল দাঁড়িয়ে থাকে। সেসময় তেকে এক মুহূর্তের জন্য একটু দরজা খুলতে ব্যর্থ হয় না, সকাল ও সন্ধেতে তাকে একবার তার দিকে তাকাত। প্রথমে সে এমনকি তাকে কাছে আসতে ডাকতে থাকে, আপাতভাবে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, ডাকে এভাবে, “এসো, কাছে এসো। বুড় গুবরে পোকা!” বা “ধেড়ে গুবরে পোকা, তাকাও, এসো!” এ-রকম তামাশায় কোনো উত্তর দেয় না গ্রেগর, বরং সে স্থির হয়ে যেখানে ছিল সেখানেই থাকে, যেন কোনওকালে দরজা খুলবে না। ঐ ঠিকে কাজের মহিলাকে এসব বোকার মতো জ্বালাতনের বদলে, তাকে বরং ঘরটা পরিষ্কার করার জন্য হুকুম দেওয়া উচিত। একদিন, সকালবেলা জানালার শার্সিতে বেশ বৃষ্টির ছাট লাগছে, সম্ভবত এভাবেই বসন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে—এদিকে ঐ ঠিকে কাজের মহিলার যখন আবার ঐ ডাকটা ডাকতে থাকে তার বেশ বিরক্তি আনে, সে তার দিকে তেড়ে যায় যেন ওকে আক্রমণ করবে। ধীরে ও দুর্বলভাবে। কোনো ভয় না পেয়ে ঠিকে ঝিটা একটা চেয়ার উপরে তোলে, ঘটনাটা ঘটে দরজার পাশে, সেখানে দাঁড়িয়ে মুখটা এত বড় হাঁ করে তাতে স্পষ্ট করে বোঝায় এ বন্ধ হবে তখনই গ্রেগরের পিঠে চেয়ারটা নামিয়ে রাখলে। জিজ্ঞেস করে, “তাহলে তুমি আর সামনে আসবে না?” গ্রেগর আবার ঘুরে চলে যায়, কোণায় আবার চেয়ারটা শান্তভাবে নামিয়ে রাখে।

গ্রেগর আর এখন কিছুই খায় না। কেবল খাবারের পাশ দিয়ে যখন যেত, সময় কাটানোর জন্য একটু-আধটু মুখে তুলে রাখে, তা ঘণ্টাখানেক ধরে রাখে, তারপর থুথু করে ফেলে দেয় আবার! প্রথম সে ভাবে তার ঘরের এই বিরক্তিকর অবস্থার জন্য হয়তো সে খেতে পারছে না, তার ঘরে অনেক বদল হয়ে গেছে, অন্য ঘরে যেসব জিনিশ উদ্বৃত্ত বলে মনে হতো, সেইসব জিনিসপত্তর এ-ঘরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেল। তাদের পরিবারে এটা অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেল। তাদের একটা ঘর তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হলো, এই মারাত্মক ভদ্রলোকদের, তিনজনের গালে দাড়িভরতি, দরজার ফাঁক দিয়ে গ্রেগর তাদের দেখে, একটা আগ্রহ রয়েছে, কেবল তাদের ঘর নিয়ে নয়, তারা এখন এ-বাড়ির সদস্যও, সকল ব্যাপারেই, বিশেষ করে রান্নাঘরেও। নোংরা নয়, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্তর তারা সহ্য করতে পারে না। এছাড়া তাদের যা প্রয়োজন সেইসব জিনিসপত্তরই তারা এনেছে। এ-কারণে অনেক জিনিস বিক্রি করে দেওয়া যায় না আবার ফেলাও যায় না এ-রকম জিনিস গ্রেগরের ঘরে রাখা হলো। ছাইয়ের পাত্র, রান্নাঘরের আবর্জনারও পাত্র। এই মুহূর্তে যার দরকার নেই ঠিকে কাজের মহিলাকে দিয়ে গ্রেগরের ঘরে ছুড়ে ফেলা হতো। আর সে এগুলো দুপদাপ ছুড়ে ফেলত। সৌভাগ্যবশত গ্রেগর স্বাভাবিক জিনিসটি দেখত, তা যাই হোক, যে হাতটি বস্তুটিকে ধরে রয়েছে সেই হাতটি কেবল দেখত। সম্ভবত সে ভেবেছিল প্রয়োজনমতো আবার এখান থেকে নিয়ে যাবে, সুযোগ হলে সেগুলো কুড়িয়ে বাড়িয়ে বেঁধেছেদে সে জঞ্জাল ফেলার জায়গায় ফেলে দিতে পারবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যেখানে সে এগুলো ছুড়ে ফেলেছে সেখানেই পড়ে থাকে, শুধু গ্রেগর যেগুলো তার চলার সুবিধের জন্য স্তূপ ঠেলে পথ করে নেয়, সেইসব সরানো অবশ্য প্রথমে যেগুলো তার প্রয়োজন হয়েছে। কারণ তার তো বুকে হেঁটে চলার মতো যথেষ্ট জায়গা ছিল না। কিন্তু পরে উপভোগ করা বেড়ে যায়, কিন্তু এই সুখময় ভ্রমণের পর, সে বিষণ্ন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুভয়ে সন্ত্রস্ত থাকত, ঘণ্টার-পর ঘণ্টা সে নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকত। আর সেই থেকে ভাড়াটেরা প্রায় বাড়িতে সকলের বসবাস ঘরে তাদের রাতের খাবার খেতো, বসার ঘরের দরজাটা বন্ধ থাকত বহু সন্ধেতে, তবু শান্ত হয়ে সহজভাবে দরজা বন্ধ থাকাটার সঙ্গে গ্রেগর নিজেকে মানিয়ে নেয়, কোনো কোনো দিন সন্ধেতে দরজাটা খোলা থাকে, সম্পূর্ণভাবে ওদিকে কোনো পাত্তাই দেয় না, সে ঘরের সবচেয়ে অন্ধকার কোণে পড়ে থাকে, পরিবারের সকলের অগোচরেই। কিন্তু বাড়ির ঠিক কাজের মহিলা কোনো এক উপলক্ষ্যে দরজাটা সামান্য খোলে এবং সেটা খোলা রেখে যায়, এমনকি ভাড়াটেরা রাতের খাবার খেতে আসে, বাতিটা জ্বলতে থাকে। তারা টেবিলের শেষে উঁচুতে নিজেরাই বসে। আগে এই জায়গায় গ্রেগর, তার বাবা ও মা বসে তাদের খাবার খেতেন, ন্যাপকিন খোলা, হাতে নেয় ছুরি ও কাঁটাটা, অন্য দরজা দিয়ে তখুনি তার মা মাংসের ডিশটা নিয়ে আসে এবং তার পেছনেই বোন আলুতে উপচে পড়া ডিশটা নিয়ে উপস্থিত হয়। খাবার থেকে ঘন বাষ্প উঠতে থাকে। সেসব রাখার আগে ভাড়াটেরা ঝুঁকে পড়ে খাবারের ওপর যেন তারা পরীক্ষা করছে খাবার খাওয়ার আগে, মাঝখানে যে বসে আছে, তাকে দেখে মনে হয় অন্য দুজনের নেতা, মাংসের এক টুকরো কেটে ডিশে নেয়; অবশ্য দেখতে চায় সেদ্ধ হয়েছে কিনা, নাহলে সেটাকে রান্নাঘরে ফেরত পাঠাতে হবে। সন্তোষ প্রকাশ করে সে, উদ্বিগ্ন হয়ে গ্রেগরের মা ও বোন দেখতে থাকে, যাক, স্বস্তির শ্বাস নেয় এবং খুশির হাসি হাসতে শুরু করে। 

পরিবারের সকলে রান্নাঘরেই খেতো। তা সত্ত্বেও গ্রেগরের বাবা বসার ঘরে এলেন, রান্নাঘরে যাওার আগে, বড় রকমের অভিবাদন করে গেলেন, হাতে টুপি, টেবিলটা এক পাক ঘুরলেনও। ভাড়াটেরা সবাই দাঁড়ায়, দাড়ির আড়ালে কী যেন বিড়বিড় করে বলে। আবার যখন তারা বসে, তারা নীরবেই তাদের খাবার খায়। গ্রেগরের কাছে এটা উল্লেখযোগ্য, টেবিল থেকে নানা শব্দই আসছিল, কিন্তু সে শুধু দাঁতের চিবানো শব্দগুলো স্পষ্টই বুঝতে পারছিল। যেন গ্রেগরের কাছে এই সংকেত খেতে হলে দাঁতের কতটা প্রয়োজন, দাঁতহীন চোয়ালের কাছে যতই খাবারের সুস্বাদু থাকুক না তা খেতে অক্ষম তো বটে। “আমি খুবই ক্ষুর্ধাত,” বিষণ্ন হয়ে গ্রেগর নিজেকে বলে, “কিন্তু আমার জন্য তো ঐ-রকম খাবার হবে না। আর ঐ ভাড়াটেরা কীভাবে মজিয়েই-না খাচ্ছে, আর এখানে আমি না-খেয়ে মরে যাচ্ছি।”

সেই সন্ধেতেই—গ্রেগরের এমন অবস্থায় কখনও মনে পড়ে না সে এ পর্যন্ত বেহালা শুনেছে—রান্নাঘর থেকে বেহালার আওয়াজ আসছে শুনতে পায়। ভাড়াটেরা তাদের রাতের খাবার শেষ করেছে, মাঝের জন্য উঠে একটা খবরের কাগজ নিয়ে এসেছিল, সে অন্য দুজনে দুটো পাতা দেয়, তারা পিঠটা পেছন দিকে এলিয়ে কাগজ পড়তে থাকে আরামে এবং ধূমপানও করতে থাকে। বেহালা যখন বেজে ওঠে, ওরা কান খাঁড়া করে শোনে, উঠে দাঁড়ায় এবং আঙুলের আলতো ভরে হলঘরের দরজার কাছে যায় এবং পরস্পর গায়ে লেগে উঁকি দেয়। তাদের পায়ের শব্দ রান্নাঘর থেকে শোনা যায়। গ্রেগরের বাবা জোরে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভদ্রমহোদয়গণ, বেহালার বাজনা কি আপনাদের অসুবিধে করছে? এখুনি তাহলে বন্ধ করা যেতে পারে।” মাঝখানের ভাড়াটে লোকটি বলে, “ও না এর ঠিক উলটোটাই, ফ্রাওলিন সামসা কি এই ঘরে এসে আমাদের পাশে বাজাতে পারেন না, এ-ঘরে তো আরও ভালো, বেশ আরামে বাজাতে পারেন।” “ও, নিশ্চয়ই,” গ্রেগরের বাবা জোরেই বললেন, যেন সে নিজেই বেহালা-বাদক। ভাড়াটেরা শোয়ার ঘরে ফিরে আসে এবং অপেক্ষা করতে থাকে। গ্রেগরের বাবা বেহালা বাজনার স্ট্যান্ড নিয়ে এলো, মা নিয়ে আসে যন্ত্রটা আর বোন আনে বেহালাটা। বাজনা বাজানোর জন্য বোন সবকিছু ধীরে সুস্থে প্রস্তুত করে; বাবা মা কখনও ঘর ছেড়ে যায় না, এজন্য যে ভাড়াটেদের যেন কোনোরকম সৌজন্য দেখাবার ত্রুটি না হয়। এমনকি তাদের নিজেদের চেয়ারে বসার সাহসটুকু করে না, তার বাবা দরজার দিকে ঝুঁকে পড়ে, ডান হাতটা অফিসের কোটের বোতামের মাঝে চেপে রাখে। এমনিতেই বোতামটা লাগানো রয়েছে, কিন্তু ভাড়াটেদের মধ্যে একজনকে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়, ঐ চেয়ার শুধু ওখানে রেখে, সে কোণের একটা চেয়ারে গিয়ে বসে। 

বাজাতে শুরু করে গ্রেগরের বোন; দুদিক থেকে বাবা ও মা খুবই আগ্রহভরে তার হাত দুটোর চলাফেরাটা লক্ষ করে চলে। বাজনাতে আকর্ষণবোধ করে গ্রেগর, সাহস ভরে অল্প করে করে সে এগোতে থাকে, শোয়ার ঘরে ঢুকে মাথাটা তোলে। অন্যদের জন্য কোনোরকম না ভেবে এতটুকু বিস্ময়বোধ করে না; এমন একসময় গেছে যখন সে তার বিচারবোধের বেশ গর্ববোধই করে। আর বিশেষ করে আজকের দিনটিতে তার অনেক কারণ রয়েছে তাকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার। তার শরীর ভরে রয়েছে ধুলো, আর ঘরেতেও রয়েছে ধূলোর স্তর, একটু নড়াচড়া করলেই ধুলো উড়তে থাকে; নোংরা জিনিস, চুল খাবারের এঁটো কাঁটা লেগে রয়েছে তার শরীরে, পিঠে, দু-ধারেও লেগে রয়েছে। সবকিছুর প্রতি তার যে উদাসীনতার ফলে এতই বেড়ে গেছে, কার্পেটের ওপরে ঘষে টষে নিজেকে রাখত, দিনে সে বেশ কয়েকবার এসব করেছে। তার এই অবস্থা সত্ত্বেও, সে যে থাকার ঘরের দাগশূন্য মেঝেতে ঢুকতে কোনোরকম লজ্জাবোধই করে না। 

নিশ্চিত, কেউই তার সম্পর্কে সচেতন ছিল না। বেহালা বাজনায় তাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছিল; আর ওদিকে ওরা পকেটে হাত দিয়ে মিউজিক-স্ট্যান্ডের পেছনে ছিল, এত কাছে ছিল যে সঙ্গীতের সবকিছু পড়তে পারছিল, এতে অবশ্য বোন বেশ অস্বস্তিবোধ করছিল, ওরা দ্রুত জানালার কাছে চলে যায়। মাথা কাছাকাছি নিয়ে অর্ধেক ফিসফিসিয়ে কী যেন বলে, দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে, তার বাবা আশঙ্কিত চোখ ওদের দিকে ফেরায়। তাদের ভাবে মনে হয় তারা এমন বাজনা শুনে খুশি নয়, এরচেয়ে অনেক বেশি ভালো বাজনা ওরা শুনেছে। তাদের শান্তির জন্য ভদ্রতাবশত ওরা বিরক্তিকর ব্যাপার সহ্য করে চলেছে। যেভাবে ওরা নাক মুখ দিয়ে সিগারের ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে, বোঝা যায় ওরা কীরকম অস্বস্তিতে কাটাচ্ছে। তবুও গ্রেগরের বোন বেশ সুন্দর বাজিয়ে চলেছে। একপাশে তার মুখটা এলানো, আগ্রহভরে বিষণ্ন হয়ে তার চোখ দুটো সঙ্গীতের নোট অনুসরণ করে চলেছে। সামনের দিকে গ্রেগর কিছুটা এগিয়ে এলো, মেঝের দিকে মাথাটা নিচু করে রাখে তাই এ সম্ভবনা তার বোনের চোখের সঙ্গে তার চোখ পড়তে পারে। সে কি এক জন্তু, তার ওপরে এমনভাবে সঙ্গীত প্রভাব পড়েছে? মনে হলো যেন তার সামনে একটা পথ খুলে যাচ্ছে অজানা সুখময়তার, তার এই তো প্রার্থনা। স্থির করে সে তাকে ঠেলে নিয়ে যাবে যে-পর্যন্ত-না তার বোনের কাছে পৌঁছয়, তার স্কার্ট টেনে ধরে। তাকে বলতে চায় তার বেহালাটা নিয়ে তার ঘরে আসতে হবে। কারণ সে যেভাবে একে তারিফ করবে আর কেউ এখানে তার বাজনাকে তারিফ করবে না। তার ঘর থেকে তাকে কখনও যেতে দেবে না অন্তত যতদিন সে বেঁচে থাকবে। এই প্রথম তার বীভৎস চেহারাটা তার কাছে বেশ কাজের হয়ে ওঠে, এখন তার ঘর থেকে সব দরজা পাহারা দিতে পারে, বাইরের কোনো অচেনা এলেই থু থু ছেটাবে, কিন্তু তার বোনের কোন বিব্রতবোধ করা উচিত নয়, মুক্তভাবেই সে তার সঙ্গে থাকা উচিত, তার পাশে সে সোফায় বসে থাকবে তার দিকে কানটা নামিয়ে রাখবে, তার বাজনা শুনে, সে তো ঠিকই করে ফেলেছিল কনজারভেটোরিয়মে পাঠাবে, তার এ-অঘটন না ঘটলে এই খ্রিস্টমাসে। অবশ্যই এই খ্রিস্টমাস অনেক আগেই চলে গেছে? কোনো ওজন আপত্তিতে সে গ্রাহ্যের মধ্যে না-এনে সকলের কাছে ঘোষণা করত যে ওকে আরও ভালো বাজনা শিখার জন্য পাঠাবে। তার এই স্বীকারোক্তি শুনে এতই স্পর্শ করত যে বোন কান্নায় ভেঙে পড়ত, তারপর গ্রেগর তার কাঁধে ওঠে তার গলায় চুমু দিত, এখন সে কাজে চলে যায়, রিবন বা কলার ছাড়াই খালি রেখে বেরিয়ে যায়। 

মাঝের ভাড়াটে গ্রেগরের বাবার দিকে চিৎকার করে ওঠে, “মিস্টার সামসা”। কোনো কথা বলে সময় নষ্ট না করে গ্রেগরকে দেখায়, নিজেই ধীরে ধীরে এগোয়। থেমে যায় বেহালা, মাঝের ভাড়াটে মাথা নাড়িয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাসে তারপর আবার গ্রেগরের দিকে তাকায়। গ্রেগরকে না তাড়িয়ে মনে হয় বাবা ভাবে যে ভাড়াটেদের মন শান্ত করাটা অনেক বেশি প্রয়োজন, যদিও তারা আদৌ উত্তেজিত হয়নি, আপাতভাবে বেহালা অপেক্ষা গ্রেগরকে দেখে অনেক বেশি উপভোগ করে। গ্রেগরের বাবা তাড়াতাড়ি ওদের দিকে ছুটে যায়, হাত দুটো ছড়িয়ে তাদের ঘরের দিকে ফিরে যেতে অনুরোধ করে এবং একই সঙ্গে তাদের দৃষ্টি থেকে গ্রেগরকে আড়াল করতে চায়। এখন ওরা সত্যি অল্প রাগতে শুরু করে, কেউ বলতে পারে না এই বুড়ো লোকটির আচরণের জন্য না-এতদিন ধরে গ্রেগরের মতো একজন পাশের ঘরে প্রতিবেশী ছিল অথচ না জেনে এর পাশেই এরা বাস করছিল। এর ব্যাখ্যা তার বাবার কাছে ওরা চাইছিল, ওরই মতো তারাও হাত নাড়ছিল, অস্বস্তিতে তারা দাড়িতে হাত বোলাচ্ছিল, তারপর অনিচ্ছাকৃতভাবে ফিরে যায় তাদের ঘরের দিকে। এরমধ্যে গ্রেগরের বোন ওখানে দাঁড়িয়েছিল, ও হতভম্ব হয়ে যায়, হঠাৎই বাজনাটা বন্ধ করে দেয়, আবার চেতনায় আসে, স্বরলিপিটার দিকে তাকিয়ে বেহালা ও ছড়টা দুহাতে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার মায়ের কোলের ওপর সে দুটো ঠেলে দেয়। তার মা চেয়ারে তখনও বসে থাকে, নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য লড়াই করে চলেছেন। আর এদিকে তার বাবা ওদের ভেড়া তাড়ানোর মতো ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার আগেই সে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যায়। বেশ অভ্যস্ত হাতে ওদের বালিশ, কম্বলগুলো সব ঠিকঠাক গুছিয়ে রেখে আসে ভাড়াটেদের ঘরে ঢোকার আগেই, বেরিয়েও আসে।

মনে হয় বৃদ্ধ লোকটি এত বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে একগুঁয়ে হয়ে ওঠেন যে ভাড়াটেদের যে সম্মানটুকু দেখানো উচিত তা ভুলে গেলেন। তাদের সে তাড়িয়ে চললেন, তাদের শোয়ার ঘরের দরজা পর্যন্ত তাদের তাড়িয়ে চললেন। মাঝের ভাড়াটে জোরে মেঝেতে পা ঠুকলে, তখন তিনি থামলেন। “আমি ঘোষণা করছি,” ভাড়াটেটি বলে, একটা হাত তুলে, এবং গ্রেগরের মা ও বোনের দিকে তাকিয়েও, কারণ যেহেতু এ রকম বিরক্তিকর পরিস্থিতি এই বাড়িতে ও এই পরিবারের মধ্যে রয়েছে—সাময়িক জোরের সঙ্গে মেঝেতে থুথু ফেলে—“আপনাদের আমি নোটিশ দিচ্ছি এখানেই। যে কদিন আমি এখানে থেকেছি তার জন্য স্বাভাবিকভাবে একটা টাকাও দেবো না, আর আপনাদের কাছে ক্ষতির জন্য কোনো ব্যবস্থা নেব কিনা, তাও ভাবব—আর বিশ্বাস করতে পারেন তার প্রমাণও সহজেই আমরা দিতে পারব।” থামে এবং তার দিকে জ্বলজ্বল চোখে তাকায়, যেন তার কাছে কিছু আশা করে। তার বন্ধু দুজনে তখুনি ছুটে আসে এবং বলে ওঠে, “এই মুহূর্তেই আমরাও নোটিশ দিচ্ছি।” এরপর দরজাটার হাতলটা ধরে এবং দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। 

গ্রেগরের বাবা, অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে টলতে টলতে সামনের দিকে এগোয়, পড়লেন চেয়ারের ওপরে। দেখে মনে হলো যেন তিনি নিজেকে প্রতিদিন সন্ধের ঘুমেতে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। তার মাথা ঝাঁকানিটা যেন তার আয়ত্তের বাইরে এবং তিনি বোঝাতে চান তার এখনও ঘুম আসতে দেরি আছে। ভাড়াটেরা যেখানে সব সময় গ্রেগরকে দেখেছিল সেখানেই সে শান্তভাবে পড়ে থাকে। তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ, সম্ভবত অসম্ভব খিদের জন্য তার দুর্বলতা জাগে, তার পক্ষে নড়াচড়াও অসম্ভব হয়ে ওঠে। তার ভয় করছিল, কিছু পরিমান ভালোমত নিশ্চিতও ছিল, যেকোনো মুহূর্তে এই দ্বন্দ্বে তার ওপর আক্রমণ হতে পারে আর সে শুয়ে অপেক্ষাও করছে। মায়ের কোলে যে বেহালাটা ছিল, মায়ের হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে থাকে, পড়ে যায় বেহালাটা শব্দ করে, সেই-শব্দ তাকে এতটুকু ভয় পাওয়ালো না, প্রতিক্রিয়াও হলো না। 

“প্রিয় বাবা-মা” তার বোন টেবিলের ওপর চাপড় মেরে ভূমিকা হিসেবে বলে, “এভাবে আর চলতে পারে না। সম্ভবত তোমরা বুঝতে পারছো না, কিন্তু আমি পারছি। এই জীবটির উপস্থিতিতে আমার ভাইয়ের নামটা উচ্চারণ করছি না, আমি যা বলছি তা হলো: এর থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ওর দেখাশুনা করার চেষ্টা আমরা করেছি, মানুষের পক্ষে যতটা সহনীয় তা আমরা করেছি। আমি মনে করি না এজন্য আমাদের একটুও কেউ দোষ দেবে।”

“ও ঠিকই বলেছে,” গ্রেগরের বাবা নিজেকেই বলে। তার মা যে এখনও শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে, হাতের মাঝে শুকনো কাশি কাশতে থাকে, চোখে তার বুনো চাহনি। 

তার বোন ছুটে আসে তার মায়ের দিকে, কপালটা তুলে ধরে। গ্রেটের কথায় মনে হয় তার বাবার মোহভঙ্গ হয়েছে। সে আরও সোজা হয়ে বসে। ভাড়াটিয়াদের খাবার-থালা যা এখনও টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে তার ওপর কাজের টুপিটা আঙুল দিয়ে নাড়াতে থাকে আর গ্রেগর স্থির শরীরটার দিকে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখে। 

“ওর থেকে আমাদের রেহাই পেতে হবেই,” তার বোন বাবাকে স্পষ্ট করে বলে। একথা শুনে তার মা বেশ কাশতে থাকে, “এ তোমাদের দুজনে মৃত্যুর সামিল, আমি দেখতে পাচ্ছি তা ঘনিয়ে আসছে। যখন আমরা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে চলেছি, সবাই করছি, আর বাড়িতে সব সময় অনবরত উপর থেকে চলতে থাকে একজন সহ্য করতে পারে না। অন্তত আমি তো আর পারছি না।” আর সে এমন কান্নায় ভেঙে পড়ে, তার চোখের জল মায়ের মুখের ওপর পড়ে, মা সেখান থেকে জলটা মুছে নেয় যান্ত্রিকভাবেই।

“সোনা,” সহানুভূতি স্বরে বুড়ো মানুষটি বলে, স্পষ্টই বুঝেছেন তিনি, “কিন্তু আমরা কী করতে পারি?”

গ্রেগরের বোন কেবল তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে তার অসহায়তার কথাই প্রকাশ করে, আর কোথাও যেন তার কান্নার সময় তার আগের আত্মবিশ্বাসে একটা বড়রকম বৈসাদৃশ্য ফুটে ওঠে। 

“যদি সে আমাদের বুঝতে পারে,” বাবা বলে, অর্ধেক প্রশ্নের সঙ্গে; গ্রেটে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে তখনও, জোরে জোরে একটা হাত নাড়িয়ে দেখায় কী অচিন্তনীয় ব্যাপার!

যদি সে আমাদের বুঝতে পারে, বুড়ো মানুষটি পুনরাবৃত্তি করলেন, তার চোখদুটো বন্ধ করে তার মেয়ের বিশ্বাসকে বিবেচনা করে যে তাদের বোঝাপড়াটা অসম্ভব, “তারপর সম্ভবত আমরা ওর সঙ্গে কিছু ব্যাপারে সমঝোতায় আসতে পারি। কিন্তু এ একই—”

“ওকে যেতেই হবে”, গ্রেগরের বোন চিৎকার করে ওঠে, “ওটাই একমাত্র সমাধান, বাবা। এ হচ্ছে গ্রেগর। আর ওটা তোমাদের মাথা থেকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করতে হবে। সত্যি কথা কি আমরা এতদিন বিশ্বাস করে এসেছি আমাদের সকল কষ্টের মূলে রয়েছে ও। কিন্তু এতে গ্রেগরের কী হতে পারে? যদি এ-গ্রেগর হয় তবে ও বুঝত এতদিন ধরে কোনো মানুষ এ-রকম জীবের সঙ্গে থাকতে পারে না, ও তো নিজেই চলে যেতে পারত। তাহলে আমাদের কোনো ভাই থাকত না, আমরাও বেঁচে যেতাম, আমাদের স্মৃতিতেও সম্মানের সঙ্গে থাকত। এই অশুভের মতো আমাদের পেছনে পেছনে থাকত না, আমাদের ভাড়াটেদের তাড়াচ্ছে, আর পুরো বাড়িটা ওর নিজের করেই চায়, আর আমরা হয়ে যাই ফুটপাতের বাসিন্দা। “দেখো, দেখো বাবা”, চমকে উঠে তখনই, “ও আবার এসেছে!”এক প্রবল আতঙ্কে সে মাকেও ছেড়ে যায়, এটা গ্রেগরের কাছে বোধগম্য হয় না। আক্ষরিক অর্থেই চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়, যেন গ্রেগর এত সামনে থাকলে সে মাকেও ত্যাগ করতে পারে। ছুটে যায় বাবার পেছনে, বাবাও উঠে দাঁড়ায়, তার এই আতঙ্কে সে-ও কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে, হাতটা অর্ধেক ছড়িয়ে দেয় যেন ওকে রক্ষা করছে।

তবু কাউকে ভয় দেখানো এতটুকু ইচ্ছে গ্রেগরের ছিল না, যতটা তার বোন পেয়েছে ততটুকুও নয়। তার ঘরের দিকে বুকে হেঁটে যাওয়ার জন্য ঘুরতে শুরু করে, কিন্তু এ-অবশ্যই সেদিনে ঐ চমকপ্রদ ঘটনা দেখতে গিয়েই তার এ-রকম পঙ্গু হয়ে ওঠা, এতে ঘুরতে তার বেশ কষ্ট হয়, কেবল সে মাথাটা তুলতে পারে, মেঝেতে ঘেষতে ঘেষতে চলতে হয় বার বার। থামে আবার তাকায় চারদিকে। দেখে নেয়। তার এই শুভ ইচ্ছে মনে হয় সবাই বুঝতে পেরেছে। এ ভয় তার সাময়িক। এখন সবাই নীরব বিষণ্নতায় দেখছে। চেয়ারেই রয়েছেন তার মা। আড়ষ্ট পা-দুটো টেনে নেন, এক পায়ের ওপর আরেক পা চেপে ধরেন, অকারণ ভয়ে চোখ দুটো প্রায় বুজে যায়, তার বাবা ও বোন দুজনে বসে আছে পাশাপাশি, আর বোনের হাত দুটো বুড়ো মানুষটার গলায় জড়িয়ে রাখে।

সম্ভবত আমি এখন ঘুরে যেতে পারব, ভাবে গ্রেগর, আবার সে পরিশ্রম করতে শুরু করে। তার এই কষ্টকর চেষ্টা থেকে নিজেকে থামাতে পারে না, থামতে হয়, তারপর নিঃশ্বাস নেয়। তাকে কেউ বিরক্তও করে না, তাকে সম্পূর্ণ নিজের মতো করে চলতে ছেড়ে দেয়। যখন সে পুরো ঘুরে গেল, সে তখনই সোজা পেছন দিয়ে বুকে ভর দিয়ে চলতে শুরু করে। ঘর থেকে তার যে দূরত্ব তা দেখে সে খুশিই হলো, সে বুঝতে পারে না কীভাবে এই দুর্বল শরীর নিয়ে এতটা পথ পেরিয়ে এলো, কেউই এ নিয়ে কোনো কথা বলেনি। যতটা সম্ভব বুকে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছে, সে শুধু দেখে এ-নিয়ে একটি শব্দ ব্যয় হয়নি, তার পরিবারের কারও ভেতর আনন্দ উচ্ছ্বাসও নেই, তার এই উন্নতিতে কেউ মনোযোগও দেয়নি। কেবল যখন সে দরজার কাছে পৌঁছে গেছে, মাথাটা ঘোরায়, পুরোটা নয়, কারণ তার ঘাড়ের মাংসপেশিগুলো বেশ শক্ত হয়ে গেছে, তবে সে বেশ ভালোই দেখল, তার ঘরে কিছুই বদল হয়নি। তার বোন উঠে দাঁড়ায়। শেষ বারের মতো মায়ের দিকে তাকায়, দেখে মা তখনও পুরো ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েননি। 

ঘরে পুরোটা সে ঢোকেনি, দরজাটা তাড়াতাড়ি ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দেয়, লাগিয়ে দেয় ছিটকিনিটা, তালাও লাগিয়ে দেয়। এই আচমকা শব্দটায় এত সে চমকে ওঠে, তার খুদে খুদে পা-গুলো অবশ করে দেয়। এই তাড়াতাড়ি আচমকা কাজটা বোন-ই করে। দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল, সামনের দিকে সামান্য লাফিয়ে আসে, তার আসাটার শব্দটা গ্রেগর শুনতে পায়নি, আর সে চ্যাঁচিয়ে ওঠে, “শেষ পর্যন্ত!” দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে বলে বাবা-মা-কে।

“এরপর কী?” নিজেকে বলে উঠে গ্রেগর, চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। শীঘ্রি সে আবিষ্কার করে, সে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে অক্ষম। এ তাকে অবাক করে না বরং এটা তার অস্বাভাবিক মনে হয় এই দুর্বল খুদে খুদে পা-গুলো কী করে চলছিল। এছাড়া সে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিই বোধ করে। সত্যি কথা কি পুরো শরীরটা ব্যথা করছে, কিন্তু মনে হয় আস্তে আস্তে ব্যথা কমে যাচ্ছে, হয়তো এ পুরোপুরি সেরে যাবে। তার পিঠে পচা আপেলটা, ক্ষতের চারপাশটায় ভরে গেছে নরম ধুলোয়, এখন আর তেমন কষ্ট দেয় না। স্নেহ মমতায় ও ভালোবাসায় সে তার পরিবারের কথা ভাবে। তার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা তার বোনের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছিল, আর সত্যিই যদি তা সম্ভব হতো। এই অবস্থায় শূন্য ও শান্তিময় ধ্যান অনুধ্যানের ভেতর সে রয়েছে, কখন যেন গম্বুজের ঘড়িতে তিনটে বেজে গেল, ভোর। জানালার বাইরে পৃথিবীর ঊষার আলো এসে ঢোকে তার চেতনায় আরও একবার। তারপর তার মাথাটা মেঝেতে নিজেরই মতো করে নেমে যায়, আর নাসারন্ধ্র থেকে তার শেষ নিঃশ্বাস কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে গেল। 

ঠিকে কাজের মহিলা সেসব দরজাগুলো দড়াম দড়াম করে আঘাত করে, তাকে অনুরোধ করা হয়েছে এমন করতে না, তবু কথা শোনে না। তার আসার পর এ-পুরো এ্যাপার্টম্যান্টের কেউই আর শান্তিতে ঘুমোতে পারে না—সে কোনো কিছু অস্বাভাবিক দেখে না, যেমন সে যথারীতি গ্রেগরের ঘরে উঁকি মারে তেমনই মারে। ভাবে গ্রেগর ইচ্ছে করেই ও-রকম স্থির হয়ে শুয়ে রয়েছে, চুপ করে থাকার এক ভান। তার সব রকম বুদ্ধির প্রশংসা করে। একটা লম্বা ডান্ডা সমেত একটা ব্রুমস্টিক নিয়ে আসে, সেটা দিয়ে জাগানোর জন্য খোঁচা মারতে থাকে দরজা থেকেই। যখন এতেও কোনো সাড়াশব্দ এলো না, সে আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে, আরও একটু জোরে গুঁতো মারে, বিনা বাধায় যখন গ্রেগরকে মেঝেতে অন্য পাশে ঠেলে দেয়, তখন তার খেয়াল হয়। তার ব্যাপারটা বুঝতে আর দেরি হয় না, তার চোখ দুটো বড় করে ফেলে, তার মুখ দিয়ে শিসের মতো শব্দ বেরোয়, আর সময় বেশি আর নষ্ট না-করে, সামসার শোয়ার ঘরের দরজাটা খুলে উঁচু স্বরে অন্ধকারের ভেতর চিৎকার করে ওঠে “এখানে দেখুন, এটা মরে গেছে, এটা মরে পড়ে রয়েছে, শেষ হয়ে গেছে।”

মিস্টার ও মিসেস সামসা তাদের দুই-শয্যার বিছানা থেকে চমকে ওঠে, ঠিকে কাজের মহিলাটির ঘোষণার অর্থটা বোঝার আগে তারা বেশ কষ্ট করেই ধাক্কাটা সামলালেন। তারপর তারা বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি নামেন, দুজনে দুদিক দিয়ে নামে, মিস্টার সামসা তার কাঁধে কম্বলটা ছুড়ে ফেলেন এবং মিসেস সামসার কেবল রাত্রিবাসটা রয়েছে, তারা দুজনে গ্রেগরের ঘরে এসে ঢোকেন। এরমধ্যে বসার ঘরটাও খুলেছে, ভাড়াটেরা আসার পর থেকে গ্রেটে এ-ঘরে ঘুমোয়, সে পুরো পোশাক পরে রয়েছে যেন সে গতরাতে শোয়নি, এটা নিশ্চিত হতে হয় ওর মুখের বিবর্ণতা দেখে। “মারা গেছে?” বলেন মিসেস সামসা, ঠিকে কাজের মহিলার দিকে প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে, যদিও নিজেই এর অনুসন্ধান আর করে না, অনুসন্ধান ছাড়াই এ-পরিষ্কারই বোঝা যায়। “তাই তো বলতে হয়,” ঠিকে কাজের মহিলা বলে, ব্রুমস্টিকটা দিয়ে তার কথা সত্যতা প্রমাণ করে গ্রেগরের মৃতদেহটা ঠেলে এপাশ থেকে ওপাশে সরায়। ও যেন ওকে আঘাত না-করে বাধা দিতে এগোতে চাইলেন মিসেস সামসা কিন্তু থেমে গেলেন। “বেশ,” বলেন মিস্টার সামসা, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ” নিজেই ক্রস আঁকলেন, এবং তিনজন মহিলাও তাকে অনুসরণ করলেন। গ্রেটে, ওর চোখ শবদেহ থেকে সরে না, বলে, “দেখ, কী পাতলা সরু হয়ে গিয়েছে, অনেকদিন ধরে কিছুই খেতো না, যা দেওয়া হতো তাই তো বের করা হতো।” গ্রেগরের শরীরটা আরও মিশে গেছে আর শুকনো, এখন আর পা সাহায্য করছিল না, ওকে দেখা যাচ্ছিল, কোনোকিছু আর আড়াল বা বাধা দিচ্ছিল না, কাছ থেকেই দেখা যাচ্ছে।

“আমাদের পাশে এসো, কিছুক্ষণের জন্য” বললেন মিসেস সামসা বিষণ্ন কাঁপা মৃদু হাসি হেসে। আর মৃতদেহটিকে পেছন ফিরে না-দেখে, তাদের শোয়ার ঘরের দিকে তার বাবা-মা-কে অনুসরণ করে। কাজের মহিলা দরজাটা বন্ধ করে দেয় এবং জানালাটা খুলে দেয় পুরো। যদিও এখন বেশ সকাল, এক টাটকা বাতাসে নরম আভাস রয়েছে। যাই হোক-এখন তো হয়ে গেছে মার্চের শেষ।

তিনজন ভাড়াটে তাদের ঘর থেকে বেরোয়, বিস্মিত হয় তাদের প্রাতরাশ না দেখে। রেগে জোরে ঝাঁঝালো গলায় বলে ঠিকে কাজের মহিলাকে। মহিলা ঠোঁটে আঙুল চেপে, তাড়াতাড়ি কোনও কথা না-বলে তার অভিব্যক্তিতে দেখিয়ে দেয় গ্রেগরের ঘরটা, তাদের ও ঘরে যাওয়া উচিত। ওরা গ্রেগরের ঘরে যায়, ঘরের ভেতর পুরো আলোতে ভরা, পড়ে রয়েছে গ্রেগরের মৃতদেহটা। ওদের ঢিলেঢালা কোটে হাত রাখে, দাঁড়িয়ে থাকে পকেটে হাত ঢুকিয়ে।

এরপর সামসাদের বসার ঘরের দরজাটা খুলে যায় এবং পুরো পোশাক পরে মিস্টার সামসা বেরিয়ে আসে, এক হাতে ওর স্ত্রী, অন্য হাতে ওর মেয়ে, একটু তাকালেন, মনে হয় কাঁদছিলেন, আর মাঝে মাঝে গ্রেটে তার বাবার হাতে মুখ ঢাকছিল। 

“আমার বাড়ি থেকে এখুনি বেরিয়ে যাও!” মেয়েদের থেকে নিজেকে না ছাড়িয়ে দরজায় দিকে নির্দেশ করে বললেন। “কী বলতে চাইছেন আপনি?” কিছুটা অবাক হয়ে ম্লান হেসে মাঝের ভাড়াটে বলে। অন্য দুজন পেছনে হাত নিয়ে ঘষতে থাকে, তারা এমন একটা অভাবনীয় কিছু আশা করে হয়তো ভাবে তারা জয়ী হবে। “আমি যা বলেছি সেটাই অর্থ,”— উত্তর দেয় মিস্টার সামসা। তার দুই সঙ্গী নিয়ে সোজা এগিয়ে গেলেন ভাড়াটেদের দিকে। প্রথমে শান্তভাবে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে যেন ভাবনাগুলো তার মাথায় এক নতুন রূপ নিচ্ছে। “তাহলে চলো আমরা যাই, আমরা চলে যাই,” বলে সে, আর তাকায় মিস্টার সামসার দিকে, যেন হঠাৎ এই অবমাননা থেকে খেসারত হিসেবে তার এই সিদ্ধান্তের কিছু নতুন স্বীকৃতি পেতেও পারে। মিস্টার সামসা কেবল অর্থপূর্ণ চাহনি দুয়েকবার দিয়ে অল্প মাথা নাড়ে। এরপরই ভাড়াটেটি সত্যি সত্যি হলের দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে যায়, তার দুই বন্ধু শুনতে থাকে, তাদের হাত দুটো ঘষা সম্পূর্ণ বন্ধ করে কিছুক্ষণের জন্য, ওরা তার পেছন পেছন ছুটে যায় যেন ভয় পায় মিস্টার সামসা তাদের আগে হলঘরে ঢোকে এবং তাদের দলপতির থেকে আলাদা করে দেবে। হলঘরের ভেতর তারা তিনজন টুপি তুলে তাক থেকে, ছাতার স্ট্র্যান্ড থেকে তাদের লাঠি, নীরবে মাথা নিচু করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তাদের সন্দেহ যে অমূলক তা প্রমাণিত হলো, মিস্টার সামসা এবং দুই মহিলা তাদের সিঁড়ির চত্বর পর্যন্ত অনুসরণ করে। রেলিং-এ ঝুঁকে ওরা দেখে ধীরে ধীরে তিনটি অবয়ব দীর্ঘ সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে নিশ্চিন্তভাবে, সিঁড়ির এক একটি বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে আবার আরেকটি তলায় এসে দেখা যাচ্ছে, এভাবে একটু সময়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে আবার দেখা যাচ্ছে, এভাবে, হ্যাঁ এভাবেই। তারা যত দুলতে থাকে সামসা পরিবারের স্বার্থও দুলতে থাকে, যখন একটি কসাইয়ের ছেলের সঙ্গে দেখা হয়, ছেলেটির মাথায় একটি ট্রে, গর্বের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে, ওপরে উঠে আসে, তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়, মিস্টার সামসা এবং দুই মহিলা শীঘ্রি চত্বর ছেড়ে চলে যায়, যেন মনে হলো তাদের ওপর থেকে বিরাট একটা ভার তুলে নেওয়া হলো, তারা ফিরে এলো যার যার নিজের ঘরে। 

তারা ঠিক করে আজকের দিনটা কাটাবে বিশ্রাম নিয়ে এবং ঘুরতে বেরোবে, কাজ থেকে তারা কেবল বিশ্রাম নিতে পারে না কিন্তু এটা তাদের প্রয়োজন। তাই তারা টেবিলে বসে এবং ক্ষমা চেয়ে চিঠি লেখে। মিস্টার সামসা লেখেন ম্যানেজমেন্ট অব বোর্ডকে, মিসেস সামসা লেখেন তাঁর মালিকের কাছে আর গ্রেটে ফার্মের প্রধানকে। যখন তারা লিখছেন সে-সময় ঠিকে কাজের মহিলা এসে ঢোকে বলার জন্য যে এখন সে যাচ্ছে, তার সকালের কাজ শেষ হয়ে গেছে। তার দিকে না-তাকিয়ে তারা কেবল ঘাড় নাড়ে, তবু সে যেতে ইতস্তত করে তখন ওরা বিরক্তি দেখায়, তার দিকে তাকায়। “বলো?” বলেন মিস্টার সামসা। ঠিকে ঝিটা দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসতে থাকে দরজার পাশে যেন তাদের কোনো শুভ সংবাদ দেওয়ার আছে কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস না করলে সে বলবে কী করে। তার মাথার ওপর টুপিটায় উটপাখির পালক খাড়া হয়ে গোঁজা, যেদিন থেকে ওকে কাজে লাগানো হয়েছে সেদিন থেকে ঐ-টুপিটা বেশ বিরক্তি আনে, ঐ-পালকটা খুশিতে এদিক-ওদিক উড়ছিল। “আচ্ছা, কী খবর বলো?” মিসেস সামসা জিজ্ঞেস করে, ঠিকে কাজের মহিলার থেকে অন্যদের চেয়ে সেই বেশি সম্মান পেয়ে থাকে। “ও”,-বলে মহিলা এমন খিলখিল করে হাসতে থাকে যে সে আর কথাই বলতে পারে না, এক সময় বলে, শুধু এই পাশের দরজার জিনিসটা থেকে আপনারা কীভাবে রেহাই পেলেন তা নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন নেই। এর আগেই তো আপনারা সব দেখেছেন।” মিসেস সামসা ও গ্রেটে নিচু হয়ে আবার চিঠি লেখা শুরু করে, যেন এটা আগেই ঠিক ছিল। কাজের মহিলাটি শুরু থেকে সবই বলার ইচ্ছে ছিল, এ বুঝতে পেরে মিস্টার সামসা ইশারায় হাত তুলে নিষেধ করেন। তাকে গল্পটি বলার অনুমতি না-দেওয়ায়, তার মনে পড়ে যায় তার তো অনেক কাজ রয়েছে, তাড়াহুড়ো করে, তার বেশ কষ্ট হলো: “বিদায়, সকলকে,” বলে সে, সাই করে ঘুরে, দরজাগুলো দড়াম দড়াম করে বন্ধ করে চলে যায়।

“আজ রাতেই ওকে নোটিশ ধরিয়ে দিতে হবে,” বললেন মিস্টার সামসা, কিন্তু তার স্ত্রীর থেকে বা মেয়ের থেকে, কারও থেকে উত্তর তিনি পেলেন না, কারণ তারা যে আনন্দটুকু পেয়েছিলেন তা ঐ ঠিকে কাজের মহিলাটি ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছে। তারা ওঠে, যায় জানালার কাছে, পরস্পর জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘুরে গিয়ে মিস্টার সামসা চেয়ারে গিয়ে বসেন, শান্তভাবে তাদের কিছুক্ষণ দেখেন। তারপর তাদের বলেন, “এখানে এসো, এখন লেখো। যা হবার তো তা হয়ে গেছে। আমার কথাটা তোমরা ভাবতে পারো, বিবেচনা করতে পারো।” তখনই তারা দুজন ব্যাপারটা অনুভব করে, ছুটে আসে তার কাছে, সান্ত্বনা দেয়, তাড়াতাড়ি তাদের চিঠি লেখা শেষ করে।

তারপর তিনজন একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে, কত মাস পরে তারা বেরোল, শহরের বাইরে খোলা গ্রামের দিকে, ট্রামে করে। ট্রামটিতে তারা কেবল তিনজন যাত্রী, আর ভরে আছে উষ্ণ সূর্যের আলো। আসনের পেছনে পিঠ এলিয়ে আরাম করে তারা তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ছবি আঁকছে, আর ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে এসে হাজির হয় এগুলো তো সব খারাপ নয়, যেসব কাজ তারা পেয়েছে, এসব তো কখনও পরস্পর আলোচনাও করেনি, এ তিনটি তো প্রশংসনীয়, আর ভবিষ্যতে ভালোর দিকে তাদের নিয়ে যেতে পারে। তাদের সবচেয়ে বেশি উন্নতি অবশ্য ঘটবে যদি তারা অন্য কোনো বাড়িতে চলে যায়, তারা একটা তুলনামূলক ছোট বাড়ি, আরও অল্প ভাড়ায় ভালো জায়গায় অফিসের কাছাকাছি একটা বাড়ি নিতে পারে। তারা যে বাড়িতে রয়েছে, যেটি গ্রেগর নির্বাচন করেছিল তাতো চালানো সম্ভব নয়। যখন এসব কথাবার্তায় তারা চলছিল মিস্টার সামসা এবং মিসেস সামসা প্রায় একই সময়ে, তাদের মেয়েটির বর্ধিত উচ্ছ¦লতা সম্পর্কে সচেতন হয়, সাম্প্রতিককালের সকল দুঃখ সত্ত্বেও তার গাল দুটো ফ্যাকাশে, তবু তার সুন্দর দেহাবয়ব নিয়ে ফুটে উঠছে এক সুন্দরী মেয়ে হয়ে। তারা চুপ হয়ে গেলেন, অর্ধসচেতনভাবে সম্পূর্ণ এক মত হয়ে দৃষ্টি বিনিময় করেন, সিদ্ধান্তে এলেন শীঘ্রিই তাদের মেয়েটির জন্য বর খুঁজতে হবে। আর এ তাদের নতুন স্বপ্নের নিশ্চয়তার মতো, সুন্দর ইচ্ছে তাদের। ভ্রমণ শেষে তাদের মেয়েটি প্রথম লাফিয়ে উঠে, মেলে ধরে তার যৌবন দেহটি।


অনুবাদ : মনোজ চাকলাদার 

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ