শীলা প্রামাণিক ।।
ঈদ আসতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। চারদিকে উৎসবের আমেজ। বাজারে মানুষের ভিড়, নতুন জামাকাপড়ের রঙিন সমাহার, শিশুদের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে আনন্দের এক ব্যস্ত সময়।
সেই আনন্দের ভিড়েই স্ত্রী সাথি বেগম আর দুই সন্তানকে নিয়ে নরসিংদী শহরে এসেছিল সুজন মিয়া। অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে কিনেছিল স্ত্রী আর সন্তানদের ঈদের পোশাক। ছোট ছেলে হাছেনের জন্য একটি পাঞ্জাবি, মেয়ে নয়নার জন্য গোলাপি রঙের একটি ফ্রক। সাথি বেগমের জন্য একটি লাল টুকটুকে শাড়ি। সাথি বেগমও খুশি। বারবার ব্যাগ খুলে সন্তানদের জামাগুলো দেখছিল।
বিকেলের দিকে তারা বাড়ি ফেরার জন্য স্টেশনে এল। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন দেখে অন্য অনেক যাত্রীর মতো তারাও এক পাশ দিয়ে উঠে অন্য পাশ দিয়ে নামার চেষ্টা করল। কে জানত, জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তটি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে!
হঠাৎ বজ্রপাতের মতো শব্দ।
দ্রুতগামী একটি ট্রেন ছুটে গেল পাশের লাইন দিয়ে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল।
মানুষের চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি আর আতঙ্কে চারদিক ভারী হয়ে উঠল।
সুজন মিয়া বুঝতেই পারল না কী ঘটেছে। যখন সব পরিষ্কার হলো, তখন দেখলেন তার পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। স্ত্রী সাথি বেগম ও দুই বছরের ছোট্ট ছেলে হাছেন আর কখনো কথা বলবে না।
সেই মুহূর্তে সে চিৎকারও করতে পারল না। তার মনে হলো বুকের ভেতরকার সমস্ত শব্দ যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
চারপাশের মানুষ কাঁদছিল, কিন্তু সুজন মিয়ার চোখে জল ছিল না। হয়তো শোক এত গভীর ছিল যে কান্নাও তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। স্ত্রীর দেহটি কাঁধে তুলে নিলো সে।
কিছুক্ষণ পর নিঃশব্দে বলল, "আমার ছেলেটাকে আমার বুকের কাছে দাও।"
মানুষজন নিথর শিশুটিকে তার বুকে তুলে দিলো।
ডান হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল বুকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছেলেকে, আর বাম হাতে ধরে রাখল পাঁচ
গল্প: স্ত্রৈণ পড়ুন
বছরের মেয়ে নয়নার ছোট্ট হাত।
নয়না কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে নিষ্পাপ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা, মা ঘুমিয়ে গেছে?’
সুজন মিয়া উত্তর দিতে পারল না।
কিছুদূর হাঁটার পর আবার প্রশ্ন করল, ভাই কথা বলছে না কেন?
সুজন মিয়ার ঠোঁট কাঁপল। গলার কাছে জমে থাকা কান্না যেন শব্দ হয়ে বের হতে চায়
কিন্তু বেরোয় না।
তার হাতে তখনও ঈদের কেনাকাটার ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে নতুন জামাকাপড়। যে জামা পরে ঈদের সকালে সন্তানদের হাসিমুখ দেখার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই জামাগুলো যেন এখন নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে আছে এক ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের।
এক মুহূর্ত! শুধু এক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল! সব স্বপ্নকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল নিয়তি।
সুজন মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে দীর্ঘ পথ। পাশে কেউ নেই, তবু হাজার মানুষ তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বললেন, বাবা, একটু বসো।
সুজন মিয়া মাথা নাড়ল।
সে জানে, বসলে হয়তো আর উঠতে পারবে না। তাকে এগোতেই হবে। কারণ তার হাত ধরে আছে নয়না।
নয়না আবার জিজ্ঞেস করল,---বাবা, মায়ের কী হয়েছে? ভাই কথা বলছে না কেন?
এবার সুজন মিয়ার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল।
সে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওরা আর কথা বলবে না মা। ওরা শুধু আমাদের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকবে। চিরদিন থাকবে। সবসময় থাকবে।
আকাশে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে। লাল আলো পড়েছে রেললাইনের ওপর।
সুজন মিয়া অনুভব করল, তার জীবনটাও যেন দু'ভাগ হয়ে গেছে, এক ভাগে ছিল হাসি, সংসার, স্বপ্ন, আর অন্য ভাগে আছে শুধু স্মৃতি আর দায়িত্ব।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল। কাঁধে স্ত্রীর নিথর দেহ, বুকে সন্তানের শেষ স্পর্শ, আর বাম হাতে জীবনের শেষ আশ্রয় তার ছোট্ট মেয়ের হাত।
চারদিকে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, কিন্তু সেই ছোট্ট হাতের উষ্ণতাই যেন তাকে বলে যাচ্ছিল
"বাবা, তুমি ভেঙে পড়ো না। আমি এখনও আছি।"
আর সেই একটুকরো বেঁচে থাকা আশাকেই বুকের মধ্যে আঁকড়ে নিয়ে হতভাগ্য বাবা অন্ধকারের দিকে নয়, জীবনের দিকে এগিয়ে চলল।
০১.০৬.২০২৬



0 মন্তব্যসমূহ