আরিফ নজরুল
বাংলা কবিতার আধুনিক ধারায় অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর কবি মহাদেব সাহা। ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ সাহা এবং মাতা শান্তিময়ী সাহা। মহাদেব সাহার জন্মকালীন সময় ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম পর্যায়। সেই সময়ের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব তাঁর বাল্য মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী ও স্বভাব কবি। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, নদী, সন্ধ্যা ও মৌনতা তাঁর শৈশবকাল থেকেই সঙ্গী হয়ে ওঠে। গ্রামের সহজ, সরল জীবনের অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের দারিদ্র্য ও সংগ্রাম তাঁর মানসে মানবিকতা ও মমতার বীজ বপন করে। এই মাটি ও মানুষের ঘ্রাণই পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে এক অন্তঃসারসত্তা।
মহাদেব সাহা শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ পেরোন কাশিমপুর স্কুলে। এরপর তিনি ভর্তি হন সিরাজগঞ্জ কলেজে। স্কুল ও কলেজজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করে স্থানীয় পত্রিকা ও দেয়ালপত্রিকায়। তাঁর কবিতা প্রথমে নজর কাড়ে পাঠকের, পরে সমালোচকের। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ভর্তি হন। এখানেই তিনি সাহিত্যচর্চার পোক্ত ভিত্তি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপকদের সংস্পর্শ, ঢাকা শহরের সাহিত্যিক পরিবেশ, এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অভিঘাত তাঁকে একজন সমাজসচেতন ও মানবতাবাদী কবিতে পরিণত করে।
শিক্ষা শেষ করে মহাদেব সাহা দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন বহু বছর। তাঁর সম্পাদকীয় দক্ষতা এবং সাহিত্যানুরাগের ফলে সংবাদ সাহিত্যপাতা হয়ে ওঠে সময়ের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সাহিত্য প্ল্যাটফর্ম। এখানে তিনি বহু নবীন লেখকের সৃষ্টি তুলে ধরেন, আবার নিজেও নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় তিনি ছিলেন একাগ্র। ষাটের দশক থেকেই বাংলা কবিতার নতুন ধারার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন তিনি। কবিতার মূলস্রোতে প্রেম, দ্রোহ, নিঃসঙ্গতা, সমাজবাস্তবতা এবং দার্শনিক চেতনা তাঁর কবিতার প্রাণবিন্দু হয়ে ওঠে।
মহাদেব সাহার কবিতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো— মরমি আবেগে ভরপুর আধুনিক প্রেম ও নিঃসঙ্গতার কবিতা। তাঁর কাব্যভাষা সহজ, কিন্তু গভীর। শব্দচয়ন সংযত; চিত্রকল্প নির্মাণে আছে ব্যতিক্রমী শৈল্পিকতা। তাঁর কবিতায় প্রেম আসে নিঃসঙ্গতা ও আত্মদহন নিয়ে, আবার আসে গভীর জীবনবোধ ও অস্তিত্বচেতনা নিয়েও। তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো— “প্রেম ও মৃত্যু” দুই-ই একসঙ্গে চলতে থাকে, কখনো সমান্তরাল, কখনো বিপরীতমুখী। এই দ্বন্দ্বই তাঁর কবিতাকে করে তোলে দার্শনিক ও নন্দনচেতনামূলক। তাঁর কাব্যচিন্তায় প্রকৃতি ও মানবতা— দুই-ই এক অপার্থিব ভারসাম্যে থাকে। যেমন: “তুমি নাই তবু আছ, আমি আছি তবু নেই... এই তো আমাদের ভালোবাসা।” এই পঙ্ক্তিগুলো আমাদের নিয়ে যায় প্রেম ও অস্তিত্বের এক গূঢ় পরিমণ্ডলে, যেখানে ‘থাকা’ এবং ‘না-থাকার’ মধ্যকার সীমারেখা ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশটিরও বেশি। উল্লেখযোগ্য কিছু কাব্যগ্রন্থ হলো— ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’, ‘অন্য কোনোখানে অন্য কারো স্বপ্নে’, ‘চরণচিহ্ন আঁকা পাথর’, ‘প্রতিদিন তুমি’, ‘আমি তোমাকে খুঁজে ফিরি’, ‘ভালোবাসা ও ঘৃণার দ্বীপ’, ‘জীবনের একেকটা দিন’, ‘ভুবনের মুখোমুখি’। এছাড়া স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শিশুতোষ রচনাও লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাহিত্য ও মানবিকতা’, ‘কবিতা ও কালের সম্পর্ক’ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারসমূহের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০০১), আনন্দ পুরস্কার (কলকাতা), জাতীয় কবিতা পুরস্কার, সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, সুকান্ত সাহিত্য পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং কথাসাহিত্য পুরস্কার। এই পুরস্কারসমূহ কেবল তাঁর শিল্পের স্বীকৃতি নয়, বরং একধরনের প্রজন্মান্তরের মর্যাদাসূচক অভিজ্ঞানও।
আবৃত্তি : এক কোটি বছর তোমাকে দেখি না
মহাদেব সাহার ব্যক্তি-জীবনও তাঁর কবিতার মতোই অন্তর্মুখী, নিঃসঙ্গ ও অনাড়ম্বর। তিনি কখনো সাহিত্যের আড়ম্বরিক জগতে নিজের পরিচিতি খোঁজেননি। বরং নিরবে, নিভৃতে লিখে গেছেন অন্তর্জাগতিক প্রেম ও মমতার কবিতা। তাঁর কাব্যজীবন জুড়ে রয়েছে এক ধরনের নির্জন সাধনার রূপ। তিনি বারবার বলেছেন, কবিতা তাঁর কাছে একটি আত্মশুদ্ধির ধারা। প্রেম ও মৃত্যু, অভিমান ও ক্ষমা, আশ্রয় ও বিসর্জনের চিরায়ত দ্বন্দ্ব তাঁর দার্শনিক চেতনার ভিত গড়ে তোলে।
বাংলা কবিতায় তিনি এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা কেবল ছন্দে বা ভাষায় নয়, বরং চেতনায় ও অনুভবে। তাঁর কাব্যভাষা নবীন প্রজন্মের কবিদের জন্য এক উজ্জ্বল পাঠশালা। ষাটের দশকের আধুনিক কবিতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি প্রেম ও নিঃসঙ্গতাকে দিয়েছিলেন নতুন নন্দনচেতনা। তাঁর কবিতা পড়লে বোঝা যায়— প্রেম কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা মানবিক, চিরায়ত এবং অতল এক দার্শনিকতা। নতুন প্রজন্মের বহু কবি তাঁর কাছ থেকে শব্দের স্বরলিপি, আবেগের সংগীত এবং শূন্যতার শব্দ শিখেছেন।
মহাদেব সাহা শুধুই একজন কবি নন; তিনি বাংলা কবিতার এক আলোকবর্তিকা, যিনি প্রেম, নিঃসঙ্গতা, বেদনা এবং অস্তিত্বের যে ছায়া-আলো নির্মাণ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনুপম, শুদ্ধতম ভাষা। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায়— ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও, তার ছায়া থেকে যায় হৃদয়ের প্রতিটি কোণে। সেই ছায়াতেই জন্ম নেয় কবিতা। মহাদেব সাহার কবিতা আমাদের মনের গহন কুঠুরিতে আলো দেয়। তিনি যেমন প্রেমের কবি, তেমনই মানবতারও কবি। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিনাশী অধ্যায় হয়ে থাকবে চিরকাল।
লেখক : কবি ও প্রকাশক
0 মন্তব্যসমূহ