জুনান নাশিত-এর একগুচ্ছ কবিতা

 

লক্ষ্মণরেখা

ছায়ার গভীরে ছায়াদের নাম নেই
মননের ধারা নেই বোধের চিবুকে
শরতের কাশভোরে শীতের সন্ন্যাস
বুক জুড়ে জিঘাংসার বিষ।
তাকাতে পারি না চোখ তুলে
নাভিমূল ঘিরে থাকে নির্ণীত সন্ত্রাস
কি হবে? কি হবে তারপরে?
আতকিংত সূত্রে গেঁথে থাকা শ্বাস
কেবলই উজান খোঁজে সম্ভাবনার....
ভাটির নগরী জুড়ে চোরাবালি ত্রাস
কে ডোবে? কারা ডোবে?


চারিদিকে ধূ ধূ গায়েবানা ডাক।
রক্ষা করো প্রভু!!!
লক্ষ্মণরেখা ভেঙে আমার জননী আজ
নৌকা ভাসাবেন নূহের প্লাবনে।

ষড়যন্ত্র
কাঠগড়ায় নাভিশ্বাস;
শুনানিতে অংশ নিচ্ছে কতিপয় মানুষ
সাক্ষী আকাশ, বাতাস, পাখি, ফুল, লতা আর পাতা
সমুদ্র বলেছে, আসবে না। আজ তার ঘুমদিবস
চৈত্রের ঘূর্ণিতোলা নিকষ অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকবে সে।
সমুদ্র আসলে ফন্দি আঁটছে
জনগণ যখন স্বপ্নঘোরে, ভোরের অপেক্ষায়
অমুদ্রিত শংকায় ডুবে থাকা চিরসবুজ এই জনপদ
ভাসিয়ে নেবে সে।
অথচ মানুষেরা হাওয়া খায় সমুদ্রবেলায়।

সম্পর্ক
কোথাওতো যেতে পারতাম!
যাইনা কোথাও কতোকাল
পায়ে হেঁটে অথবা গাড়িতে
রিকশাও মন্দ নয়
টুং টাং ধ্বনিতে ইশারা ভেজা ডাক
ধীর লয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে ছায়ার ভেতর।
শঙ্খস্বরের উজানে চোখে চোখ রাখিনা অনেকদিন
নগরী এড়িয়ে দূরের নির্জনে হেঁটে যেতে যেতে
জানতে চাওনা আর পড়া হলো কিনা
শঙ্খঘোষের জার্নাল কিংবা নেরুদার অনুস্মৃতি
অথবা টমাস মান,
আমাদের কোন দ্বন্দ্ব নেই আর
তর্ক, যুদ্ধজয়, হারজিতের অভিলাষ
আমরা কেমন করে যেন ভুলে গেছি
কেউটের ছোবল ডিঙিয়ে কিভাবে হারিয়ে যেতে হয়
দশদিগন্ত ছাড়িয়ে আরো দূরে ইচ্ছেগতির ডানায়।
আজ গ্রহণের কাল
ভালোবাসাহীন গল্পগাঁথা জুড়ে ঢাকের তরল শব্দ
প্রতিধ্বনিময়
আর আমাদের চোখে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরের শিখা
হৃদয় চৌকাঠ শব্দহীন
মরণোত্তর দিনের গল্পে আমাদের মায়ার শকট
একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়।

অপূর্ণতা
উপলক্ষ নেই।
তবু আসো, কাছে বসো
দক্ষিণ দিগন্ত বাঁকে যে কথারা হারিয়েছে সেই কবে
সেসব বিষণœতার ঘ্রাণ ছুঁয়ে
থাকো পাশে।
ঘোর নেই
নেই ছিন্নতার রেশ
শুধু মুখোমুখি নিঃশ্বাসের ঢাক
যার বাহুমূলে চাপা পড়ে আছে
বহুদিন ধরে জমে থাকা
আমাদের আজন্ম তিয়াস।

পারো?
নামতে জানো? ভাঙতে?
জীবন জুড়ে খেলতে জানো?
দূরের রেখা মাঙতে?
ভুলতে জানো? আঁকতে?
নগ্ন লেখায় শীতল মায়া
চোখের কোণে ঢাকতে?
পারো? জাগতে?

কালো বিষ
ছুরির ফলায় গেঁথে আছে চোখ
হাড়ের ভেতর অগ্নিধারা
অদৃশ্য কপাল জুড়ে অপেক্ষার শিরস্ত্রাণ।
মণি দু’টো শব্দহীন কান্নার ভেতর ডুবে যাওয়ার আগে
আমি অপেক্ষার শিরস্ত্রাণ খুলে ঘুরে আসি
জীবন খোয়ানো সেই মুহূর্তের পাড়ে
একদিন যেখানে তোমার কাঁধ ছুঁয়ে উড়িয়েছি
অজস্র বাতাস, মিলিয়েছি ঠোঁট, জিহ্বার করতল।
আজ প্রতি তিরস্কারে বাজালে যে সুর
তাতে বৈকল্যের খরা, কালো বিষ।
চোখ দু’টো ছুরির ফলায়
নাকের দুপাশে আকাঙ্ক্ষার রক্তদাগ।

পথটা দু'ভাগ হবে

হতেও তো পারে দুপুরটা মিলবে না বিকেলের গায়ে
পথটা দু’ভাগ হবে তুমি চলে যাবে ডানে আর আমি বাঁয়ে
খোলসটা উড়বে কেবল ভাঙা ফ্রেম অলৌকিক বনে
তুমি ফিরবে কি ফিরবে না আমি কি জানতে চাবো
জনে জনে?
ইচ্ছে হলে এসো ফেলে রেখে রাশি রাশি স্তব
আমি যে তখন থাকবো না ধুয়ে মুছে তুলে রেখো
আমাদের সম্পর্কের শব।

আমি মূলত কিছুই বলবো না
জীবন সম্পর্কিত তোমার শেষ প্রশ্নের জবাব আমি দিইনি, ইচ্ছে করেই
কারণ, আমি নির্জনতা ভাঙতে চাইনি। দীর্ঘ বিরহপুকুর পাড়ি দিয়ে যে নীল
নির্জনতায় আমার ঘর, আমি চাই না তার পাশে ঘুঘু ডাকুক
বরং উড়ে যাক চৈত্রের বিষণ্ণ বাতাস, পাতা ঝরুক টুপটাপ
মোহনার অবাধ্য ঘূর্ণিতে চকিতে ঝিলিক দিক নুয়ো আসা ক্রোধ, জিজ্ঞাসা,
অবজ্ঞার ধারণা সূচক শ্লথগতির কিছু স্ন্যাপশর্ট।
আমি তোমাকে জানাতে পারতাম সন্ধ্যার অল্প আঁধারে কিভাবে
মাধবী ফুলের পাপড়িগুলো সাদা থেকে হালকা গোলাপী হয়ে যায়,
কিংবা তোমাকে ডেকে দেখাতে পারতাম চোখের মনিতে
চিৎ সাঁতার হয়ে ভেসে থাকা আনন্দ উজান কিভাবে পরাজয়ের গ্লানিতে ঢেকে যায়
আমি এসবের কিছ্ইু করিনি, করবো না
জীবন এক অনির্ধারিত অস্তিত্বের ছায়ামাত্র, সে কথাও তোমাকে বলবো না।
আমি মূলত কিছুই বলবো না, বলতে চাইওনা।

নিয়তিপুরাণ

কতোদিন দেখিনা, স্মৃতির ভেতরে শূণ্য আসবাব
সেখানে মরা ইঁদুরের ঘ্রাণ।
তুমি কি দেখো? কাউকে?
দু’হাত বাড়িয়ে কাছে এসে যে কিনা বলবে
কেন কাঁদো মেয়ে? ভালোবাসা ভেঙে গেছে? যাক
আলোর ফিনকি থেকে ছুটে আসা রঙ একদিন
তোমাকেও রাঙাবে, ডাকবে নতুন শপথ।
কতোদিন দেখি না চাঁদ। কতোদিন গাছ, পাথর
যেখানে বেদনাগুলো মৃত্যুর ইচ্ছে নিয়ে ভেঙে যাবে
ভেসে যাবে নিয়তিপুরাণ
কতোদিন দেখি না
আহা সোনা, তোকেও কতোদিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ