Header Ads Widget

আয়না


হারুকি মুরাকামি

আজ রাতে তোমরা যেসব গল্প বলছ, ওদের সম্ভবত দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একটা ধরন হল : একদিকে জীবিতদের পৃথিবী এবং অন্যদিকে মৃতদের পৃথিবী আর কোনও একটা শক্তি যা একদিক থেকে অন্যদিকে তাদের পারাপার করে। এতে ভূত এবং ওইরকম কিছু অন্তর্ভুক্ত করা যায়। দ্বিতীয় ধরনের মধ্যে পড়ে অস্বাভাবিক, অবৈজ্ঞানিক ক্ষমতা, কোনও দুর্ঘটনার পূর্বাভাস জানা এবং ভবিষৎ বলার ক্ষমতা। তোমাদের সব গল্পই এই দুটো ভাগের  মধ্যে পড়ে। 

আসলে তোমাদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণভাবে এই দুটো ভাগের একটার মধ্যেই পড়তে চায়। আমি বলতে চাইছি, যারা ভূত দেখে, তারা শুধু ভূত দেখে। তাদের কোনও পূর্বানুমান  থাকে না। আর যাদের পূর্বানুমান থাকে, তারা ভূত দেখে না। আমি জানি না, কেন। কিন্তু দেখা যায় প্রত্যেকেরই হয় এটা নয় ওটার প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে যায়। অন্তত আমার এরকমই ধারণা।

নিশ্চয়ই কিছু লোক আছে, যারা এই দুই দলের কোনওটার মধ্যে পড়ে না। যেমন আমি। আমার এই ত্রিশ বছরের জীবনে কখনও  একবারও ভূত দেখিনি; কোনও সময়েই পূর্বানুমান করতে পারিনি কিংবা দৈবস্বপ্নও দেখিনি। একবার আমি দুইজন বন্ধুর সঙ্গে লিফটে চড়ছিলাম। তারা দিব্যি দিয়ে বলল যে, একটা ভূতকে আমাদের সঙ্গে চড়তে  দেখেছে, কিন্তু আমি কিছুই দেখিনি। তারা দবি করল ওখানে ধূসর রঙের পোশাক পরা মহিলা ঠিক আমাদের ডানপাশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে আমাদের সঙ্গে কোনও মহিলা ছিল না। একমাত্র আমরা তিনজনই ছিলাম। কোনও ছেলেমানুষি নয়। ওই বন্ধু দুজন আমার সঙ্গে চালাকি করার মতো স্বভাবের ছিল না। পুরো ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাই ঘটনা যে, আমি এখনও পর্যন্ত কোনও ভূত দেখিনি।

কিন্তু একবার-মাত্র একবারই একটা অভিজ্ঞাতা হয়েছিল- যেটা আমাকে ভয়ে হতবুদ্ধি করে ফেলেছিল। এটা ঘটেছিল দশ বছরেরও বেশি আগে এবং আমি কখনওই এ সম্বদ্ধে কাউকে কিছু বলিনি। আমি এ নিয়ে কথা বলতে ভয় পেতাম। আমি অনুভব করতাম, যদি আমি বলি তবে ওটা আবার ঘটতে পারে। সুতরাং এ প্রসঙ্গ আমি কখনওই তুলিনি। কিন্তু আজ রাতে, তোমারা সবাই যখন নিজেদের ভয়ের অভিজ্ঞতা বলছ, আর আমি গৃহকর্তা হয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা কিছু যোগ না করলে ভালো দেখায় না। সুতরাং স্থির করেছি মন খুলে তোমাদের গল্প বলব। তাহলে বলি-

কাজী নজরুল ইসলামের গল্প ‘ সাপুরে কাহিনি’ পড়ুন

আমি ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে একটা হাইস্কুল থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছি-যখন ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। আমি একটা হিপি দলের সঙ্গে ছিলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে অস্বীকার করলাম। তার বদলে আমি নানা ধরনের কায়িক পরিশ্রম করে সারা জাপানে ঘুরে বেড়ালাম। আমি বুঝেছিলাম যে, ওইটাই ছিল জীবন ধারণের ঠিক পথ। তোমরা তো আমাকে যুবক ও করিৎকর্মা বলো। আজ  পেছনের দিকে তাকিয়ে মনে হয় তখন আমার দিনগুলো খুব মজাদার ছিল। সেটা ঠিক পছন্দের থাক বা না থাক-আমাকে আবার যদি তা করতে হয়, আমি নিশ্চিত যে, আমি তা করবই। 

আমার সারা দেশে ঘুরে বেড়ানোর দ্বিতীয় বছরের হেমন্তে দুমাসের জন্য একটা স্কুলে নৈশপাহারাদের কাজ নিয়েছিলাম। নিগাতা অঞ্চলে একটা ছোট্ট শহরে স্কুলটা ছিল। সারা গ্রীস্ম প্রচুর কাজ করে খুব ক্লান্ত হয়ে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্যই কাজটা নিয়েছিলাম। পাহারাদের কাজ তো আর রকেটবিজ্ঞান পড়া নয়, দিনের বেলা আমি চৌকিদারের ঘরে ঘুমোতাম আর সারারাতে দুবার আমাকে স্কুলবাড়িটা চক্কর দিয়ে নিশ্চিত হতে হত যে সব ঠিকঠাক আছে। বাকি সময় আমি সংগীতকক্ষে গান শুনতাম, লাইব্রেরিতে বই পড়তাম আর জিমন্যাসিয়ামে গিয়ে গিয়ে নিজে নিজেই বাস্কেটবল খেলতাম। সত্যি, সারারাত একটা স্কুলবাড়িতে একা  থাকা তেমন খারাপ কিছু নয়। আমি কি ভয় পেয়েছিলাম? একেবারেই না। যখন তোমার বয়স আঠারো কিংবা উনিশ-তখন কোনও কিছু পরোয়া করার নেই। 

আমার মনে হয় তোমরা কেউই নৈশপাহারাদারের কাজ করোনি তাই আমার কাজ কী ছিল, একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। রাতে দুবার চক্কর দিতে হবে-রাত নটা ও ভোর তিনটেয়। এটাই বাঁধাই রুটিন। স্কুলটা প্রায় নতুন কংক্রিটের তিনতলা দালান। আর আঠারো থেকে কুড়িটা শ্রেণিকক্ষ। তেমন বিশেষ কোনও স্কুল নয়। শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও একটা সংগীতকক্ষ, গার্হস্থ্য অর্থনীতিকক্ষ, চিত্রকলার স্টুডিও, বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি, কর্মচারীদের অফিস ও প্রধান শিক্ষকের অফিসঘর। এ ছাড়া আলাদা প্রেক্ষাগৃহ  ও ব্যায়ামাগার। আমার কাজ ছিল দ্রুত এগুলো পরিদর্শন করা। 

যখন আমি চক্ক দিই, তখন কুড়িটা নজরদারির বিষয়ে তালিকা নিয়ে মিলিয়ে দেখি। আমি প্রতিটি বিষয়ের পাশে টিক্ নিশানা অর্থে দিই। কর্মচারী অফিস-টিক্, সায়েন্স ল্যাব-টিক্। সম্ভবত ইচ্ছে করলে আমি চৌকিদারের ঘরে বিছানায় বসেই, যেখানে আমি শুই, ওইসব নজরদারির বিষয়ের পাশে টিক্ দিতে পারতাম-সত্যিকারে চক্করের ঝামেলায় না গিয়ে। কিন্তু অমি ওই রকম হালকা স্বভাবের ছেলে ছিলাম না। চক্কর দিতে বেশি সময়ও লাগত না। আর তা ছাড়া আমার ঘুমের সময় যদি কেউ ঢুকে পড়ত, তবে একমাত্র আমি আক্রান্ত হাতাম। 

যাই হোক, প্রতিরাতেই নটায় এবং তিনটেয় আমিই চক্কর দিতাম, বাঁহাতে একটা টর্চ ও ডানহাতে কাঠের একটা কেন্ডো তরোয়াল। কেন্ডো হল জাপানে প্রচলিত অসিক্রীড়ায় ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের বাঁশের তৈরি তরোয়াল, যা দুহাতেই ধরা যায়। আমি স্কুলে পড়ার সময় কেন্ডো অভ্যাস করতাম। আমার নিজের ক্ষমতা সম্বদ্ধে এতটা প্রত্যয় ছিল যে এটা দিয়ে যে-কোনও কাউকে মোকাবিলা করতে পারব। যদি শখের আক্রমণকারী হয় আর তার হাতে যদি বা সত্যিকারের তরোয়ালও থাকে, তা-ও আমাকে ভয় দেখাতে পারত না। মনে রেখো তখন আমি নবযুবক। যদি এমন এরকম ঘটে তবে প্রাণপণে দৌড়ে পালাব। যাই হোক, এটা অক্টোবরের শুরুতে একটা ঝড়ের রাতে ঘটেছিল। সেদিন আসলে মরসুমের তুলনায় একটু বেশি ভ্যাপনা গরম ছিল। মশার ঝাঁক সন্ধ্যার সময় জাঙ্গাল বেধেঁ উড়ছিল। মশা তাড়ানো বেশ কয়েকটি ধূপ জ্বেলে ওদের উপদ্রব থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিলাম। সশব্দে বাতাস বইছিল। সুইমিং পুলে যাওয়ারর গেট ভাঙা, হাওয়ায় গেটের পাট খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল। আমি ওটাকে ঠিকঠাক করার কথা ভাবলাম, কিন্তু বাইরে ঘন অন্ধকার তাই সারারাত ওটা শব্দ করছিল। 

আমার রাত নটার চক্কর দেওয়া ভালোভাবে হয়ে গেল। আমার তালিকার কুড়িটি বিষয়ের পাশেই টিক্ চিহ্ন ঠিকভাবে দেওয়া হল। সব দরজা তালাবদ্ধ, সবকিছু যথাযত জায়গায়। কোনও কিছুই অস্বাভাবিক নয়। আমি চৌকিদারের ঘরে গেলাম, আমার ঘড়িতে ভোর তিনটের অ্যালার্ম দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। 

তিনটের অ্যালার্ম বাজলে যদিও আমি জেগে উঠলাম কিন্তু একটু অদ্ভুত অনুভূতি হল। আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। কিন্তু, আমি অন্যরকম অনুভব করলাম। আমার যেন উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কেউ যেন আমার বিছানা ছেড়ে ওঠার ইচ্ছেকে জোর করে দমিয়ে রেখেছে।

আমি এরকম লোক যে সাধারণত তড়াক্ করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। সুতরাং আমি বিষয়টা বুঝতে পারছিলাম না। আমি জোর করে নিজেকে বিছানা থেকে তুলে চক্কর দেওয়ার জন্য তৈরি হলাম। স্যুইমিং পুলের গেটটা তখনও ছন্দে ছন্দে শব্দ করে যাচ্ছিল। কিন্তু এটা আগের চেয়ে অন্যরকম  শোনাল। নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছু হচ্ছে ভেবে বাইরে যাব কি-না ভাবছিলাম। কিন্তু মন স্থির করে নিলাম, যা-ই হোক না কনে, আমার কর্তব্য করতেই হবে। যদি কেউ একবার কর্তব্যে অবহেলা করে তবে বার বার এটা ঘটতে থাকবে; আর আমি এই অবস্থায় পড়তে চাই না। সুতারং আমি আমার টর্চ ও কাঠের তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

সেটা একটি সম্পূর্ণতই বিদঘুটে রাত। যত রাত বাড়ছে বাতাসের জোরও বাড়ছে আর হাওয়াতে আরও বেশি আর্দ্রতা। আমার চামড়া চিড়বিড় করছে কিন্তু সেদিকে আমি মনযোগ দিতে পারছিলাম না। আমি স্থির করলাম প্রথমে জিম, নাট্যশাল এবং স্যুইমিং পুল চক্ক দিয়ে আসব। সবকিছু ঠিকঠাক আছে দেখলাম। স্যুইমিং পুলের গেটটা হওয়ার দাপটে যেন কোনও পাগলের মতো পালা করে মাথা ঝাঁকিয়ে এবং দুলিয়ে শব্দ করে যাচ্ছিল। তাতে কোনও নির্দিষ্ট লয় ছিল না। প্রথম দুটি শব্দ হ্যাঁ-হ্যাঁ, তারপর না-না না... এটা অবশ্য তুলনা করার পক্ষে খুব বেমানান; আমি জানি, তবু আমি এরকমই অনুভব করছিলাম।

স্কুলবাড়ির ভেতরের অবস্থা স্বাভাবিকই ছিল। আমি ঘুরে দেখলাম আর আমার তালিকা টিক্ দিলাম। আমার ওই উদ্ভট অনুভব সত্ত্বেও অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি। ভারমুক্ত হয়ে আমি পাহারাদারের ঘরের দিকে ফিরে চললাম। আমার তালিকার শেষ বিষয়টা ছিল বয়লার ঘর। ক্যাফেটেরিয়ার পাশে যেটা দালানের পূর্বদিকে আর পাহারাদারের ঘরের ঠিক উলটোদিকে। এতে আমাকে দোতলার দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে ফিরে আসতে হবে।  আলকাতরার মতো কালো অন্ধকার। যে-রাতে চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে, দালানের বারান্দা সামন্য হলেও আলোকিত থাকে। কিন্তু, যখন চাঁদ থাকে না তখন কোনও জিনিসই দেখা যায় না। চলার পথে সামনের দিকে টর্চের আলো ফেলে দেখতে হয়-কোথায় যাচ্ছি। সেই রাতে পাশেই কোথাও টাইফুন হচ্ছিল; কাজেই আকাশে চাঁদ ছিল না। মাঝে মাঝে মেঘ কেটে গেলেও আবার অন্ধাকারে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। 

আমি বারান্দা দিয়ে স্বাভাবিক গতির চেয়ে দ্রুত হেঁটে আসছিলাম। আমার বাস্কেটবল খেলোর জুতোর রাবারের তলায় মেঝের লিনোলিয়ামে ঘষঘষ শব্দ করছিল। মেঝেটা  ছিল সবুজ লিনোলিয়ামের, রংটা ঝাপসা শ্যাওলার মতো, এখনও ছবিটা মনে আছে। স্কুলের প্রবেশ-পথটা হলঘরের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। যখন আমি হেঁটে চলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ থমকে ভাবলাম-এটা কী? আমার মনে হল অন্ধকারে কিছু একটা দেখেছি। আমি দরদর করে ঘামতে লাগলাম। হাতের তরোয়ালের হাতলটা আরও শক্ত করে মুঠোয় ধরে আমি যা দেখেছিলাম সেদিকে মোড় ঘুরালাম। আমি জুতো রাখার তাকের পাশে দেওয়ালে টর্চের আলো ফেলতেই সেখানে আমি ‘আমাকে’ দেখলাম। অন্যভাবে যদি বলি, যেন একটা আয়না। আয়নায় প্রতিফলিত আমার ছবি। সেখানে আগের রাতেও কোনও আয়না ছিল না। সম্ভবত তারা এই সময়ের মধ্যে এখানে আয়না বসিয়েছে। উফ্। আমি কি চমকে গিয়েছিলাম! এটা একটা দীর্ঘ আয়না। হাঁফ ছেড়ে ভবলাম, এ তো আয়নায় আমি। নিজেকে খুব বুদ্ধু মনে হল এত অবাক হওয়ার জন্য। আচ্ছা, তাহলে ব্যাপারটা এই, নিজেকে বললাম। কী হাঁদা! আমি টর্চ নিভিয়ে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালালাম। সিগারেটে একটা টান দিয়ে আয়নায় আমার প্রতিচ্ছবির দিকে চোখ ফেরালাম। বাইরে থেকে মৃদু রাস্তার আলো জানালার মধ্য দিয়ে এসে আয়নায় পড়েছে আমার পেছন দিক দিয়ে। স্যুইমিং পুলের গেট তখনও হাওয়ায় শব্দ করছিল। 

সিগারেটে আরও কয়েকটা টান দেওয়ার পর হঠাৎ আমি অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করলাম। আয়নার প্রতিচ্ছবি যেন আমি নই। বাহ্যত, এটা দেখতে ঠিক আমার মতোই। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই ওটা আমি নই। না, ঠিক তা-ও যেন নয়। এটা আমি অবশ্যই, কিন্তু অন্য আমি। অন্য আমি, যে-আমি কখনওই হওয়া উচিত ছিল না। কীভাবে এটা বোঝাব-বুঝতে পারছি না। ব্যাখ্যা করা মুশকিল, আমার কী অনুভাব হয়েছিল!

একটা বিষয় আমি বুঝেছিলাম যে, সেই অন্য অবয়ব আমাকে ঘৃণা করছে। তার ভেতরে অন্ধকার সাগরে ভাসমান বরফস্তূপের মতো ঘৃণা রয়েছে। এমন ধরনের ঘৃণা যা কেউ কখনও কমাতে পারবে না। 

শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প ‘স্বামী মানেই আসামি’ পড়ুন

আমি একটু সময় ওখানে দাঁড়ালাম- মূক ও বধির হয়ে। আমার আঙুলের ফাঁক থেকে সিগারেট খসে মেঝেতে পড়ল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার হাত-পা যেন কেউ বেঁধে রেখেছে। নড়ার উপায় নেই। 

শেষ পর্যন্ত তার হাত নড়ল, তার আঙুলের ডগা থুতনি স্পর্শ করল এবং ধীরে ধীরে পতঙ্গের মতো তার মুখমণ্ডল  ঢেকে নিল। হঠাৎ আমি টের পেলাম, আমিও ঠিক এরকম করছি। আমি যেন ওই আয়নার ভেতরে যা আছে তার প্রতিবিম্ব আর সে আমাকে অধিকার করে নিতে চাইছে। 

সর্বশক্তি প্রয়োগ করে প্রচন্ড কষ্টে আমি গর্জন করে উঠলাম এবং আমার ওইখানে অনড় হয়ে থাকা অবস্থাও কেটে গেল। আমি আমার কাঠের কেন্ডো তারোয়াল নিয়ে যত জোর সম্ভব আয়নায় আঘাত করলাম। আমি ঝন্ঝন্ করে আয়না ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেও একবারও পেছন ফিরে দেখলাম না এবং ঘরের দেকে দৌড়ে গেলাম। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বিছানায় চাদরের নিচে ঢুকে পড়লাম। সিগারেটের টুকরো মেঝেতে ফেলে এসেছি বলে দুশ্চিন্তা হলেও আমার তখন ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। সারারাত হাওয়ার দুরন্তপনা চলছিল এবং স্যুইমিং পুলের গেট ভোর পর্যন্ত জোরে বিকট শব্দ করছিল। হ্যাঁ-হ্যাঁ, না-না, হ্যাঁ-না-না...।

আমি নিশ্চিত আমার গল্পের শেষটা কী হবে তোমরা অনুমান করে ফেলেছ সেখানে কখনও কোনও আয়না ছিল না। 

যখন সূর্য উঠল, ততক্ষণে টাইফুন থেমে গেছে। হাওয়াও নিস্তব্ধ। একটা সূর্যালোকিত দিন দেখা দিল। আমি হেঁটে প্রবেশ-পথে গেলাম। সিগারেটের টুকরো যা আমি ওখানে ফেলেছিলাম ও আমার কাঠের তরোয়াল ওখানে আছে। কিন্তু কোন আয়না নেই। কখনওই ওখানে কোনও আয়না ছিল না। আমি যা দেখেছিলাম তা ভূত নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওটা আমিই ছিলাম। আমি কখনওই ভুলতে পারি না ওই রাতে আমি কী ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম এবং যখনই আমর মনে পড়ে তখনই ভাবি, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ের জিনিস হল আমার নিজের সত্তা তোমরা কী ভাবো?

তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, আমার ঘরে কোনও আয়না নেই। আয়না ছাড়া দাড়ি কাটতে শেখা খুব সহজ কথা নয়, বিশ্বাস করো।

শেষ


গল্পটি শুনতে পাবেন ইউটিউব চ্যানেলে

লিংক : গল্প: আয়না


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ