Header Ads Widget

ওমর কায়সার : কাব্যবিশ্বে রঙ, রোদ্দুর ও রূপকথার উড়ান


আরিফ নজরুল 

বাংলা শিশু-কিশোর কবিতার ধারায় ওমর কায়সারের নাম আজ এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ। তাঁর ‘এই রোদ্দুর যাবে কদ্দুর’ কেবল শিশুদের জন্য লেখা কবিতার বই নয়, বরং শিশুদের চোখে দেখা জগতকে কাব্যের শিল্পরূপে রূপান্তরিত করার এক অসাধারণ প্রয়াস। এখানে শিশুর নির্মল বিস্ময়, প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য, লোককথা ও মিথের উড়ান, ইতিহাস ও সামাজিক বোধ— সবকিছুই একাকার হয়ে গেছে। বইটির প্রতিটি কবিতা যেন একেকটি আলোকিত জানালা, যার ভেতর দিয়ে পাঠক দেখতে পান রোদ, বৃষ্টি, নদী, চাঁদ, তারা, মেলা, মাছরাঙা, ধূমকেতু কিংবা এক অদ্ভুত গ্রামীণ বিকেলের দৃশ্য। এই দৃশ্যগুলো কখনো বাস্তব, কখনো কল্পনার তৈরি— কিন্তু দুটোই পাঠকের কাছে সমান বাস্তব হয়ে ওঠে, কারণ কবি সেগুলো এমন ভাষায় বুনেছেন যা সরল, সহজবোধ্য অথচ গভীর নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ।

কায়সারের কবিতার প্রথম যে দিকটি চোখে পড়ে তা হলো শিশুতোষ নন্দনতত্ত্বের ব্যবহার। শিশুরা পৃথিবীকে দেখে একধরনের খেলার ছলে, বিস্ময়ে ভরা চোখ দিয়ে। এই দৃষ্টিকে ধরতে হলে কবিকে হতে হয় অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ শিশুর মনে প্রবেশ করতে হলে শব্দ ও চিত্রকল্পে সরলতার সঙ্গে সঙ্গে জাদুকরী আকর্ষণ থাকতে হয়। যেমন ‘সবাই কেমন বাসল ভালো’ কবিতায় অন্ধ বাউলের একতারার সুর, ধূমকেতুর হাত বাড়ানো, জোনাকির নীল বাতি— এসব উপাদান শিশুর মনে অদ্ভুত কৌতূহল জাগায়। এই কৌতূহলই কবিতার প্রাণশক্তি। শিশুর জন্য লেখা হলেও এই কৌতূহলবোধ বড়দেরও নতুন করে দেখতে শেখায়, কারণ আমরা যারা বড় হয়ে গেছি, তারা অনেক সময় আশেপাশের বিস্ময়কর দৃশ্যগুলোকে আর লক্ষ্য করি না।

প্রকৃতির বর্ণনা কায়সারের কবিতায় শুধু পটভূমি নয়, বরং সক্রিয় চরিত্র। ‘দিঘির গল্প’ কবিতায় দিঘিকে কেবল জলাধার হিসেবে নয়, বরং এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার গায়ে নীল আকাশের ছায়া পড়ে, মাছেরা ভেতরে খেলাধুলা করে, বাতাস তার গায়ে হেলে যায়— সব মিলিয়ে পাঠক দিঘিকে যেন নিজের চোখের সামনে দেখতে পান। ‘চন্দ্র তারার জুটি’ কবিতায় চাঁদের মুখ মলিন হয়ে যাওয়া কিংবা তারার ছেলে কাঁদা— এসব দৃশ্য প্রকৃতিকে মানবিক গুণে সমৃদ্ধ করে তোলে। এভাবেই কায়সার শিশুদের মনে প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

ঐতিহাসিক ও সামাজিক নান্দনিকতার দিক থেকেও এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘আলোর চিঠির বার্তা নিয়ে’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের হত্যার ঘটনা উঠে এসেছে। সাধারণত শিশু-কিশোর কবিতায় এতটা রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বিষয় আসে না, কিন্তু কায়সার এই বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তা কোনোভাবেই শিশুর মনোজগতে ভয় বা ভার চাপিয়ে দেয় না; বরং মানবিক বোধ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। রাসেলকে তারা হিসেবে কল্পনা করে কবি লিখেছেন— ‘তারা তো নয় রাসেল সোনা মিটিমিটি ফুটছে ওই’— যা একদিকে উপমা, অন্যদিকে এক গভীর মানবিক প্রতীক।

ভাষার অলংকার কায়সারের কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। রূপকের ব্যবহার সর্বত্রই দেখা যায়। ‘ধূমকেতুরা আকাশ থেকে হাত বাড়ায়’— এখানে ধূমকেতু হাত বাড়াচ্ছে, যা বাস্তব নয়, কিন্তু পাঠকের মনে এক অদ্ভুত দৃশ্যকল্প তৈরি করে। ‘জীবনফুলের গন্ধ’— এখানে জীবনকে ফুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা জীবনকে এক উজ্জ্বল, কোমল, সুগন্ধী সত্তায় রূপ দেয়। ব্যক্তিবাচকরণও তাঁর কবিতায় প্রচুর— ‘আকাশ ফেলে নীলের ছায়া’, ‘সূর্য গেছে বাপের বাড়ি’— এসব পঙ্ক্তি প্রকৃতিকে মানবিক ভূমিকায় তুলে আনে। অনুপ্রাসের মাধ্যমে তিনি ধ্বনিগত সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন— ‘ঢেউয়ের মতো নদীর বুকে ছলছলায়’, ‘মনের বিষাদ সুরের ভেতর কলকলায়’— এসব পঙ্ক্তি পড়লে শুধু অর্থ নয়, ধ্বনিও কানে বাজে।

শ্লেষের ব্যবহারও লক্ষণীয়। ‘আমরা রাজা, উজির নাজির, আমরা আলোর হাট’— এখানে ‘আলোর হাট’ একদিকে আনন্দমেলা, অন্যদিকে জ্ঞানের উৎস, যা দ্ব্যর্থক অর্থে সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। শিশুরা এর সরল অর্থ বুঝবে, আর বড়রা বুঝবে এর গভীরতর তাৎপর্য।


চিত্রকল্পের দিক থেকে কায়সারের কবিতায় এক অসাধারণ বৈচিত্র্য রয়েছে। দৃশ্যচিত্রে তিনি অনন্য। ‘মেলার ইতিবৃত্ত’ কবিতায় হাতপাখায় ঠান্ডা হাওয়া, মাটির ঘোড়ার দুলদুল, মানুষের ভিড়— এসব এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যে পাঠক যেন মেলার ভেতরেই উপস্থিত আছেন। শ্রুতিচিত্রে ‘অন্ধ বাউল গান ধরেছে একতারায়’— এটি শুধু শব্দের উৎস নয়, বরং সেই শব্দের প্রভাবও পাঠকের কানে বাজিয়ে তোলে। গন্ধচিত্রে ‘হাজার মুখের কোলাহলে জীবনফুলের গন্ধ’— এই পঙ্ক্তি পাঠককে দৃশ্য ও গন্ধের মিশ্র অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়।

উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে কায়সার আবেগকে তীব্র করেছেন। ‘চন্দ্র তারার জুটি’তে চাঁদের মুখ মলিন হয়ে যাওয়া কিংবা তারার ছেলে কাঁদা— এসব দৃশ্য বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কল্পনার ডানা মেলে, যা শিশুর মনে তীব্র আবেগ তৈরি করে। ‘কারা যেন আজো কান পাতে’ কবিতায় ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী পাখির কথোপকথনও উৎপ্রেক্ষার উদাহরণ, যেখানে পরিবেশ ধ্বংসের বাস্তব সমস্যাকে কল্পনার আড়ালে তুলে ধরা হয়েছে।


উপমার ব্যবহারেও কায়সারের কবিতা সমৃদ্ধ। ‘ওড়ার কিছু মন্ত্র’ কবিতায়— ‘উড়ব যেমন ঘুড়ি’— এটি সরল কিন্তু প্রাণবন্ত উপমা, যা শিশুর খেলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘আলোর চিঠির বার্তা নিয়ে’ কবিতায় রাসেলকে তারা হিসেবে কল্পনা করা— ‘তারা তো নয় রাসেল সোনা মিটিমিটি ফুটছে ওই’— এটি শিশুমনে কোমল আলোর মতো প্রবেশ করে।

মিথ ও কল্পলোকও তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ। ‘কারা যেন আজো কান পাতে’তে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী পাখির উপস্থিতি এসেছে বাংলার লোককথা থেকে। ‘ওড়ার কিছু মন্ত্র’ এ রূপকথার দাদির গল্প, ‘কেউ বুঝি আজ পেয়ে যাবে’তে জলপরিদের কোলাহল— এসব শিশুদের মনে বিস্ময় ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। মিথ এখানে কেবল গল্প নয়, বরং শিশুমনের কল্পনার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করে।

বইয়ের প্রথম কবিতা ‘কথার কথা’-য় কথাকে নানা রূপে কল্পনা করা হয়েছে— গাছের ফুল হয়ে ফোটা কথা, আকাশে ভেসে থাকা অতীতের কথা, শিশুর হাসির মতো টলটলে গানের কথা। এখানে গাছকে কথা বলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা ব্যক্তিত্বদান অলংকারের চমৎকার উদাহরণ। ‘নদীর ছানা’ কবিতায় শিশুর চোখে জন্ম নেওয়া নদীর যমজ ছানার মতো ঢেউ আমাদের সামনে প্রকৃতি ও মানুষের আবেগের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করে। হীরের মতো চোখের উপমা শুধু সৌন্দর্য নয়, ভালোবাসা ও মায়ার এক তীব্র অনুভূতিও জাগায়। কিন্তু এর মধ্যেই আছে করুণরস— বাবা দূরে, মা-ও অনুপস্থিত, শিশুর একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় নদী।

‘দিচ্ছে সাড়া পাখির মন’ কবিতায় পাখিরা মানুষের মতো সন্তানকে সান্ত্বনা দেয়, ভাঙা বাসাতেও সাহস শেখায়। এখানে শিক্ষা ও আনন্দ একসাথে এসেছে। ‘সেদিন আমি একলা ছিলাম ঘরে’ কবিতায় এক শিশু ল্যাপটপের পর্দা দিয়ে প্রবেশ করে কল্পনার এক বিস্ময়কর দুনিয়ায়, যেখানে রোদের খেলায় পাতার গানের সুর বাজে— এটি চিত্রকল্প ও ফ্যান্টাসি মিথের সুন্দর মিলন। ‘রেলিংয়ের টবে’ কবিতায় শহরের ধূসর রেলিংয়ে ছোট্ট টবের ফুল অতীতের হারানো বাগানের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়; এখানে করুণ ও শান্তরস মিলেমিশে একধরনের নস্টালজিয়া তৈরি করেছে।

‘মেঘ পাহাড়ের কন্যা’য় মেঘ, পাহাড়, বিজলি ও হাওয়া মিলে তৈরি করেছে প্রকৃতি-মিথের এক মনোমুগ্ধকর গল্প— যেন পুরনো লোককথা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ‘হারিয়ে যাওয়া ডানার পরি’ আধুনিক ফ্যান্টাসি, যেখানে ধূমকেতুর আঘাতে ডানা হারানো পরি মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার গল্প বলে; এখানে উৎপ্রেক্ষা গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে— স্বপ্ন হারিয়েও জীবনকে নতুনভাবে গ্রহণ করার বার্তা।

‘রংতুলিতে পাহাড় তুলে আনা’ কবিতায় পাহাড় শুধু আঁকার বিষয় নয়, বরং রঙ, পাখির বাসা, অথৈ সবুজ— সব মিলিয়ে এক শৈল্পিক চ্যালেঞ্জ ও বন্ধুত্বের গল্প। শিরোনাম কবিতা ‘এই রোদ্দুর যাবে কদ্দুর’-এ প্রকৃতির সৌন্দর্য ও যাত্রার দ্বিধা মিলেমিশে থাকে। রোদ্দুর, রংধনু, আকাশের ব্যক্তিত্বদান এখানে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আর ‘প্রতিদিন শুনি প্রাণে’ কবিতায় এসে শিশু-কিশোর কাব্যের ভেতর ঢুকে পড়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর ভক্তি— যা পাঠককে ইতিহাস ও জাতিস্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে।


পুরো বইজুড়ে অলংকারের ব্যবহার লক্ষণীয়— উপমা, রূপক, অনুপ্রাস, শ্লেষ, প্রতীকধর্মী অলংকার, ব্যক্তিত্বদান ও উৎপ্রেক্ষা কাব্যের সুর ও সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। চিত্রকল্পেরও বহুমুখী প্রয়োগ আছে— দৃশ্যচিত্রে মেঘ পাহাড়ের কন্যা বা নদীর ছানা, শব্দচিত্রে পাতার গান বা পাখির ডাক, গন্ধচিত্রে ফুলের সৌরভ, আর স্পর্শচিত্রে ঢেউয়ের ছোঁয়া। এসব মিলিয়ে কবিতাগুলো শুধু পড়া নয়, চোখে দেখা ও মনে অনুভব করার অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।

ওমর কায়সারের এই কাব্যগ্রন্থ পাঠককে শেখায় প্রকৃতিকে নতুনভাবে দেখতে, কল্পনাকে মুক্ত করতে, অতীত ও শিকড়ের প্রতি মমতা রাখতে এবং ইতিহাস-সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক গভীর করতে। শিশুর ভাষায় লেখা হলেও এই কবিতাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের মনেও রসের অনুরণন তোলে— শান্তরস, করুণরস, হাস্যরস ও বিস্ময়রস মিলেমিশে প্রতিটি কবিতাকে করে তুলেছে স্বতন্ত্র। শেষ পর্যন্ত, এই রোদ্দুর যাবে কদ্দুর এমন এক বই, যা পাঠকের মনে প্রকৃতি, স্বপ্ন, ও মানবিকতার আলো জ্বেলে রেখে যায়, যেন সেই রোদ্দুরের শেষ কদ্দুরটা পাঠক নিজেই খুঁজে নেয় নিজের ভেতরে।

সব মিলিয়ে, ‘এই রোদ্দুর যাবে কদ্দুর’ বইটি শিশু-কিশোর কবিতার শিল্পধারায় এক অনন্য সংযোজন। এখানে নান্দনিকতা শুধু দৃশ্যমান রূপে নয়— শব্দ, ধ্বনি, আবেগ, ঐতিহাসিক বোধ, সামাজিক দায়— সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ পেয়েছে। অলংকার ও চিত্রকল্প কল্পনাকে উস্কে দেয়, উৎপ্রেক্ষা ও উপমা আবেগকে গভীর করে, আর মিথ কিশোর পাঠককে বিস্ময়ের দ্বারে পৌঁছে দেয়। ওমর কায়সারের এই কাব্যভুবনে যে রোদ্দুর ছড়িয়েছে, তা শুধু শিশুদের নয়, বড়দেরও কল্পনাকে আলো দিয়ে ভরিয়ে তোলে। তাঁর কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— রোদ্দুরের পথ কখনোই শেষ হয় না, বরং তা কল্পনার আকাশে আরও দূরে, আরও উজ্জ্বল হয়ে প্রসারিত হয়।


লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ