লিও টলস্টয়
লিও টলস্টয়ের বিখ্যাত গল্প "মানুষ কী নিয়ে বাঁচে" (What Men Live By)-এর মূল শিক্ষা হলো—মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ বা চিন্তায় বাঁচে না, মানুষ বাঁচে প্রেম বা ভালোবাসা নিয়ে।
- মানুষের মধ্যে কী আছে? মানুষের মধ্যে আছে 'ভালোবাসা'।
- মানুষের মধ্যে কী নেই? মানুষকে নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু নিজেই বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা বা ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
তখন রুটির দাম ছিল চড়া, আর মজুরি ছিল কম; কাজেই রুজি-রোজগার
যা হত দেখতে না-দেখতেই তা যেত ফুরিয়ে।
মুচি আর তার স্ত্রী একটিমাত্র চামড়ার কোট
ভাগাভাগি করে গায়ে দিত। সেকোর্টটারও তখন জীর্ণ দশা। তাই সে একটা নতুন কোট বানাবে
বলে ভেড়ার চামড়া কিনবার জন্য তৈরি হতে লাগল।
শীত পড়বার মুখেই মুচির হাতে বেশকিছু টাকা
জমল ; তার স্ত্রীর ট্রাঙ্কে জমল তিন রুবল, আর গায়ের চাষীদের কাছে তার পাওনা হল পাঁচচ রুবল কুড়ি কোপেক।
একদিন সকালে মুচি তার বউয়ের সুতির জ্যাকেট
পরল শার্টের উপর, তার উপর চড়াল তার গরম কাফতান। তারপর তিন
রুবল পকেটে ফেলে বেড়াবার একটা লাঠি কেটে নিয়ে রওনা হল।
যেতে যেতে ভাবল : “চাষীদের কাছ থেকে আগে
পাঁচচ রুবল আদায় করব, তার সঙ্গে যোগ করব পকেটের তিন রুবল;
আর তাই দিয়ে কিনব নতুন কোটের জন্য একটা ভেড়ার
চামড়া।”
গাঁয়ে পৌঁছে প্রথমে গেল একজন চাষীর বাড়ি।
চাষী তখন বাড়ি নেই। তার বউ বলল, “এখন তো কিছু দিতে
পারব না, তবে এক হপ্তার মধ্যে টাকা-সমেত আমার স্বামীকে
তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব।”
গেল আর-একজন চাষীর কাছে। সে দিব্যি করে
বলল, তার হাত একেবারে খালি; তবু
জুতো-সারানো বাবদ দেয় কুড়ি কোপেকের ছোটঋণটা কোনোরকমে শোধ করে দেবে।
মুচি মনে মনে ভাবল, নাহয়
ধারেই ভেড়ার চামড়াটা কেনা যাবে। কিন্তু চামড়ার দোকানির মুখে অন্য কথা। সে বলল,
“পুরো টাকাটা দিয়ে পছন্দমতো চামড়া নিয়ে যাও |
দেনা শোধ করা যে কী জিনিস সে আমি ভালোই জানি।”
সারা সকাল ঘুরে জুতো-সেলাই বাবদ কুড়ি কোপে
আর মেরামতের জন্য একজোড়া জুতো হাতে পাওয়া ছাড়া আর কিছুই তার কপালে জুটল না।।
মুচির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কুড়ি কোপেক
দিয়ে মদ খেয়ে বাড়ির পথ ধরল।
সকালবেলা থেকেই তার বেশ শীত-শীত করছিল।
কিন্তু এখন মদ খাবার পরে গরম কোট ছাড়াই শরীর বেশ গরম লাগছিল। এক হাতে লাঠি দিয়ে
পথের বরফের টুকরাগুলোকে ঠুকতে ঠুকতে এবং অন্য হাতে মেরামতির জুতোজোড়ার ফিতে ধরে
ঝোলাতে ঝোলাতে পথ চলতে লাগল মুচি। আর নিজের মনেই বলতে লাগল :
“কোট ছাড়াই বেশ তো গরম লাগছে। খেয়েছি তো
একটুখানি, তাতেই তো দেখছি শিরার ভিতর যেন খই ফুটছে। তবে আর
ভেড়ার চামড়ার দরকারটা কী! অবশ্যি বাড়িতে বউ আছে। সে আবার এই নিয়ে খিটিমিটি করবে।
আচ্ছা, এও তো বড় লজ্জার কথা। তুমি একজনের কাজ করে দেবে আর
সে তোমাকে কলা দেখাবে। ঠিক আছে, সবুর করো বাছাধন,
এক সপ্তাহের মধ্যে যদি আমার টাকা না দিয়ে যাও,
তাহলে তোমার মাথার টুপি আমি খুলে নেব। মজা মন্দ
নয়! ওই আর একজন কুড়ি কোপেক যেন আমাকে ভিক্ষা দিলেন! কুড়ি কোপেকে কী হবে? দিব্যি গেলে বলল, হাত একেবারে ফাকা।
আমিও তো বলতে পারতাম, শুধু কি তোমার হাতই ফাকা? আমার হাত ফাঁকা নয়? আমার তো যা-কিছু সব
এই কাঁধে। তোমার খাবার তুমি ক্ষেতে ফলাও, আর আমাকে তা কিনতে
হয়। ফি হপ্তায় তিন রুবলের তো রুটিই কিনতে হয়। তাও আবার কোনোদিন হয়তো বাড়ি ফিরে
দেখি রুটি ফুরিয়ে গেছে তখন আবার দেড় রুবলের ধাক্কা। কাজেই আমার যা পাওনা আমাকে
দিয়ে দাও।”
এমনিধারা ভাবতে ভাবতে মুচি চলছে। রাস্তাটা
মোড় ঘুরতেই একটা গির্জা, গির্জার গায়ে একটা
শাদমতো কী যেন তার নজরে পড়ল।
তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভালো করে নজর করেও
জিনিশটা যে কী তা সে ঠিক ঠাওর করতে পারল না। ভাবল, “দেখতে
অনেকটা যেন মানুষের মতো; তবে সারাটা দেহ
কেমন যেন শাদা। তাছাড়া, মানুষ ওখানে করবেই বা কী?”
আরও কাছে এগিয়ে সবটা পরিষ্কার দেখতে পেল।
কী আশ্চর্য, গির্জার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা
মানুষ। মৃতই হোক আর জীবিতই হোক, বসে আছে একেবারে
উলঙ্গ আর নিচুপ হয়ে।
মুচি ভয়ে শিউরে উঠল। ভাবল, “নিশ্চয় কেউ লোকটাকে খুন করে জামাকাপড় খুলে নিয়ে এখানে ফেলে গেছে। পালাই
বাবা, কাজ এসব ঝঞ্চাটে জড়িয়ে !”
মুচি লোকটাকে পেরিয়ে গেল। গির্জার অপরদিকে
পৌছতেই লোকটাকে আর দেখা গেল। কিন্তু আরও খানিক এগিয়ে পিছন ফিরে চাইতেই দেখে,
লোকটা যেন গির্জা থেকে সরে এসে নড়ছে আর তার দিকে
তাকিয়ে আছে।
মুচি আরও ভয় পেয়ে গেল। ভাবল, “লোকটা যে কে তাই-বা কে জানে! ভালো হলে এভাবে আসবে কেন। কাছে গেলে যদি
লাফিয়ে পড়ে গলা চেপে ধরে, ওর হাত থেকে ছাড়া
পাওয়া শক্ত হবে। যদি তা নাও করে, সে তো আমার ঘাড়ে
চাপবে। ওরকম একটা ন্যাংটো লোককে নিয়ে করবই বা কী? নিজের
গায়ের সামান্য জামা কাপড় তো ওকে খুলে দিতে পারব! ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন।”
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দিল মুচি। কিছুদূর
যেতে-না-যেতেই বিবেক তাকে খোচাতে শুরু করল। “কী করছ তুমি সাইমন? একটা মানুষ মরতে বসেছে, আর তুমি তাকে ভয়
পাচ্ছ? তুমি কি এতই ধনী যে টাকা-পয়সা চুরি যাবার ভয় করছ ?
ধিক তোমাকে সাইমন, ধিক!”
সাইমন মুখ ঘুরিয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে চলল।
দুই
কাছে গিয়ে খুব ভালো করে তাকাল সাইমন।
লোকটি যুবক, দেখতে স্বাস্থ্যবান, শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু শীতে যেন
জমে যাচ্ছে, যেন খুব ভয় পেয়েছে। কোনোরকমে হেলান দিয়ে
বসে আছে, এমনকি সাইমনের দিকেও তাকাচ্ছে না, যেন দুটো চোখ তুলে তাকাবার ক্ষমতাও তার নেই।
সাইমন কাছে যেতেই, লোকটা
সহসা মাথা ঘুরিয়ে দুইচোখ মেলে সাইমনের দিকে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সাইমনেরও
যেন লোকটিকে বড় ভালো লাগল। বুটজোড়া মাটিতে রেখে খুলে ফেলল গায়ের কোট।
বলল, “কথা
পরে বলবে। আগে জামাটা পরে নাও। এক্ষুনি। এই নাও।”
লোকটার কনুই ধরে সাইমন তাকে উঠে দাড়াতে
সাহায্য করল। সাইমন দেখল, একটি একহারা
পরিচ্ছন্ন দেহ, সুডৌল হাত-পা, মিষ্টি
একখানি মুখ। মুচি তার কোর্টটা লোকটির গলায় জড়িয়ে দিল, কিন্তু
সে ঠিক হাতার মধ্যে তার হাত দুখানি ঢোকাতে পারল না। সাইমন ঠিকমতো হাত ঢুকিয়ে তাকে
কোর্টটা পরিয়ে দিয়ে বেল্ট এঁটে দিল। তারপর মাথার টুপিটা খুলে লোকটার মাথায় পরিয়ে
দেবার উপক্রম করতেই তার নিজের মাথাটাই বেশ ঠাণ্ডা লাগতে লাগল। সাইমন ভাবল,
“আমার মাথাটা তো টাকে ভরা, আর
ওর মাথ–ভরা কোঁকড়া চুল।” তাই সাইমন টুপিটা আবার নিজের মাথায় বসিয়ে দিল।
‘ওকে বরং বুটজোড়া দিই।” সাইমন বসে পড়ে
বুটজোড়া তাকে পরিয়ে দিয়ে বলল, “এই তো ঠিক হয়েছে
ভাই, এইবার হাঁটো, শরীরটাকে
গরম করে নাও। হাঁটতে পারবে তো?”
উঠে দাড়িয়ে লোকটি সাইমনের দিকে তাকাল,
কিন্তু কোনো কথা বলতে পারল না।
“আরে, কথা
বলছ না কেন? নাও, এসো,
আর যদি দুর্বল বোধ করো, আমার
লাঠিটায় ভর দাও। পা-টা ঝেড়ে নাও একটু।”
লোকটি হাঁটতে শুরু করল। অনায়াসেই হাঁটতে
লাগল। একটুও পিছিয়ে রইল না।
পথে যেতে যেতে সাইমন বলল, “তুমি কোথায় থাকো বলো?”
“এ-অঞ্চলে নয়।”
“সে তো জানি। এ-অঞ্চলের সব লোককে আমি চিনি।
কিন্তু ওই প্রার্থনাঘরের কাছে তুমি। এলে কী করে?
“বলতে পারব না।”
“কেউ তোমাকে মেরেছিল বলে মনে হচ্ছে?”
“কেউ আমাকে মারেনি। ঈশ্বর শাস্তি দিয়েছেন।”
“ঈশ্বর সব জায়গাতেই আছেন, সে তো সকলেই জানে। তুমি কোথায় যাবে?”
“আমার কাছে সব জায়গাই সমান।”
সাইমন বিস্মিত হল। লোকটি উদ্ধত নয়,
তার কথাগুলো শান্ত, কিন্তু
নিজের সম্পর্কে কিছুই সে বলতে চায় না। সাইমন ভাবল, “কতকিছুই
তো আমরা বুঝি না।” তারপর লোকটিকে বলল :
“ঠিক আছে, নিজের
আস্তানায় যাবার আগে তুমি আমার বাড়িতেই চলো।”
সাইমন হাঁটতে লাগল। লোকটিও চলল তার পাশে
পাশেই।
বাতাস উঠল। বেশ শীত করছে। স্ত্রীর
জ্যাকেটটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে ভাবতে লাগল :“ভেড়ার চামড়া আমাকে কোথায় টেনে এনেছে!
বেরিয়েছিলাম ভেড়ার চামড়ার খোঁজে, আর ফিরছি যখন তখন
নিজের কোর্টটাও গায়ে নেই, বরং একটা ন্যাংটো
লোককে নিয়ে চলেছি সঙ্গে করে। মাত্রোনা আমাকে ছেড়ে কথা কইবে না।”
শেষের কথাটা মনে হতেই সাইমন ভীত হয়ে পড়ল।
তবু লোকটির দিকে তাকাতেই তার মনে পড়ে গেল প্রার্থনাঘরের কাছে তার সেই চাউনির কথা।
সঙ্গে সঙ্গে মনটা খুশিতে ভরে উঠল।
তিন
সাইমনের বউ সকাল-সকাল সব কাজকর্ম শেষ করে
ফেলেছে। জ্বালানির কাঠ কেটেছে, জল এনেছে, ছেলেকে খাইয়েছে, নিজেও কিছু একটু
মুখে দিয়েছে, তারপর বসে বসে ভাবছে, কখন রুটি বানাবে : আজ না কাল? সে ভাবল, “সাইমন যদি দুপুরের খাবারটা খেয়ে থাকে, রাতে
আর বেশি কিছু খাবে না। তাহলে যে-রুটি আছে তা দিয়ে কাল চলে যাবে।”
রুটির টুকরোটা ঘোরাতে ঘোরাতে মাত্রোনা ঠিক
করল : “আজ আর রুটি বানাচ্ছি না। যা ময়দা আছে তাতে আর-একখানি মাত্র পাউরুটি হবে।
সেটা দিয়ে শুক্রবার চালিয়ে দেব।”
কটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে মাত্রোনা টেবিলে
বসে স্বামীর শার্টের ফুটো সেলাই করতে লাগল। সেলাই করতে করতে সে স্বামীর কথাই
ভাবছিল; ভাবছিল তার চামড়া কেনার কথা।
“চামড়ার দোকানি তাকে না ঠকালে বাচি! লোকটা
আবার যা সোজা-সরল ! নিজে সে কাউকে ঠকাবে না, কিন্তু
একটা ছোটছেলেও তাকে বোকা বানাতে পারে। আট রুবল তো চাট্টিখানি কথা নয়। একটা কোটের
অভাবে গত শীতে বড়ই কষ্ট গেছে। নদীতে যেতে পারি না, বেরোতে
পারি না কোথাও। লোকটা যখন সবকিছু গায়ে চড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত, আমার তো গায়ে দেবার কিছুই থাকত না। আজ যদিও খুব সকালে বেরোয়নি, তবু এতক্ষণ তো তার ফিরে আসা উচিত। জানি না আবার কোথাও মজা লুটতে বসেছেন
কি না।”
মাত্রোনা যখন এইসব ভাবছে তখন সিড়িতে পায়ের
শব্দ শোনা গেল। সেলাইয়ের ভিতর সুঁচটা আটকে রেখে মাত্রোনা বাইরে মুখ বাড়াল। আরে! এ
যে দুজন বাড়িতে ঢুকছে—সাইমন, আর তার সঙ্গে একটি
অপরিচিত মানুষ! মাথায় টুপি নেই, পায়ে ভারী বুট।
সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর মুখে ভদকার গন্ধ পেল
সে। তাহলে তো মজা লুটেই এসেছেন! তার উপর এতক্ষণে নজরে পড়ল তার গায়ে কোর্টটাও নেই,
আছে শুধু তারই জ্যাকেটটা। হাতেও কিছু নেই।
মাত্রোনার বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। সে
ভাবল, এ তো মদ খেয়ে সব টাকা উড়িয়ে এসেছে। এই বাজে লোকটার
সঙ্গে ফুর্তিফার্তা করে বাড়ি অবধি নিয়ে এসেছে ওকে।”
মাত্রোনার সামনে দিয়েই তারা ঘরে ঢুকল।
ভালো করে সে দেখতে পেল আগন্তুক লোকটিকে। একটি হ্যাংলা চেহারার যুবক, গায়ে তাদেরই কোট, মাথায় টুপি নেই।
কোটের নিচে শার্টও নেই। ভিতরে ঢুকে লোকটি সেখানেই দাড়িয়ে রইল, নড়ল না একটুও, চোখ তুলে তাকালও না। মাত্রোনার মনে হল
লোকটা নিশ্চয় খারাপ, তাই ভয় পেয়েছে।
মাত্রোনা ভুরু কুঁচকে স্টোভের দিকে এগিয়ে
গেল। দেখতে লাগল ওরা কী করে।
সাইমন টুপি খুলে বেঞ্চিটার উপর বসল,
যেন কিছুই হয়নি। বলল, “আরে
মাত্রোনা, রাতের খাবারটা বানাও।”
মাত্রোনা অস্ফুটভাবে কী যেন বলে সেখানেই
দাড়িয়ে রইল। সাইমন বুঝল বউয়ের মেজাজ বিগড়েছে, কিন্তু
কিছু তো করবার নেই। আগন্তুকের হাত ধরে সে বলল, “এসো
ভাই, এইখানে বস, কিছু
খাওয়া যাক।”
আগন্তুক সাইমনের পাশের বেঞ্চিটাতে বসল।
সাইমন উঠে গিয়ে বউকে বলল, “কী রান্না করেছ বলো
দেখি।”
মাত্রোনা রাগে ফেটে পড়ল : “রান্না করেছি,
কিন্তু তোমার জন্যে নয়। মদ খেয়ে তো বুদ্ধিশুদ্ধি
সব লোপ পেয়েছে। গেলে কোট কিনতে; ফিরে এলে নিজের
কোটটাও খুইয়ে। আবার একটা ন্যাংটো রাস্তার লোককে ধরে এনেছ সঙ্গে করে। তোমাদের মতো
মাতালদের জন্য আমি রান্না করিনি।”
“দেখ মাত্রোনা, অকারণে
বকবক কোরো না। আগে শোনো লোকটা কেমনশুশুশুশু”
“আগে বলো, টাকা
কী করেছ।”
সাইমন কোটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে নোট বের করে
দেখাল।
“এই দেখ টাকা। ত্রিফোন্ফ টাকা দেয়নি,
কাল দেবে বলেছে।”
মাত্রোনার রাগ আরও চড়ে গেল। কোট তো আনেইনি,
আবার তাদের একটিমাত্র কোট খয়রাত করেছে একটা ন্যাংটো
লোককে। তাকে বাড়ি অবধি নিয়ে এসেছে।
টেবিলের উপর থেকে টাকাটা ছোঁ মেরে নিয়ে
লুকিয়ে রাখতে রাখতে সে বলল, “কিছু নেই; যত রাজ্যের ন্যাংটো মাতালদের আমি খাওয়াতে পারব না।”
“আহ্ মাত্রোনা, চুপ
করো! আগে শোনো লোকটা কে…”
“একটা বোকা মাতালের কথা আবার কী শুনব। গেলে
চামড়া কিনতে, তাও মদ খেয়ে উড়িয়ে দিলে।”
সাইমন বউকে বোঝাতে চাইল যে সে মাত্র কুড়ি
কোপেকের মদ খেয়েছে, আর এই লোকটাকে কী অবস্থায় পেয়েছে কিন্তু
এক কথা বলবার আগে বউ তাকে দশ-কথা শুনিয়ে দিল।
বকবক করতে করতে একসময় মাত্রোনা সাইমনের
উপর ঝাপিয়ে পড়ে জামার আস্তিন চেপে ধরে বলে উঠল, “শিগগির
আমার জ্যাকেট দাও! ওটাই তো আমার একমাত্র সম্বল, তাও
তুমি নিয়ে নিয়েছ নিজে গায় দেবে বলে। এক্ষুনি ফিরিয়ে দাও, মাতাল,
কুকুর কোথাকার! তারপর জাহান্নামে যাও!”
সাইমন জ্যাকেটটা খুলতে চেষ্টা করতেই
মাত্রোনা সেটা ধরে দিল টান। ফলে তার সেলাই গেল ছিড়ে। সেটাকেই টেনে নিয়ে নিজের
মাথায় জড়িয়ে মাত্রোনা দরজার দিকে পা বাড়াল।
হঠাৎ সে দাড়িয়ে পড়ল। বুকের ভিতরটা কেমন
করে উঠল তার। মাত্রোনার মনে হল, রাগ দমন করা দরকার;
এ লোকটা কে তাও জানা দরকার।
চার
মাত্রোনা থামল। বলল :“লোকটা যদি ভালোই হবে
তাহলে সে এমন ন্যাংটো কেন, কেন গায়ে দেবার
একটা শার্টও জোটেনি। আর তুমি যদি ভালোভাবেই ছিলে সারাদিন তাহলে এই স্যাঙাকে কোথেকে
জুটিয়েছ সেকথা এতক্ষণ খুলে বলোনি কেন?”
সাইমন বলল, “বেশ
তো, এখুনি সব বলছি। আমি হেঁটে আসছিলাম; দেখি প্রার্থনাঘরের পাশে লোকটি বসে আছে; গায়ে
কিছু নেই, শীতে জমে গেছে। ভেবে দেখ, লোকটি
একেবারে উলঙ্গ, আর এটা গরমকাল নয়। ঈশ্বরই আমাকে ওর কাছে
পাঠিয়েছিলেন, নইলে সে নির্ঘাত মারা যেত। বলো, তখন আমি কী করি? আমি তাকে হাত ধরে
তুললাম, জামা-জুতো পরালাম, নিয়ে
এলাম এখানে। মনটাকে একটু নরম কর মাত্রোনা; এরকম করা পাপ। মনে
রেখোঁ, আমরাও একদিন মরব।”
মাত্রোনা আবার বকুনি দিতে যাচ্ছিল,
এমন সময় আগন্তুকের দিকে তার চোখ পড়ল।
আগন্তুক তখনও বেঞ্চির এককোণে চুপ করে বসে
আছে। দুখানি হাত রেখেছে হাঁটুর উপর, মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে
বুকের উপর। চোখ-ভুরু কুঁচকে আছে, যেন ভিতর থেকে
কোনোকিছু আঘাত করছে তাকে।
মাত্রোনা চুপ করে গেল।
সাইমন বলল, “মাত্রোনা,
তোমার মধ্যে কি ঈশ্বরের ভয় নেই?”
এই কথা শুনে মাত্রোনা আবার আগন্তুকের দিকে
চাইল। সহসা তার মনটা গলে গেল। স্টোভের কাছে গিয়ে সে খাবার তৈরি করল। টেবিলের উপর
একটি ছোট বাটি রেখে তাতে কাস ঢালল, রুটির শেষ টুকরোটা
এনে দুজনের দিকে এগিয়ে দিল দুটো কাঁটা-চামচ।
“এবার খাও”, মাত্রোনা
বলল।
সাইমন আগন্তুককে ডেকে নিল টেবিলে।
“বসো হে ভালো মানুষ।”
সাইমন রুটি কেটে খেতে শুরু করল। মাত্রোনা
টেবিলের একপাশে দাড়িয়ে দেখতে লাগল আগন্তুককে। বেচারির জন্য এবার দুঃখ হল তার।
সহসা আগন্তুক যেন খুশি হয়ে উঠল। থেমে গেল
তার ভুরুর কোঁচকানি। মাত্রোনার দিকে দুচোখ তুলে তাকিয়ে সে হেসে ফেলল।
খাওয়া শেষে টেবিল পরিষ্কার করে মাত্রোনা
আগন্তুককে জিজ্ঞেস করল :“তুমি কোখেকে আসছ?”
“এ-অঞ্চল থেকে নয়।”
“রাস্তার ধারে এলে কেমন করে?”
“বলতে পারি না।”
“তোমার সবকিছু কি কেউ চুরি করেছিল ?”
“ঈশ্বর আমাকে শাস্তি দিয়েছেন।”
“তাই কি তুমি ন্যাংটো হয়ে সেখানে পড়েছিলে?”
“তাই আমি সেখানে পড়ে ঠাণ্ডায় জমে
যাচ্ছিলাম। সাইমন আমাকে দেখতে পেল; দয়া হল তার,
কোট খুলে আমাকে পরিয়ে দিল। আসতে বলল এখানে। এখানে
এলে তুমি আমাকে খাদ্য দিলে, পানীয় দিলে,
আমাকে দয়া করলে। ঈশ্বর তোমাদের রক্ষা করুন।”
মাত্রোনা উঠে দাড়াল। সাইমনের যে শার্টটা
সে সেলাই করছিল সেটা জানালার তাক থেকে তুলে নিয়ে আগন্তুককে দিল। খুঁজে পেতে এনে
দিল একটা ট্রাউজারও।
“তোমার তো শার্ট নেই। এইগুলো পরে ঐ তাকের
উপরে বা স্টোভের উপরে যেখানে খুশি শুয়ে পড়ো।”
আগন্তুক গায়ের কোটটা খুলে শার্ট ও
ট্রাউজার পরে তাকের উপরে শুয়ে পড়ল। মাত্রোনা বাতি নিভিয়ে দিয়ে কোর্টটা নিয়ে
স্বামীর পাশে শুল।
তার মনে পড়ল, রুটির
শেষ টুকরোটাও তারা খেয়ে ফেলেছে। কালকের জন্য কিছুই নেই। মনে পড়ল, শার্ট আর ট্রাউজার দুটোই সে দান করেছে। অমনি তার মন খারাপ হয়ে গেল। সঙ্গে
সঙ্গেই মনে পড়ল আগন্তুকের হাসিটি; অমনি মন খুশি হয়ে
উঠল আবার।
মাত্রোনা অনেকক্ষণ জেগে রইল। একসময় তার
খেয়াল হল সাইমনও ঘুমোয়নি।
“সাইমন!”
“উ ?”
“রুটির শেষ টুকরোটাও আমরা খেয়ে ফেলেছি।
কালকের জন্য কিছু বানিয়েও রাখিনি। কাল কী হবে আমি জানি না। প্রতিবেশীর কাছে কিছু
ধার চাইতে হবে।”
“আমরা বেঁচে থাকব; খেতেও
পাব।”
বউটি চুপ করে রইল। “যাই হোক, লোকটি নিশ্চয়ই ভালো; তবে, নিজের সম্বন্ধে কিছুই বলে না এই যা।”
“কথা বলার তার দরকার নেই।”
“সাইমন!”
“উ।”
“আমরা তো দিলাম, কিন্তু
আমাদের কেউ কিছু দেয় না কেন?”
কী জবাব দেবে সাইমন জানে না। সে বলল,
“পরে কথা হবে।”
সে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
পাঁচ
পরদিন সকালে সাইমনের ঘুম ভাঙল। ছেলেমেয়েরা
তখনও ঘুমুচ্ছে। বউ গেছে প্রতিবেশীর বাড়ি রুটি ধার করতে। পুরানো ট্রাউজার আর শার্ট
পরে আগন্তুক উপরের দিকে তাকিয়ে বেঞ্চিতে বসে আছে। তার মুখখানি আজ কালকের চাইতেও
উজ্জ্বল।
সাইমন বলল, “দেখ
ভাই, পেট চায় খাবার, আর
শরীর চায় জামা-কাপড়। প্রত্যেককেই উপার্জন করতে হবে। তুমি কী কাজ জানো?”
“দেখ মিখাইল, নিজের
সম্পর্কে তুমি কিছুই বলতে চাও না, সে তোমার খুশি।
কিন্তু উপার্জন তো তোমাকে করতেই হবে। আমি যা কাজ দিই তা করবে। তাহলে আমি তোমাকে
খেতে দেব।”
“ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুন। নিশ্চয়ই শিখব। বলে দাও কী করতে হবে।”
প্রথমদিন সন্ধ্যায় মাত্রোনা যখন তার জন্যে
খাবার তৈরি করছিল কেবলমাত্র সেই দিন তারা তাকে একবার হাসতে দেখেছিল।
ছয়
দিন যায়, সপ্তাহ
যায়, ধীরে ধীরে বছরও শেষ হয়ে আসে। এখন মিখাইলের মতো
সুন্দর আর মজবুত জুতো আর কেউ সেলাই করতে পারে না। সারা জেলার লোক জুতোর জন্য
সাইমনের বাড়ি আসতে লাগল। ফিরে গেল তার বরাত।
একদিন শীতকালে সাইমন বসে মিখাইলের সঙ্গে
কাজ করছে, এমন সময় তিন-ঘোড়ার একখানি ঘন্টা বাধা দ্ৰেজগাড়ি
তার কুঁড়ের দরজায় এসে দাড়াল। একটি ছোটছেলে কোচয়ানের আসন থেকে লাফ দিয়ে নেমে খুলে
দিল গাড়ির দরজা। ফারকোট গায়ে একজন ভদ্রলোক স্লেজ থেকে নেমে সাইমনের ঘরের দিকে পা
বাড়ালেন। মাত্রোনা ছুটে গিয়ে খুলে দিল দরজা। মাথা নিচু করে তিনি ঘরে ঢুকলেন। আবার
যখন মাথা উঁচু করলেন তখন মাথা প্রায় ছাদ ছোয়-ঘেঁয়। ঘরের একটা কোণই তিনি দখল করে
ফেললেন প্রায়।
সাইমন উঠে দাড়িয়ে নমস্কার দিয়ে হাঁ করে
ভদ্রলোককে দেখতে লাগল। এরকম মানুষ সে এর আগে কখনও দেখেনি। সাইমন নিজে রোগা,
মিখাইলও তাই ; মাত্রোনা
তো একগাছি শুকনো লাঠির মতো দেখতে। কিন্তু ইনি—যেন অন্য জগতের লোক; ফোলা ফোলা লাল মুখ, ষাড়ের মতো ঘাড়,
ঢালাই লোহা দিয়ে গড়া দেহ।
ভদ্রলোক হাঁপাতে লাগলেন। গায়ের কোট খুলে
বেঞ্চিতে বসে বললেন :“বড় মুচি কে?”
সাইমন সামনে এগিয়ে বলল :“আজ্ঞে আমি।”
ভদ্রলোক চাকরটাকে চেঁচিয়ে বললেন :
“এই—ফেড়কা, চামড়াটা নিয়ে আয়।”
ছেলেটা দৌড়ে একটা বাডিল নিয়ে এল। ভদ্রলোক
বান্ডিলটা নিয়ে টেবিলের উপর রাখলেন।
চামড়াটা দেখিয়ে ভদ্রলোক সাইমনকে বললেন,
“দেখ মুচি, বেশ মন দিয়ে শোনো।
এটা দেখতে পাচ্ছ?”
“আজ্ঞে যা।”
“জিনিশটা কেমন ঠিক বুঝতে পারছ?”
সাইমন হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল : “ভালো চামড়া।”
“ভালোই বটে! বোকারাম, এমন চামড়া তুমি জীবনে দেখ নি! এটা জার্মানির জিনিশ দাম কুড়ি রুবল।”
সাইমন ভয় পেয়ে বলল :“এমন জিনিশ আমরা কোথায়
দেখব।”
“সে যাহোক। এই চামড়া দিয়ে তুমি আমাকে নতুন
জুতো তৈরি করে দিতে পারবে কি?”
“আজ্ঞে পারব।”
সাইমন ভয় পেয়ে গেল। মিখাইলের দিকে তাকিয়ে
তাকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে ফিসফিস্ করে বলল ; “ভাই,
কী করি?”
মিখাইল মাথা নেড়ে বলল :“কাজটা নিয়ে নিন।”
ভদ্রলোক চাকরটাকে চেঁচিয়ে ডেকে বাঁ-পায়ের
বুট খুলতে বললেন। তারপর পা-টা বাড়িয়ে দিলেন।
“মাপ নাও।”
সাইমন আঠারো ইঞ্চি লম্বা একখানা কাগজ
সেলাই করে সেটা বেশ ভালো করে মুছে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মাপ নিতে আরম্ভ করল।
পায়ের তলা মাপল, পাতার উপরটা মাপল, তারপর
পায়ের গুলি মাপতে গেল। কিন্তু কাগজটা ততদূর পৌছল না। সেই বিরাট পায়ের গুলিটা একটা
গাছের গুঁড়ির মতো।
বাইরে তখন অনেক লোক উকিঝুকি মারছে।
ভদ্রলোকের নজর পড়ল মিখাইলের উপর।
“ও কে ? ও
কি তোমার লোক ?”
“ও আমার কারিগর। ও-ই তো জুতো সেলাই করবে।”
ভদ্রলোক মিখাইলকে বললেন :“দেখ হে, মনে রেখোঁ এমনভাবে সেলাই করতে হবে যেন একবছরের মধ্যে কিছু না হয়।”
সাইমন মিখাইলের দিকে তাকাল। মিখাইল তখন
ভদ্রলোকের দিকে না-তাকিয়ে তাঁর পিছনে ঘরের কোণে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে মৃদু হেসে উঠল,
আর তার সারাশরীর ঝলমল করে উঠল।
“হা করে দেখছ কী বোকারাম? বরং নজর রেখোঁ জুতো যেন ঠিক সময় তৈরি হয়।”
মিখাইল বলল : “ঠিক যে-সময়ে দরকার হবে তখনি
তৈরি পাবেন।”
“তাহলেই হল।”
বুট পায়ে দিয়ে ফারকোট গায়ে দিয়ে ভদ্রলোক
দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু মাথা নিচু করতে ভুল হওয়ায় তার মাথাটা লিন্টেলের
সঙ্গে ঠোক্কর খেল।
কিছুক্ষণ শাপমন্যি করে মাথা ঘষতে ঘষতে
ভদ্রলোক স্লেজে চেপে চলে গেলেন।
যাবার পর সাইমন বলল “ব্যাটা যেন পাহাড়!
মাথায় লেগে দরজাটা জখম হল, কিন্তু ওর কিছুই হল
না।”
মাত্রোনা বলল : “ওদের যেমন জীবন তাতে
শক্তপোক্ত তো হবেই। এরকম লোহার মানুষকে মৃত্যুও ছুঁতে পারে না।”
সাত
সাইমন মিখাইলকে বলল :
“কাজটা যখন নিয়েছি, দেখোঁ
যেন কোনোরকম গোলমালে না পড়ি। চামড়াটা দামি, ভদ্রলোকও
বদমেজাজি। দেখতে হবে যাতে কোনো ভুল না হয়। তোমার হাতও এখন আমার হাতের চেয়ে পাকা।
মাপজোকগুলো নিয়ে চামড়াটা তুমিই কাটো, আমি বরং উপরের
চামড়াটা সেলাই করব।”
“বলো কী!”
“বিদায়, মশায়রা।
শুভদিন।”
আট
একদিন, দুজনই
বাড়িতে। মুচির বউ উনুনে পাত্র চাপাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা বেঞ্চির পাশে। দৌড়োদৌড়ি করছে
আর জানালা দিয়ে দেখছে মাঝেমাঝে। একটা জানালার পাশে বসে সাইমন সেলাই করছে। আরেকটা
জানালার পাশে বসে মিখাইল জুতোর গোড়ালিতে কাঁটা মারছে।
দশ


0 মন্তব্যসমূহ