।। নাসির আহমেদ কাবুল ।। পুকুরে ছিপ ফেলে বসে বসে ভাবে গোপাল, আজ একটি বড় মাছ পেলে মিনতি দিদিকে প্রেজেন্ট করবে সে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর গড়িয়ে বিকাল, কিছুতেই একটি মাছও ধরতে পারে না সে। মনটা খারাপ হয় গোপালের। যেদিনই মিনতি দিদির জন্য মাছ ধরার জন্য ছিপ ফেলে সেদিনই কোন মাছই বড়শি খায় না! গোপাল আজ প্রতিজ্ঞা করেছে, মাছ না ধরে কিছুতেই সে বাড়ি ফিরে যাবে না।গোপালের বয়স দশ-বারো বছর। গায়ের রঙ শ্যামলা। নাক বোচা। চুলগুলো মিশমিশে কালো, কোঁকরানো। চার ফুটের মতো উচ্চতা ওর। লিকলিকে শরীরের গড়ন। গোপাল যখন দৌঁড়ায় তখন মনে হয় বাতাসে ভেঙে পড়বে।
বন্ধুরা গোপালকে তালপাতার সেপাই বলে ক্ষ্যাপায়। মন খারাপ হয় গোপালের। কিন্তু প্রতিবাদ করে না। এ কারণে বন্ধুদের সঙ্গে খুব একটা মেশে না সে; একা একা বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। গাছের কোটর থেকে পাখির বাচ্চা, জঙ্গল থেকে ঢেঁকির শাক এবং ঝিল থেকে শাপলা তুলে আনে।
বড়শি দিয়ে মাছ ধরায় খুব আনন্দ হয় গোপালের। কখনও কখনও দু-একটি পুঁটি বা টেংরা মাছ কিংবা দু-মুঠো শাপলা তুলে এনে মাকে দিয়ে বলে, ‘মা খুশি হয়েছো তো?’ মা মুখ টিপে হাসেন। বলেন, ‘খুশি হবো না, আমার মানিক আমার জন্য কত কাজ করে দেয়! শাপলা তোলে, ঢেঁকির শাক এনে দেয়, মাছ ধরে আনে...!’
মায়ের কথায় গোপাল উৎসাহ পায় খুব। দ্বিগুণ আগ্রহে সে এইসব কাজে মন দেয়। কিন্তু পড়াশুনায় ওর মন নেই একটুও। মাস্টার মশাইয়রা পড়া জিজ্ঞেস করে গোপাল হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে। মাস্টারদের হাতে প্রায়ই মার খেতে হয় গোপালকে। একবার অংকের মাস্টার জোড়া বেত নিয়ে তেড়ে এলে গোপাল জানালা দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়েছিল। তারপর অনেক দিন স্কুলে যায়নি। মিনতি দিদি অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে গোপালকে আবার স্কুলমুখো করে।
মিনতি দিদির কথা কিছুতেই ফেলতে পারে না গোপাল। নিজের কোন বোন নেই গোপালের। মিনতি দিদিই যেন ওর আপন দিদি। মিনতি দিদির বাড়ি গোপালদের বাড়ির পাশেই। ছোট একটি খালের ও-পাড়ে। সুপারি গাছের একটি সাঁকো পার হয়ে মিনতি দিদিদের বাড়িতে যেতে হয়। কয়েকবার সাঁকো পার হতে গিয়ে পা-পিছলে পড়ে গিয়েছে গোপাল। ভেজা কাপড়েই দিদির সঙ্গে দেখা করেছে সে।
-কীরে গোপাল মাছ কিছু পেলি?
চমকে ওঠে গোপাল। তাকিয়ে দেখে মিনতি দিদি খালের ও-পাড়ে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছেন।
-না, দিদি, কিছুই পাইনি।
-পাবি না তো। সে তো আমি জানি।
-কী করে জানো?
-জানব না? আজ একটি বড় মাছ ধরতে পারলে আমাকে দিতে চেয়েছিলি, কি তাই না?
অবাক চোখে দিদিকে দেখে গোপাল। দিদিটা কি মানুষ, নাকি দেবতা! কী করে মনের কথা সব বুঝতে পারে!
-কী করে বুঝলাম, তাই ভাবছিস তো!
-ঠিক তাই। আচ্ছা দিদি বলো তো, আমার ভাবনাগুলো কী করে বুঝতে পারো তুমি?
-বলব না।
-কেন?
-যেদিন একটি মাছ আমাকে দিতে পারবি, সেদিন বলব।
-সে মনে হয় কোনদিনই হবে না। তোমাকে দেবো বলে যেদিনই বড়শি ফেলি সেদিন মাছেরা বড়শি খায় না। কী করি বলো তো!
-তুই কেন আমাকে মাছ দিতে চাইছিস, আমি কি তোর কাছে বলেছি যে আমাকে মাছ ধরে দিতে হবে?
-চাইতে হয় বুঝি! তুমি তো রোজ রোজ কত কি দাও আমাকে--পিঠা, পুলি, সন্দেশ, আরও কত কি!
-ও এই কথা!
-দিদি, রোজ রোজ কেন তুমি এতোসব আমাকে দাও?
-কেন, তোকে ভালোবাসি বলে!
-আমিও তো তোমাকে ভালোবাসি। আমারও তো ইচ্ছে হয় তোমাকে কিছু দিতে।
-ঠিক আছে বড় মাছ যেদিন পাবি, সেদিন দিস। আজ আর মন খারাপ করিস না। দেখ তো প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। এবার বাড়িতে যা, মন দিয়ে লেখাপড়া কর।
-আমি পড়তে চাই না।
-কেন?
-কেন আবার! লেখাপড়া করলেই তো শহরে যেতে হবে, গণেশদার মতো, শফিক ভাইয়ের মতো। ওরা গ্রাম ছেড়ে শহরে গেছে চাকরি করার জন্য। আমি শহরে যেতে চাই না। মাকে ছেড়ে, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না যে! তার চেয়ে এই ভালো তোমাদের কাছাকাছি আছি।
মিনতি দিদি হাসেন। সাঁকো পেরিয়ে গোপালের কাছে এসে ওর কপালে চুমো খায়। আঁৎকে ওঠে মিনতি।
-একি, গোপাল তোর গায়ে তো জ্বর!
-ও একটু...
-দেখি দেখি, তাকা তো আমার দিকে।
-গোপাল মিনতির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব দিদি?
-সে পরে করিস। তোর চোখ দুটি তো বেশ লাল। চল তোকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।
মিনতি দিদি গোপালকে হাত ধরে টেনে তোলে। তারপর একমুঠো বাতাসা তুলে দেয় গোপালের হাতে।
-দিদি তোমার নাকি বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তুমি নাকি আমাদের ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে?
মিনতি অবাক হয়ে বলে, কে বলেছে তোকে?
-মা বলেছে। সত্যিই কি শ্বশুরবাড়ি যাবে তুমি?
মিনতি গোপালের কথার কোন উত্তর দিতে পারে না।
গোপাল আবার বলে, তুমি চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে যাব দিদি। দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে যেও না কখনো।
মিনতি ওড়নার আঁচলে চোখ মোছে। তারপর বলে, তোর খুব জ্বর। একটুও বাইরে বেরুবি না। বিছানায় শুয়ে রেস্ট নিবি। আমি রোজ একবার এসে তোকে দেখে যাব।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে গোপাল। থমকে দাঁড়িয়ে মিনিতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি যদি আমার আপনার দিদি হতে!’
-গোপালের মা ওদের দু’জনকে আসতে দেখে ডেকে বলে, কীরে গোপাল আজও দিদির জন্য বড় মাছ পাসনি বুঝি?
-ওকে মিছিমিছি লজ্জা দিচ্ছেন কেন মাসিমা! ওর খুব জ্বর। বাদরটা যেন রোদে না বেরোয়, একটু খেয়াল রাখবেন।
মা হাসেন। বলেন, মিনতি তুমি আমার আপনার মেয়ে হলে না কেন?
-এ জনমে না হলেও আরেক জনমে হব মাসি মা। গোপালের মতো ভাই পাবো, আপনার মতো মা পেলে আমার কত আনন্দ হবে।
গোপাল উল্লসিত হয়, বলে, সত্যি বলছ, আরেক জনমে তুমি আমার দিদি হবে? কী আনন্দ! কী আনন্দ!
গোপালের জ্বর আর কিছুতেই আর ভালো হয় না। গ্রামের ডাক্তার পরামর্শ দেন গোপালকে শহরের ডাক্তার দেখাতে। বাবা শহরে বড় মাসির বাসায় গোপালকে নিয়ে যান। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, গোপালের টাইফয়েড হয়েছে। ভালো হতে সময় লাগবে।
কিন্তু শহরে গোপালের একটুও মন টেকে না। সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকে।
দিন পনেরোর মধ্যে গোপাল অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে আসার সময় মিনতি দিদির জন্য লাল রঙের কাঁচের চুরি কিনে আনার কথা চিঠিতে লেখে গোপাল। ঝন্টু-মন্টুদেরও চিঠি লেখে। ওর সে চিঠিতে গ্রামে ফিরে আসার আকুতি ঝরে পড়ে।
তারপর একদিন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গ্রামে ফেরে গোপাল। মা বলেন, ‘হ্যারে গোপাল, দিদিকে দেখতে যাবি না?’ গোপাল হেসে বলে, যাব তো! তবে মাছ নিয়ে। দেখো আজ বিকেলে বড়শিতে একটা বড় মাছ ধরা পড়বে। সেই মাছ নিয়ে মিনতি দিদিকে দেখে আসব।
সত্যি সত্যি বিকেলে গোপালের বড়শিকে বড় একটি শোল মাছ ধরা পড়ে। সন্ধ্যার আগে গোপাল মাছ আর কাঁচের চুরি নিয়ে মিনতি দিদির বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। তুলশী তলায় মিনতির মাকে দেখকে পেয়ে গোপাল জিজ্ঞেস করে, মাসি মা দিদি কোথায়?’
-তুই কখন ফিরলি গোপাল?
-সকালে। এই দ্যাখো দিদির জন্য মাছ আর কাঁচের চুরি নিয়ে এসেছি। তাড়াতাড়ি বলো দিদি কোথায়?
-কেন তুই জানিস না কিছু?
-না তো! কেমন করে জানব বলো? আমি তো ঢাকায় ছিলাম মাসির বাড়িতে। আমার তো অসুখ করেছিল। ওখানেই তো ডাক্তার আমাকে চিকিৎসা করেছেন। তাড়াতাড়ি বলো, দিদি কোথায়? তাকে ডেকে দাও।
-কেমন করে ডাকব। ওতো বাড়িতে নেই।
-কেন?
-মিনতির তো বিয়ে হয়ে গেছে। ও-তো এখন শ্বশুরবাড়ি।
-বলো কী, দিদি নেই! তাহলে এগুলো কার জন্যে নিয়ে এলাম?
জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায় গোপাল। ওর হাত থেকে শোল মাছ মাটিতে পড়ে লাফাতে থাকে আর কাঁচের চুরিগুলো ভেঙ্গে টুকুরো টুকরো হয়ে যায়।
২১ জুন, বাসস, ঢাকা


0 মন্তব্যসমূহ