হুসনুন নাহার নার্গিস
রুশ বিপ্লব (ফেব্রুয়ারি বিপ্লব) ১৯১৭ সালের ৮-১৬ই মার্চ সংঘটিত হয়েছিল; যার ফলে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের পতন হয়। রাশিয়ার তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার পরিবারকে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করে একটি অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠিত হয়।
১৯১৮ সালের ১৬-১৭ জুলাই, রাত তখন প্রায় ১টা। সকলে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাদের পারিবারিক চিকিৎসক ইউগেনে বটকিনকে নির্দেশ দিলো আর্মির জেনারেল ইয়াকভ ইউরভেস্কি তাদেরকে ঘুম থেকে উঠে পোশাক পরে সঙ্গের জিনিস নিয়ে নিচে আসতে, কারণ নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা তখন বাস করতো উড়াল পর্বতের কাছে একাটারিন বার্গে। দ্বিতীয় নিকোলাস, রাণী আলেকজান্দ্রিয়া, তাদের পাঁচ সন্তান এবং সর্বশেষে তাদের সাথে থেকে যাওয়া পারিবারিক ডাক্তার ইউগেন বট কিন, রানীর ব্যক্তিগত সেবাদানকারী এন্যা ডেমিডভা, রাজা নিকোলাসের সেবাদানকারি আলিক্সি ট্র্যাপ এবং প্রধান রন্ধন কর্মী ইভান খাভি টনভ তারাকে একসঙ্গে করা হল সেই বাড়িটির সবচেয়ে নিচের রুমে। পুরো পরিবার দাঁড়ালো এমনভাবে, যেন তারা ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়েছে। রানী আলেকজান্দ্রিয়া কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার জন্য একটা চেয়ার চেয়ে নিলো। ১৩ বছর বয়সী পুত্র এলিক্সি অসুস্থ থাকার জন্য পিতা নিকোলাস আরও একটা চেয়ার চেয়ে নিলো তাকে বসানোর জন্য। তারা সেখানে অপেক্ষা করছে তখন হ্যান্ডগান, পিস্তল আর ভারী অস্ত্রসহ ১০ জন আর্মি প্রবেশ করে। পরবর্তীতে যা ঘটেছিল তা ছিল ভয়াবহ, যার মধ্যে দিয়ে তিনশত বছরের রাশিয়ার জার ডাইনেসটি শেষ হয়। দ্বিতীয় নিকোলাসের পরিবারের সবাই বন্ধুকের গুলি আর বেয়নেটের আঘাতে মারা গেলেও তাদের গল্প ফুরালো না।
কে এই দ্বিতীয় নিকোলাস?
![]() |
নিকোলাস ২ ও তার পরিবার |
নিকোলাস ২ এবং তার পরিবার
নিকোলাস ছিলেন পরবর্তী সিংহাসনে বসার উত্তরাধিকারি। জন্ম ১৮৬৮ সালের ১৮ই মে। জার আলেকজান্দ্রা এবং মেরী ফিওদরভনা-এর প্রথম সন্তান। সে এবং তার ভাইবোনরা বড়ো ওয়ে ওঠে তসারস্কয়ে সেলোতে, এটা ছিল ইমপরিয়াল পরিবারের অনেকগুলো বাসস্থানের মধ্যে একটি। যা পিটারসবার্গ থেকে কিছুটা দূরে ছিল।
নিকোলাস স্কুলের পড়া ছাড়াও বন্ধুক ছোঁড়া, ঘোড়ায় চড়া, এমনকি নৃত্যও শিখেন। কিন্তু তার পিতা আলেকজান্দ্রা-৩ তাকে যথেষ্ট সময় দেননি কীভাবে এত বড়ো রাশিয়ার নেতৃত্ব দেয়া যায় তা শেখার ব্যাপারে। পরবর্তীতে যে নেতৃত্বের গুণাবলী থাকা দরকার দুর্ভাগ্যবশত তা তার জানা ছিল না।
যুবক বয়সে তিনি বেশীর ভাগ সময় ব্যয় করেছেন পৃথিবী ভ্রমণ করে এবং অসংখ্য পার্টিতে যোগ দিয়ে। তার সঙ্গে ছিল বলস পার্টি।
১৮৯৪ সালের এক গ্রীষ্মে তিনি জার্মানির রাজকন্যা অ্যালেকজান্দ্রিয়া অ্যালিস্কির সাথে এনগেজড হন। কিন্তু তার এই সহজভাবে নেওয়া জীবনের সমাপ্তি হয় ১৮৯৪ সালের পহেলা নভেম্বরে তার পিতা আলেকজান্দ্রা-৩ এর মৃত্যুতে । তিনি মারা যান কিডনিজনিত অসুখে । আর রাতারাতি দ্বিতীয় নিকোলাস নতুন জার হয়ে যান। কোনো রকমের অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাকে জার হতে হয়। তার এডভাইজারকে তিনি বলেছিলেন ‘জার হওয়ার জন্য আমার প্রস্তুতি নেই আর আমি জার হতেও চাইনি।’ ১৮৯৪ সালের নভেম্বরের ২৬ তারিখে পিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এবং নিকোলাস আর আলেক্সির বিয়ের অনুষ্ঠান একটা প্রাইভেট অনুষ্ঠানের মধ্যে শেষ করা হয়।
পরবর্তী বছরে তাদের প্রথম সন্তান ‘ওল্গা’র জন্ম হয়। তারপর তাদের আরও তিন কন্যা সন্তান ‘তাতিয়ানা’, ‘মারিয়া’ এবং ‘এন্যাস্তাসিয়ার’ জন্ম হয় । পাঁচ বছর পরে তাদের পুত্রসন্তান ‘এলিক্সির’ জন্ম হয় ১৯০৪ সালে। এই পুত্রের জন্য এতদিন তারা অপেক্ষা করছিল কারণ সিংহাসনে বসার জন্য একজন পুত্রের দরকার।
জনগণ তার বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার কারণ
দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই রাশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। কোনো নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না। কারণ তার পিতা একজন ডিক্টেটর ছিলেন। সে যা নির্দেশ দিতো তাই মানুষকে মানতে হতো। তখন প্রেস-এর স্বাধীনতা ছিল না। এমনকি সে কারোর রাশান ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলাও পছন্দ করতেন না । এই সব কারণে রাশিয়ার জনগণ জারের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় নিকোলাস তার পুরো শাসন আমল জনগণের রোষানলের মধ্যে থাকতে হয়েছে। ক্রমাগত যুদ্ধ তাকে চালিয়ে যেতে হয়েছে এমন এক পরিস্থিতির সঙ্গে যেখানে জনসাধারণ তার পেছনে ছিল না।
১৮৯৬ সালের ১৮ই মের করনেসানের দুঃখজনক ঘটনা
দ্বিতীয় নিকোলাস ছিল জার আমলের শেষ জার এবং তার অভিষেক। এটাই জার আমলের শেষ অভিষেক। সেদিন ছিল রাণী অ্যালিক্সির জন্মদিন উপলক্ষে উপস্থিত জনসাধারণের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। জনগণের মধ্যে একটা গুজব ছড়িয়ে পরে যে সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার এবং পানীয় নাও থাকতে পারে এবং এখানে উপঢৌকন হিসাবে একটা কাপের মধ্যে সোনার মুদ্রা রাখা থাকবে, যা নেওয়ার জন্য জনসাধারণের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায় এবং পদদলিত হয়ে অনেক মানুষ মারা যায় এবং আহত হয়। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ থাকলেও ১৮০০ মানুষকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার মধ্যেও নিকোলাস অভিষেক উৎসব বন্ধ করেনি। সাধারণ মানুষ নিকোলাসকে ÔNikolas The BloodyÕ বলে গাল দিতে কুণ্ঠা করেনি!
জারের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে অসন্তোষ
পরপর কিছু ঘটনায় দ্বিতীয় নিকোলাস প্রমাণ করে দেশের ভিতরে কি দেশের বাইরে কিম্বা অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তার দেশ চালনার অভিজ্ঞতার অভাব। ১৯০৩ সালে জাপানের মানচুরিয়ার দখল করে নিলে জাপান এবং রাশিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগে। যে কোনো ধরনের মীমাংসার জন্য নিকলাস কোনো সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেননি। নিকলাসের এই রকম কার্যকলাপে জাপান হতাশ হয় এবং ১৯০৪ সালে রাশিয়ার জাহাজে বোমা ফেলে। জাহাজটি ছিল পোর্ট আরথারে, মানচুরিয়ার দক্ষিণে। প্রায় দেড় বছর জাপান আর রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ চলতে থাকে। ১৯০৫ সালে জারকে বাধ্য হয়ে সারেন্ডার করতে হয়। রাশিয়ার এই পরাজয়ের কারণে নিকলাস জনগণের কোন সাপোর্ট পাননি।
প্রতিবাদ মিছিলে গুলি
দারিদ্র্যের কষাঘাত, শ্রমিকের অল্প বেতন এবং খাদ্যের অভাবে শত শত মানুষ প্রতিবাদ মিছিল বের করে। যদিও সেটা ছিল শান্তিপূর্ণ। জারের সৈন্যরা জনতার উপর গুলি ছোঁড়ে । শতশত লোকের মৃত্যু হয় এবং আহত হয়। সে সময় জার প্রাসাদে না থাকলেও সমস্ত দায় তার ঘাড়ে এসে পড়ে।
দ্বিতীয় নিকোলাস এবং তার স্বভাব
নীল চোখের অধিকারী নিকলাস হ্যান্ডসাম হলেও আকর্ষণীয় ছিল না। সে ছিল অহংকারী, নিজেকে বড়ো মনে করা, অন্যকে সম্মান দিতে না জানা, একগুঁয়ে, মন্ত্রীদের সাথে হিংসাপরায়ণ রাখার স্বভাব। তার এই স্বভাবের জন্য নিজ সরকারের লোকজন তার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।
ক্ষমতাচ্যুত নিকোলাস
তারপরে শুরু হয় বলসেভিক দল আর জারের পক্ষের হোয়াইট দলের মধ্যে গৃহযুদ্ধ। পশ্চিমা দেশগুলো হোয়াইট দলকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। বলসেভিক ক্ষমতায় আসে ১৯১৭ সালের অক্টোবরে। ১৯১৭ সালের ২২শে মার্চ নিকোলাসকে তার পরিবারের পরিবারের অন্যান্য সদস্য-সহ ক্ষমতা থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয় । তারা প্রথমে বন্দী ছিল আলেকজান্ডার প্যালেসে।
এ সময় লেনিন নেতা হিসাবে ক্রমাগতভাবে জনপ্রিয় হতে থাকে। লেনিন মনে করতে থাকে নিকোলাশকে গুলি করে মারা না হলে রেভুলেশন সম্ভব নয়।
জারের প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তীতে প্রাদেশিক গভর্নর যার নাম আলেকজান্ডার কেরেন্সকি টবলস্কি নামে একটি স্থানে—যা কিনা সাইবেরিয়ায়, সেখানে সরকারি এক বাসভবনে নিকোলাস এবং তার পরিবারকে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি বলসেভিক পার্টি এবং লেনিন দ্বারা অপসারিত হন। ফলে নিকোলাসের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারটা নাজুক হয়ে পড়ে। নিকোলাস তখন গৃহবন্দী, জার হিসাবে তার নাম তুলে নেয়া হয়েছে এবং মাথার মুকুট সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
লেনিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জারের পরিবারটিকে ১৯১৮ সালের দিকে টবলস্কি থেকে সরিয়ে পশ্চিমের দিকে সরানো হয়। তাদেরকে ট্রেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুত্র এলেক্সি অসুস্থ থাকার জন্য সে এবং তার চার বোন তিন সপ্তাহ পরে বাবা-মার সাথে যোগ দায়। সেখানে পুরো পরিবারকে ‘বিশেষ প্রয়োজনের বাড়ি’ বলে এক বাড়িতে রাখা হয়েছিল। আসলে এটা ছিল একটা জেলখানা। চারদিকে ভারী অস্ত্রসহ সেনা মোতায়েন ছিল। খাবার-দাবার ছিল সাধারণ। কারো সাথে কথা বলা নিষেধ ছিল। তাদেরকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে করা হয়নি। করা হয়েছে এক বছর আগে থেকে। প্রধান পরিকল্পনাকারী হলো বলসেভিক দলের নিয়োগপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল ইয়াকভ ইউরোভেসকি। সে নিকোলাশের পুরো পরিবারকে হত্যা করার জন্য একটি দল গঠন করে।
করা হয়, সেখানে নির্মিত গীর্জা এখানে থাকা অবস্থায় চারবোনের মধ্যে বড় মেয়েটি কিছুটা ডিপ্রেস হয়ে পড়ে আর তৃতীয় মেয়েটি মারিয়া তরুণ পাহারারত সৈনিকদের সাথে রোমান্সে জড়িয়ে যায়। তারা মেয়েদেরকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় সাহায্য করতে থাকে। বিষয়টি লেনিনের কানে গেলে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে। তরুণ পাহারাদারদের সরিয়ে ফেলা হয়।
১৯১৮ সালে বোঝা যাচ্ছিল যে এক্তারিস্কবার্গ হোয়াইট আর্মির দিকে চলে যাচ্ছে। গলসচেকিন ( এড়ষড়ংযবশরহ) লেনিনের অনুমতির জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলল । গলসচেকিন হলেন নিকোলাস পরিবারকে হত্যা করার আর একজন প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং বলসেভিক দলের সদস্য । লেনিন লিখিত অনুমতি দেননি।
সেদিন রাতে যা ঘটেছিল
রাত একটার দিকে পুরো পরিবারকে নিচের ঘরে আনা হলো। বাইরে নিয়ে যাবার গাড়িটির ইঞ্জিন চালু অবস্থায় রাখা ছিল যেন তারা শব্দ শুনে মনে করে গাড়ি অপেক্ষা করছে। তারপর ১১ জনের একদল আর্মি রিভালভার এবং বন্দুকসহ প্রবেশ করে এবং খুব তাড়াতাড়ি হঠাৎ করে ইউরভেস্কি একটা কাগজ বের করে তাদেরকে ডেথ প্যানালটি পড়ে শুনায়। নিকোলাস বলে ওঠে ‘কী বললে আবার পড়ো তো!’ খুব তাড়াতাড়ি ইয়ুকিভস্কি আবার পড়ে শুনায়। নিকোলাস পরিবারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠে ‘কী-কী!’ সঙ্গে সঙ্গে গুলি ছোঁড়া শুরু হয়। প্রথমেই গুলি করা হয় নিকোলাস এবং আলেকজান্দ্রিয়াকে লক্ষ করে। তারা মেঝেতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তারপর অন্যদেরকে গুলি করতে থাকে। ২০ মিনিট চলে গোলাগুলি। কেউ কেউ মারা গেলেও অনেকে তখন আহত ছিল। আহতদের কাতর চিৎকার শুরু হয়। মেয়েদেরকে গুলি করলেও পোশাকের নিচে সেলাই করা দামি মণি-মুক্তা ও হীরার লেয়ার থাকায় তা ঢালের কাজ করছিল। যা তারা লুকিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তাদেরকে তখন মাথা লক্ষ করে গুলি করা হয় । বাইরে মেয়েদের পোষা কুকুরগুলি ঘেউ ঘেউ করছিল। কুকুরগুলিকেও গুলি করে মেরে ফেলা হয়। মরা লাসগুলো অপেক্ষারত গাড়িতে তোলার সময় দেখা গেলো মেয়েদের দুটো লাশ তখনো কিছুটা জীবিত। দুটো মেয়েকেই বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
রাশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং মৃত লাশগুলোর ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, জার শাসকদের যতই নিষ্ঠুরতা থাক না কেন একটা ব্যাপার থেকেই যাবে এবং তা হলো সেই রাত্রের নির্মম ও নিষ্ঠুরতার ভয়ংকর, বীভৎস, বিভীষিকাময় ঘটনা, হৃদয়বিদারক এবং সেই দৃশ্য অবশ্যই ছিল সহ্যের বাহিরে।
0 মন্তব্যসমূহ