মিসতি (Miss Harriet)
গী দ্য মোপাসাঁ
(একটি অবিবাহিতের স্মৃতিচারণ থেকে)
যে সময়ের কথা বলছি সে-সময়ে আমার অদ্ভুত প্রকৃতির একটি প্রেমিকা ছিল। দেখতে বেঁটে-খাটো। প্রেমিকাটি অবশ্য বিবাহিতা ছিল; কারণ অবিবাহিতা মেয়ের সম্বন্ধে আমার একটা ভয় ছিল। সত্যি কথা বলতে কি বিবাহিতা মেয়েদের অসুবিধে দুটো। প্রথমত তারা বিশেষ কারও নয়; দ্বিতীয়ত, সকলের কাছেই তারা সমান ভাবে উপভোগ্য। এইরকম সর্বভূতে প্রেম বিতরণকারীকে প্রেমিকা হিসেবে পাওয়ার মধ্যে আনন্দ কোথায়? আর সত্যিই, নীতির কথা ছেড়ে দিয়েও, পেশাগত প্রেমটাকে আমি বরদাস্ত করতে পারি না। কোনও মহিলা ভালোবাসাটাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছে জানতে পারলে বিরক্তিতে আমার শরীর রি-রি করে ওঠে। জানি, এটা আমার দুর্বলতা; তবু আমি তা স্বীকার করছি।
কোনও একটি বিবাহিতা রমণীকে প্রেমিকা হিসাবে পাওয়াটা যেকোন অবিবাহিত পুরুষের পক্ষেই আনন্দের কথা। সবচেয়ে বড় আনন্দ হচ্ছে প্রেমিকা তাকে একটা আস্তানা দেয়, সেইসঙ্গে দেয় ঘরের নিশ্চিন্ত আরাম,—এমন একটি ঘরোয়া আমেজের সৃষ্টি করে যেখানে সবাই—স্বামী থেকে শুরু করে বাড়ির চাকর-চাকরানিরা পর্যন্ত—তোয়াজ করতে-করতে তাকে একেবারে নষ্ট করে ফেলে। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, বিছানা, খাবার টেবিল, এমনকি শিশুর পিতৃত্ব পর্যন্ত—এক কথায় ঘরের সুখ বলতে যা বোঝায় সব একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই আনন্দে। তার সঙ্গে মিশিয়ে থাকে বিরাট একটা সুবিধে। সুবিধেটা হলো, প্রয়োজনবোধে মাঝে-মাঝে আপনি বাড়ি বদল করতে পারবেন; গ্রীষ্মের সময় ঘুরে-ফিরে হয়তো গ্রামে গেলেন, কোনও শ্রমিকের বাড়িতে হাজির হলেন; শ্রমিকটি তার বাড়িতে একটি ঘর আপনাকে দেবে থাকতে; শীতকালে হয়তো মধ্যবিত্ত কোনো সংসারে আস্তানা নিলেন; অথবা আপনার যদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে, বা বেপরোয়া হতে পারেন, তাহলে এমনকি কোনও ধনী এবং সম্ভ্রান্ত বাড়িতেও আশ্রয় পেতে পারেন আপনি।
আমার আর একটা দুর্বলতা রয়েছে। আমি আমার প্রেমিকাদের স্বামীদের পছন্দ করি। স্বীকার করি এমন অনেক স্বামী রয়েছে যাদের রুচি স্থূল এবং বিকৃত। যত সুন্দরীই হোক, সেইসব স্বামীদের স্ত্রীদের আমি পছন্দ করি না। কিন্তু যে-স্বামীদের সূক্ষ্ম রসবোধ এবং রুচিবোধ রয়েছে তাদের আমি ভালো না-বেসে পারিনা। স্ত্রীর সঙ্গে সম্বন্ধ চুকে-বুকে গেলেও, তার স্বামীর সঙ্গে যাতে কাটছাঁট না হয় সেদিক থেকে আমি বেশ সতর্ক থাকি। এইভাবেই জীবনে আমি অনেক ভালো বন্ধু সংগ্রহ করেছি; এবং পুরুষরা যে এদকি থেকে নারীদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত তার প্রমাণ আমি অনেকবার পেয়েছি। কোনওরকম সন্দেহের ছায়াপাত হলেই, মেয়েরা আপনাকে যত রকমে পারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে; হইচই করবে, তিরষ্কার করবে; আপনাকে বিব্রত করার যত রকমের অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে তার কোনোটাই ব্যবহার করতে তারা দ্বিধা করবে না। আর স্বামীরা, যদিও অভিযোগ করার সমান অধিকার তাদেরও থাকে, আপনার সঙ্গে গৃহদেবতার মতো ব্যবহার করবে।
যা বলছিলাম। আমার প্রেমিকা বেঁটে-খাটো চেহারার একটা বেশ মজার মহিলা ছিল : কালো রঙ, খামখেয়ালি, অদ্ভুত প্রকৃতির, ধর্মপ্রবণা, কুসংস্কারাচ্ছন্না সাধুর মতো বিশ্বাসী—কিন্তু বড় লাবণ্যময়ী। সবার ওপরে তার একটা মাদকতা ছিল; সেটা নিহিত ছিল তার চুমু খাওয়ার রীতিতে। তার চুমু খাওয়ার ধরনটা এত চমৎকার ছিল যে-রকমটি আমি অন্যকোনো মহিলার মধ্যে দেখতে পাইনি।...কিন্তু সেসব কথা এখন থাক...আর কী নরম তার চামড়া! আর তার চোখ দুটি...তার চাহনি মনে হবে একটা অনির্বচনীয় মিষ্টি সোহাগ যেন আপনার সারা সত্তার ওপরে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। প্রায়ই আমি তার কোলের ওপরে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে থাকতাম; নারীদের স্বভাবসিদ্ধ প্রাণকাঁপানো মিষ্টি ছোট ছোট হাসির টুকরো ছড়িয়ে দিয়ে সে আমার মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়তো, আমি ধীরে-ধীরে উঁচিয়ে দিতাম আমার মুখ। মনে হতো কোনও সুস্বাদু মদ ফোঁটা ফোঁটা করে সে আমার মুখের মধ্যে ঢেলে দিচ্ছে; আমি তাই একটু একটু করে পান করছি; আমার সারা শরীর আর মন স্বর্গীয় আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠছে।
তার স্বামী ছিলেন চাকুরে। চাকুরির খাতিরে তাঁকে প্রায়ই বাইরে যেতে হতো; ফলে সন্ধেবেলাটা প্রায়ই আমাদের ফাঁকা থাকত। অনেকদিনই ওই সময়টা আমি তার ঘরে কাটাতাম। ডিভানের ওপরে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতাম আমি। আমার কপালটা তার একটা পায়ের ওপরে থাকত চাপানো; তার অন্য একটা পায়ের ওপরে শুয়ে থাকতো বিরাট একটা কালো বিড়াল। তার নাম ছিল মিস্িত। বিড়ালটাকে সে বড় ভালোবাসত। সেই জানোয়ারের পুষ্ট কাঠের ওপরে সিল্কের মতো চকচকে লোমের ভেতরে চিরে-চিরে আমাদের হাতের আঙুলগুলি পরস্পরকে সোহাগ জানাতো। আমার গালের ওপরে গা ঘেষে শুয়ে থাকত বিড়ালটা; শুয়েশুয়ে গর গর করে সারাক্ষণই সে শব্দ করত। কখনও বা থাবাটা তার আমার মুখের ওপরে ছড়িয়ে দিত; চোখের ওপরে মেলে দিত তার পাঁচ-পাঁচটা খোলা নখ; সেই নখগুলো দিয়ে আমার গালে খোঁচা দিয়ে বিদ্যুতের বেগে আবার থাবার মধ্যে ঢুকিয়ে নিত।
মাাঝে-মাঝে আমরা কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতাম। আসলে সেগুলি সব নির্দেষ উচ্ছৃঙ্খখলতা। কখনও কখনও আমরা একটু দূরের রেস্তোরাঁতে গিয়ে খেতাম; অথবা, বাড়িতে খাওয়া সেরে, বাইরে ঘুরে আসতাম, কোনোদিন বাঁধনছেড়া ছাত্র-ছাত্রীদের মতো আমরা নিচু দরের রেস্তোরাঁতে হাজির হতাম।
মাঝে-মাঝে একেবারে জলো-মদের দোকানে গিয়ে হাজির হতাম আমরা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই দোকানের এককোণে একটা নড়বড়ে কাঠের টেবিলের ধারে গিয়ে সরু লিকলিকে মচকানো চেয়ারের ওপরে বসতাম। ডিনারের পরে ভাজা মাছের যে উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকে তার ভেতর থেকে একটা তীব্র কটু গন্ধ ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত। ছোট জামা গায়ে দিয়ে খদ্দেররা সব গোলমাল করত আর ব্র্যানডি টানত। ওয়েটারেরা আশ্চর্য হয়ে আমাদেও পরিবেশন করত ‘চেরি’ ব্র্যানডি।
মিষ্টি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দুভাজ করা কালো ঘোমটাটা নাকের ওপরে তুলে দিয়ে সে মদের পেয়ালাতে চুমুক দিত—মনে হতো, সে যেন পরম পরিতৃপ্তিকর কোনও একটা পাপ করছে। চেরির এক-একটা ঢোক তার গলার ভেতর দিয়ে ঢুকছে, আর সে ভাবছে একটা পাপ করা হলো; নিষিদ্ধ জিনিস ভক্ষণ করায় মানুষের যে আনন্দ রয়েছে এ আনন্দ তার চেয়ে কোনও অংশেই কম ছিল না আমার প্রেমিকার কাছে।
তারপরে সে আমাকে বলত : এবারে চলো, ওঠা যাক। আমার বেরিয়ে আসতাম। মাথা নিচু করে ছোট ছোট পা ফেলে অতিথিদের পাশ দিয়ে সে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে আসত ; মদ্যপায়ীরা ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকে বেরিয়ে আসতে দেখত; রাস্তার ওপরে বেরিয়ে আসার পরে আমরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম; মনে হতো যেন একটা বিষম বিপদ থেকে এইমাত্র মুক্তি পেয়েছি আমরা।
মাঝে-মাঝে ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে সে আমাকে জিজ্ঞাসা করত : আচ্ছা এই রকম কোনো জায়গায় কেউ যদি আমাকে অপমান করে তাহলে তুমি কী করবে? আমি বড়াই করে বেশ উচ্চ নাদেই বলতাম : করলেই হলো? আমি তোমাকে রক্ষা করব। এই কথা শুনে সে পরম সুখে আমার হাত ধরে মোচড় দিত; তার হাবভাব দেখে মনে হতো, সে যেন এইরকমেরই একটা পরিস্থিতি ঘটুক তাই চাইছে। সে যেন চাইছে কেউ তাকে অপমান করুক; আর আমি তার সঙ্গে সকলের সামনে লড়াই করি।
একদিন সন্ধ্যাবেলা আমরা মন্টমার্টি কাফেতে একটি টেবিলের ধারে বসে রয়েছি এমন সময় একগোছা তেলচিটচিটে ময়লা তাস হাতে নিয়ে একটা ভিখারিনিকে ভেতরে ঢুকতে দেখলাম। একটি সম্ভ্রান্ত মহিলা বসে রয়েছে দেখে বৃদ্ধাটি সোজা আমাদের কাছে এসে হাজির হলো; বলল আমার সঙ্গিনীর ভাগ্য গণণা করে দেবে। এমার (আমার প্রেমিকার নাম) আস্থা ছিল অসীম। পৃথিবীর সবকিছুই সে বিশ্বাস করত। তার কথা শুনে সে যুগপৎ পুলকিত হলো, আর অস্বস্তিতে পড়ল। ডাইনি চেহারার বুড়িটাকে সে নিজের পাশে বসতে দিল।
বৃদ্ধাটিকে ডাইনি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি আমি। কাঁচা মাংসের আংটি তার কপালের ওপরে ঝোলানো; দন্তহীন মাড়ি। সে-চেহারা দেখলে এমনিতেই অস্বস্তি জাগে। সে তার সেই নোংরা তাসগুলি টেবিলের ওপরে বিছিয়ে দিল। তারপর সেগুলিকে একসঙ্গে জড় করল, আবার দিল বিছিয়ে; বিড়বিড় করে কীসব বলতে লাগলো। বিবর্ণ মুখে, দুঃখ আর কৌতূহলে হাঁপাতে-হাঁপাতে এমা সব শুনতে লাগলো; উত্তেজনায় তখন তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে।
মুখ খুলল ডাইনি বুড়ি। তার ভবিষ্যৎ বাণীগুলির সব কটিই অস্পষ্ট; সুখ এবং ছেলেপিলে, একটি সুন্দর যুবক, ভ্রমণ, অর্থ, মামলা, একজন কালোপানা ভদ্রলোক, একটি বন্ধুর প্রত্যাবর্তন, একটি সফলতা, এবং একটি মৃত্যু। মৃত্যুর কথাটা ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সঙ্গিনীটি বিব্রত হয়ে উঠল। কার মৃত্যু? কখন? কেমন করে?
বৃদ্ধাটি বলল : সে কথা আমার এই তাস দিয়ে বলা শক্ত। যদি জানতে চাও কাল আমার সঙ্গে তোমাদের দেখা করতে হবে। আমি কফির চিহ্ন দিয়ে তা তোমাদের বলে দেবো। কফির চিহ্ন কোনদিন মিথ্যে কথা বলে না!
উদ্বিগ্ন হয়ে এমা আমার দিকে তাকাল।
কাল আমরা যেতে পারি, কি বল? চল,চল; লক্ষ্মীটি! না গেলে আমি কী রকম কষ্ট পাব তা তুমি বুঝতে পারছ না।
আমি হাসতে লাগলাম।
ঠিক আছে। তুমি যেতে চাইলে নিশ্চয় যাব।
বৃদ্ধাটি তার ঠিকানা দিয়ে গেল।
বুতিস-শ্যামোন্ট-এর পেছনে যে ভীতিপ্রদ বাড়িটা রয়েছে তারই ছতলায় বৃদ্ধাটি থাকত। পরের দিন সেখানে হাজির হলাম আমরা।
ঘর তো নয়, একটা চিলেকোঠা। দুটি চেয়ার আর একটি বিছানা; অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিসে ঘরটা একেবারে বোঝাই। পেরেক থেকে চারপাশে নানা রকম গাছের ডাল ঝুলছে; মরা জানোয়ারের শুকনো দেহ, বোতল, শিশি—শিশির ভেতরে নানা রকম তরল পদার্থ ভর্তি। টেবিলের ওপরে একটা কালো বিড়াল। তার চকচকে চোখ দুটো দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাকে দেখেই মনে হলো এই অশুভ ঘরের সেইটিই হলো অশুভ আত্মা।
উত্তেজনায় অধীর হয়ে একটা চেয়ারের ওপরে বসে পড়েই এমা আমাকে লক্ষ্য করে বলল : দেখো দেখো, বিড়ালটাকে দেখো। ঠিক আমাদের মিস্তির মতো দেখতে, নয়?
তারপরেই সে বৃদ্ধাটিকে বুঝিয়ে দিলো যে তারও একটা ওই রকম বিড়াল রয়েছে। একেবারে ওই রকম দেখতে।
ডাইনিটি বেশ গম্ভীর গলাতেই বলল : যদি তুমি কাউকে ভালোবাস তাহলে কখনও বিড়াল পুষো না।
রীতিমত ভয় পেয়ে এমা জিজ্ঞেস করল : কেন?
বেশ সহজভাবেই বৃদ্ধাটি তার পাশে বসে তার একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে বলল : আমার জীবনে দুঃখ বয়ে এনেছে।
আমার বান্ধবীটিকে আর ধরে রাখা গেল না। বৃদ্ধার জীবনে কী করে সে দুঃখ ডেকে আনলো তা শোনার জন্যে সে অস্থির হয়ে উঠল। সেইকথা বলার জন্যে সে বৃদ্ধাটিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলো। অলৌকিকতত্ত্বে বিশ্বাসিনী দুটি নারীই একইভাবে চিন্তা করে; ফলে তারা হৃদয় আর মনের দিক থেকে খুব তাড়াতাড়ি পরস্পরের ভগ্নীর স্থান অধিকার করে ফেলল। অবশেষে বৃদ্ধাটি মনোস্থির করে ফেলল।
সে বলল : বিড়ালটাকে আমি নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসতাম। ঘরে আমি সেলাই-এর কাজ করতাম। মনটন (বিড়ালের নাম) ছাড়া আর কেউ আমার নিজের বলতে ছিল না। এখানকারই একজন বাসিন্দা ওকে দিয়েছিল। শিশুর মতোই ও ছিল চালাক; সেই সঙ্গে শান্তও। আমাকে ও পূজো করত; অন্ধ পূজারী বলতে যা বোঝা যায় ও ছিল তাই। সারাদিন ও আমার কোলে বসে ঘড়ঘড় শব্দ করত। সারারাত আমার বালিশের ওপরে আরাম করে শুয়ে থাকত। ওর বুকের ধুঁকধুঁকোনিটা পর্যন্ত আমি শুনতে পেতাম; হ্যাঁ, পেতাম।
এইসময় একটি যুবকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। ছেলেটি সুন্দর; ছিটের দোকানে সে কাজ করত। এইভাবে মাস তিনেক কাটলো। এর ভেতরে তাকে আমি কিছু দিইনি। কিন্তু তুমি জানো ব্যাপারটা কী! ধীওে ধীরে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে—সকলের জীবনেই এরকম ঘটনা ঘটে। তাছাড়া, ছেলেটিকে আমিও ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। ছেলেটা সত্যিকার ভালো, আচার-ব্যবহার একেবারে নিখুঁত। হৃদয়টা তার বড়ো উদার ছিল। ব্যয়সঙ্কোচ করার জন্যে সে চেয়েছিল আমরা দুজনে একসঙ্গে থাকি। একদিন সন্ধের সময় আমার ঘরে আসার জন্যে তাকে আমি নিমন্ত্রণ করলাম। একসঙ্গে বাসা বাঁধবো কিনা সে বিষষয়ে তখনও আমি মনোস্থির করে উঠতে পারিনি—না, না, পারিনি। তবে ঘণ্টাখানেক একসঙ্গে থাকার চিন্তাটা আমার ভালোই লেগেছিল।
প্রথম দিকে সে বেশ সংযতই ছিল। তার মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে আমার মনটা নড়ে উঠল। মাদাম, তারপরে সে আমাকে চুমু খেল—একটি দীর্ঘ প্রেমিকের চুম্বনে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটি বন্ধ করে বিকল হয়ে আমি তখন এক স্বর্গীয় আনন্দে মসগুল হয়ে রয়েছি, এমন সময় হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে আমাকে ঠেলে দিয়ে সে চিৎকার করে উঠল যন্ত্রণায়। সে চিৎকার আমি আজও ভুলতে পারিনি। চোখ খুলে দেখি মনটন তার মুখের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নখ দিয়ে তার গালটা ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ছিঁড়ছে। স্রোতের মতো রক্ত ঝড়ে পড়ছে তার গাল থেকে।
আমি বিড়ালটাকে টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম; কিন্তু পারলাম না। সে শক্ত করে তার গালের মাংস কামড়ে ধরেছে। সে ক্রমাগত তাকে আঁচড়াতে লাগলো; রাগে সে এতই উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল যে আমাকেও সে আঁচড়াতে এলো। শেষে অনেক কষ্টে তাকে আমি ধরে ছাড়িয়ে নিলাম; তারপরে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিলাম। তখন ছিল গ্রীষ্মকাল; তাই জানালাগুলো খোলা ছিল।
হতভাগ্য বন্ধুটির মুখ পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি দুটি চোখই তার নষ্ট হয়ে গিয়েছে। একটি বছর পরে সে মারা গেল। আমি তাকে এখানে এনে সেবাযত্ন করতে আর খাওয়াতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সে এলো না। ওই ঘটনার পরে সে আমাকে রীতিমত ঘৃণা করতে লাগল।
নীচে পড়ে যাওয়ার পলে মনটন তার পিঠের শিরদাঁড়াটা ভেঙে ফেলল। এ বাড়ির দারোয়ান ওর দেহটাকে কুড়িয়ে এনে দিলো। বিড়ালটার ওপরে আমার কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। আমি ওর শিরদাঁড়াটা ভালো করে বেঁধে দিলাম। ও যে ওরকম একটা কাজ করল তার একমাত্র কারণ ও আমাকে ভালোবাসত। তাই নয় কি?
কাহিনিটি শেষ হলো বৃদ্ধার। মরা জানোয়ারের দেহটিকে হাত দিয়ে সে একবাড় চাপড়ালো; সেই শীর্ণ কঙ্কালটা কেঁপে-কেঁপে উঠল।
এমার মনটাও তখন মুচড়ে-মুচড়ে উঠছে। যে ‘মুত্য’র কথা শুনতে আসা সে কথা সে একেবারেই ভুলে গেল। যাই হোক, ও নিয়ে আর সে কোন কথাই বলল না। বৃদ্ধাকে পাঁচটি ফ্রাঁ দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে।
পরের দিনই এমার স্বামী ফিরে এলেন। সেইজন্যে কয়েকটা দিন তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।
তারপরে আবার তার বাড়িতে আমাদের যখন দেখা হলো তখন মিস্তিকে দেখতে না পেয়ে আমি একটু অবাকই হলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, সে কোথায়?
এমা লজ্জায় একটু হেসে বলল : তাকে আমি বিলিয়ে দিয়েছি। তাকে আমার ভালো লাগছিল না।
আশ্চর্য হলাম।
ভালো লাগছিল না! ব্যাপারটা কী বলতো?
একটি দীর্ঘ চুম্বন দিয়ে এমা বিড়-বিড় করে বলল : মিষ্টি ছেলে, আমার ভয় লাগছিল তোমার চোখ দুটির জন্যে।
ইউটিউবে শুনুন গল্পটি
https://youtu.be/c4mBMzQcqaU?si=9HwmemyLawa6P396


0 মন্তব্যসমূহ