নাসির আহমেদ কাবুল
।। তৃতীয় পর্ব ।।
বিনিতা চলে যাওয়ার সময় যে চোখে তাকিয়েছিল, সেই দৃষ্টি বারবার মনে পড়তে লাগল আপনার। অদ্ভুত সেই দৃষ্টি। তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা ছিল, সংকোচ ছিল, অসহায়ত্বও ছিল—কিন্তু শুধু এগুলোই ছিল কি?
আপনি বুঝতে পারলেন না।
শহরের নামকরা ব্যবসায়ী জামিল চৌধুরী জীবনে খুব কম মানুষকেই নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজে, সম্পর্ক টিকিয়েছেন নিজের নিয়মে, মানুষকে বিচার করেছেন নিজের সুবিধামতো। অথচ আজ এক তরুণীর কয়েক মুহূর্তের দৃষ্টি আপনার ভেতরে এমন একটি আলোড়ন তুলেছে, যার কোনো হিসাব আপনি মিলাতে পারছেন না।
আপনি নিজেকে বোঝালেন—এ স্বাভাবিক। পুরুষ-নারীর আকর্ষণের মধ্যে এমন দুর্বলতা থাকতেই পারে। কিন্তু নিজের এই ব্যাখ্যাটা দিতে গিয়েই কোথাও যেন অস্বস্তি হলো আপনার।
আপনি কি সত্যিই শুধু আকর্ষণের কারণেই অস্থির?
নাকি তার অসহায়ত্ব আপনাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আপনার ক্ষমতা আর তার প্রয়োজন মুখোমুখি হয়েছে?
আপনি উত্তর খুঁজলেন না।
বরং অন্য একটি সহজ উত্তর বেছে নিলেন।
আপনার মনে হলো, বিনিতার মতো একজন তরুণীকে আপনি চাইলে নিজের জীবনের অংশ করে নিতে পারেন। আপনার অর্থ আছে, সামাজিক অবস্থান আছে, প্রভাব আছে। আপনি বহুবার দেখেছেন—মানুষের প্রয়োজন যত বড়, তার সিদ্ধান্ত তত সহজে বদলে যায়।
এই ভাবনাটা আপনাকে আনন্দ দিল।
কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন আরেকটি মুখ এসে দাঁড়াল আপনার সামনে।
মণিকা।
আপনি হঠাৎ থেমে গেলেন।
মণিকার কথা মনে পড়তেই নিজের অতীতটাকে নতুন করে দেখতে ইচ্ছে হলো। এতদিন আপনি যে গল্পটি নিজের কাছে বলে এসেছেন, সেটি কি পুরো সত্যি?
মণিকা ছিল আপনার অফিসের কর্মী। বুদ্ধিমতী, সুন্দরী, কর্মঠ। তার সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা প্রথমে ছিল কাজের সূত্রে। তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক বদলেছিল। আপনি তাকে ভালোবেসেছিলেন—এ কথাও বহুবার নিজের কাছে বলেছেন।
কিন্তু ভালোবাসা কি ছিল?
এই প্রশ্নটি আপনি নিজেকেই করলেন।
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেলেন।
কারণ আপনার স্মৃতিতে ভালোবাসার চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল মালিকানার অনুভূতি। আপনি যেন ভাবতেন, মণিকা আপনার জীবনে থাকবে—কারণ আপনি তাকে চেয়েছেন।
আপনি তাকে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করেই সে আপনাকে বিশ্বাস করেছিল। পরে আপনাদের বিয়ে হয়েছিল।
সেই সময় আপনি মনে করেছিলেন, জীবনের একটি অধ্যায় সম্পূর্ণ হলো।
কিন্তু কিছুদিন পরেই কেন যেন সেই পূর্ণতার ভেতরে ফাঁক তৈরি হতে লাগল।
আপনার আগ্রহ কমল।
আপনার চোখ অন্যদিকে ঘুরল।
আর তখন থেকেই আপনার স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকল।
আপনি অবশ্য নিজের কাছে তারও একটি ব্যাখ্যা তৈরি করেছিলেন।
আপনি বলেছিলেন—মানুষের মন বদলায়।
কেউ কারও চিরকাল থাকে না।
কেউ কাউকে ছেড়ে গেলে তার মানে এই নয় যে সেই মানুষটি দোষী।
কিন্তু আজ, এত বছর পর, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার মনে হলো—এসব কি সত্যিই ব্যাখ্যা ছিল, নাকি নিজের অপরাধবোধকে একটু একটু করে ঘুম পাড়ানোর উপায়?
আপনি উত্তর দিলেন না।
বরং স্ত্রীর ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
পাঁচ বছর প্রেমের পর বাবা-মায়ের অমতে তাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের তিন বছর পর সে আপনার জীবন থেকে চলে গেল। আপনি এতদিন ধরে বলে এসেছেন—সে আপনাকে প্রতারণা করেছে।
কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হলো, গল্পটা এত সহজ নাও হতে পারে।
ঘরে ঢুকেই আপনার চোখ গেল দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিটির দিকে।
আপনার স্ত্রীর ছবি।
আপনি কাছে গেলেন।
তারপর আয়নায় চোখ পড়ল।
কী আশ্চর্য!
কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের প্রতিবিম্বটা দেখতে পারলেন না আপনি। যেন কাঁচের ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মুখটি স্পষ্ট নয়। ধোঁয়াশার মধ্যে একটা চেহারা। পরিচিত অথচ অচেনা।
আপনি দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
আবার ছবিটির দিকে তাকালেন।
আর তখনই অদ্ভুত একটি অনুভূতি হলো।
ছবির মুখটি যেন মণিকার মুখের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
আপনি চোখ কচলালেন।
না। আপনি ভুল দেখেছেন।
কিন্তু কেন ভুল দেখলেন?
মণিকা কি শুধু মণিকাই ছিল? আপনার স্মৃতির ভেতরে কি তার সঙ্গে আরও কিছু জড়িয়ে আছে?
হঠাৎ বিনিতার মুখ মনে পড়ল।
আপনি চেয়ার টেনে বসলেন।
একটি প্রশ্ন আপনার ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল—
বিনিতা কি শুধু আপনার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছিল? নাকি তার চোখে আপনি এমন কিছু পড়েছেন, যা আসলে আপনার নিজের মনই সেখানে দেখতে চেয়েছিল?
আপনি নিশ্চিত হতে পারলেন না।
আপনার মাথায় আবার সেই রাতের দৃশ্য ফিরে এল। বিনিতা পার্স থেকে টাকা বের করেছিল। পাঁচ মাসের পুরো ভাড়া দিতে পারেনি। লজ্জায় মাথা নিচু করে বলেছিল, একটু সময় দিতে।
আপনি টাকা নেননি।
কেন নেননি?
মানবিকতার জন্য? নাকি আপনি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন যে, এই সম্পর্কটির অন্য কোনো সম্ভাবনা আছে?
আপনি নিজেকে মহৎ মানুষ ভাবতে চাইলেন। কিন্তু মন সায় দিল না। আপনি ঘরময় হাঁটতে লাগলেন।
বয়স হয়েছে আপনার। এই সত্যটি আপনি এতদিন নিজের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। অর্থ, ক্ষমতা, সামাজিক পরিচয়—এসবের আড়ালে বয়সটাকে খুব সহজেই ভুলে থাকা যায়। কিন্তু একা ঘরে ফিরে বয়সের সঙ্গে লুকোচুরি চলে না।
বিনিতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গিয়ে হঠাৎ সমাজের কথা মনে হলো। মানুষ কী বলবে? বন্ধুদের কী প্রতিক্রিয়া হবে? নিজের কাছেই বা কী বলবেন?
পরক্ষণেই আবার অহংকার মাথা তুলল।
আপনার টাকা আছে।
আপনার প্রভাব আছে।
আপনি অভ্যস্ত—মানুষকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে।
তাহলে বিনিতা কেন ব্যতিক্রম হবে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে উঠল—
মানুষকে পাওয়া আর মানুষকে আপন করে পাওয়া কি এক কথা?
আপনি থেমে গেলেন।
কণ্ঠটি কোথা থেকে এল, বুঝলেন না।
স্ত্রী চলে যাওয়ার পর বন্ধুদের আড্ডায় আপনার শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও ফিসফাস হয়েছে। কেউ কেউ সরাসরি প্রশ্নও তুলেছিল। আপনি সবসময়ই জানতেন, তাদের ধারণা ভুল।
কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হলো, স্ত্রীর চলে যাওয়ার আসল কারণ কি?
আপনি কি তাকে যথেষ্ট সময় দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ।
আপনি কি তাকে আরাম-আয়েশ দিয়েছিলেন?
তার চেয়েও বেশি।
তাহলে?
হয়তো মানুষকে আরাম দেওয়া আর তাকে বোঝা এক জিনিস নয়।
হয়তো আপনি তাকে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু তাকে নিজের সম্পত্তি ভেবেছিলেন।
হয়তো সে আপনার কাছ থেকে আরও কিছু চেয়েছিল—যার ভাষা আপনি কখনো শেখেননি।
এই ভাবনাগুলো আপনার মাথা ভারী করে দিল।
আপনি আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
এবার নিজের চোখের দিকে তাকাতে চাইলেন।
পারলেন না।
আপনার মনে হলো, আয়নায় আপনি যে মানুষটিকে দেখছেন, সে আপনার পরিচিত জামিল চৌধুরী নয়। সে যেন এমন একজন মানুষ, যে অনেকদিন ধরে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি সত্যের পাশে একটি করে মিথ্যা লিখে রেখেছে।
আপনি ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিলেন।
মনে হলো, আপনার গন্তব্য অনেক দূর নয়।
কিন্তু সেই গন্তব্য কোথায়—তা আপনি জানেন না।
শুধু এটুকু বুঝলেন—
নিজেকে হারানোর পর মানুষ অন্য কাউকে হারানোর অভিযোগ করতে পারে না।
চলবে



0 মন্তব্যসমূহ