ধারাবাহিক উপন্যাস-৪: আয়নায় দেখা পাপেট


নাসির আহমেদ কাবুল 

।। চতুর্থ পর্ব ।।

সকালে ঘুম ভাঙার পর কয়েক মুহূর্ত আপনি বুঝতেই পারলেন না, আপনি কোথায় আছেন। ঘরটি পরিচিত। পর্দার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো ঢুকছে। দূরে গাড়ির শব্দ। পাশের ভবনে কারও জানালা খোলার শব্দও শোনা যাচ্ছে। সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু আপনার ভেতরটা স্বাভাবিক নয়।

গত রাতের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়তে লাগল।

বিনিতা। তার চোখ। স্ত্রীর ঘর। আয়না। আর মণিকা।

মণিকার কথা মনে পড়তেই আপনার বুকের ভেতর হালকা একটা অস্বস্তি হলো। কেন এত বছর পর হঠাৎ মণিকার কথা মনে পড়ছে?

আপনি বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেলেন।

শহর তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। রাস্তায় মানুষের ভিড়। গাড়ি ছুটছে। সবাই কোথাও যাচ্ছে। শুধু আপনি কোথাও যাচ্ছেন না।

আপনার কাছে অর্থ আছে, সময় আছে, গাড়ি আছে, বাড়ি আছে—তবু মনে হলো, আপনি যেন বহুদিন ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।

নাশতা করতে বসেও মন বসল না।

ঠিক তখন আপনার ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। আপনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফোন ধরলেন।

—হ্যালো?

ওপাশে কোনো কথা নেই।

আপনি আবার বললেন,


—হ্যালো? কে বলছেন?

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ।

শান্ত।

খুব স্বাভাবিক।

—জামিল সাহেব, আপনি কি এখনও মনে করেন আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল?

আপনার হাত থেমে গেল।

কণ্ঠটি অপরিচিত। কিন্তু প্রশ্নটি নয়। এ প্রশ্ন আপনি নিজেকে বহুবার করেছেন।

আপনি গলা শক্ত করে বললেন,

—আপনি কে?

ওপাশে সামান্য হাসির শব্দ।

—আমাকে চেনার কথা নয় আপনার।

—তাহলে আমার স্ত্রী সম্পর্কে কথা বলছেন কেন?

—কারণ আপনার স্ত্রী সম্পর্কে আপনি যা জানেন, তার সবটা সত্যি নয়।

আপনার বুকের ভেতর হঠাৎ ধক করে উঠল।

—আপনি কী বলতে চাইছেন?

ওপাশে আবার নীরবতা।

তারপর লোকটি ধীরে বলল,

—মণিকার কথা মনে আছে?

আপনি আর কথা বলতে পারলেন না।


কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

—মণিকার সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?

ওপাশের মানুষটি উত্তর দিল না। শুধু বলল,

—আপনি গল্পের যে অংশটা এতদিন সবাইকে বলেছেন, সেটা আপনার সুবিধার গল্প।

আপনার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—আপনি আমার সম্পর্কে কী জানেন?

—আপনার সম্পর্কে?

লোকটি ধীরে হাসল।

—আপনি নিজের সম্পর্কে যতটা জানেন, তার চেয়ে একটু বেশি।

লাইনটি কেটে গেল। আপনি ফোনটা কানের কাছে নিয়েই বসে রইলেন। ঘরটা হঠাৎ অদ্ভুত নিঃশব্দ মনে হলো। আপনি সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে কল ব্যাক করলেন।

বন্ধ।

আবার করলেন।

বন্ধ।

কিছুক্ষণ পর ফোনটা টেবিলে রেখে দিলেন আপনি। তারপর খুব ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। আপনি জানেন না লোকটি কে। কিন্তু একটি বিষয় আপনি বুঝে গেছেন—

কেউ একজন আপনার অতীতের দরজা খুলে ফেলেছে। এবং সেই মানুষটি জানে—আপনি কোন দরজাটি এত বছর ধরে বন্ধ করে রেখেছেন।

আপনার চোখের সামনে হঠাৎ গত রাতের আয়নাটা ভেসে উঠল। 

আপনি জানেন না কেন, কিন্তু মনে হলো—আয়নায় যে মুখটিকে আপনি দেখতে চাননি, সে-ই হয়তো আপনাকে সবচেয়ে ভালো করে চেনে।

আপনি আবার ফোনটি হাতে নিলেন। মণিকার নাম খুঁজতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর থেমে গেলেন। তারপর বহু বছর পর প্রথমবার আপনি নিজের অফিসের পুরোনো নথিপত্র খুঁজতে বসে গেলেন। কারণ আপনার মনে হতে লাগল—মণিকা আপনার জীবনের গল্প থেকে হারিয়ে যায়নি। আপনি শুধু তাকে হারিয়ে ফেলেছেন বলে ভেবেছিলেন। আর হয়তো, কোনো এক জায়গায়, সে এখনও আপনার গল্পের অপেক্ষায় আছে।

চলবে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ