ধারাবাহিক উপন্যাস: আয়নায় দেখা পাপেট


নাসির আহমেদ কাবুল 

দ্বিতীয় পর্ব


বিনিতা সোফায় বসল। আপনি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটি চোখ নামিয়ে রেখেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। এত কাছে থেকে তাকে দেখে আপনার মনে হলো, মানুষকে দূর থেকে যতটা চেনা যায়, কাছে এলে সে ততটাই অচেনা হয়ে ওঠে।

আপনি গ্লাসটা টেবিলে রাখলেন।

—কী হয়েছে?

বিনিতা প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। তারপর ধীরে বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি।’

—বলো।

—চার মাসের ভাড়া দিতে পারিনি। আপনি নিশ্চয়ই রাগ করেছেন।

আপনার মনে হলো, একজন পুরুষের বাসায় একজন তরুণী রাতের বেলা এসেছে। সে কি সত্যিই শুধু ভাড়ার কথা বলতে এসেছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রয়োজন আছে?

এই সন্দেহের বীজ বোধ হয় আপনার মনে অনেক আগেই বপন করে গেছে আপনার চলে যাওয়া স্ত্রী মণিকা। এখন আপনি প্রায় সব সম্পর্কের ভেতরেই কোনো না কোনো হিসাব খুঁজে পান। মণিকা চলে যাওয়ার আগে তাকে আপনি খুব সহজ-সরল মানুষ ভাবতেন। পরে মনে হয়েছে, মানুষকে চেনা এত সহজ নয়। সবচেয়ে পরিচিত মানুষটিকেও একদিন অচেনা মনে হতে পারে।

—ভাড়ার জন্য এত রাতে আসতে হয়?

বিনিতা চুপ করে রইল।

আপনি এবার একটু সোজা হয়ে বসলেন। নেশা তখনও মাথায়, কিন্তু তার কথাগুলো আপনার ভেতরে অন্যরকম এক সচেতনতা তৈরি করেছে।

—তোমার স্বামী মারা গেছে, তাই না?

বিনিতা মাথা নিচু করল।

—জি।

—কীভাবে?

—বিমান দুর্ঘটনায়।

আপনি জানতেন না। অন্তত এত বিস্তারিত জানতেন না। আশ্চর্য লাগল আপনার। একই বাড়িতে মানুষ বাস করে, অথচ তার জীবনে কী ঝড় বয়ে যায়, পাশের দরজার মানুষটি তার কিছুই জানতে পারে না।

—তোমার একটা বাচ্চা আছে না?

—জি। দুবছর।

আপনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

হঠাৎ আপনার মনে হলো, এই মেয়েটি আপনার সামনে শুধু একজন সুন্দরী নারী হয়ে বসে নেই। সে একজন বিধবা, একজন মা, একজন অসহায় মানুষ। আর আপনি কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রচুর অর্থ আছে আপনার। সামাজিক অবস্থান আছে, সম্মান আছে। আর মেয়েটির কাছে আপনি একজন বাড়িওয়ালা—যার হাতে তার মাথার ওপরের ছাদটি টিকে থাকার ক্ষমতাও আছে।

এই উপলব্ধিটা আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলল। আপনি বললেন, ‘ভাড়ার জন্য তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।

বিনিতা মাথা তুলল। —কিন্তু...

—যতদিন তোমার সমস্যা আছে, ভাড়া দিতে হবে না।

মেয়েটির চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ সত্যি।

কথাটা বলার পর আপনার নিজের কাছেই নিজেকে ভালো মানুষ বলে মনে হলো। কিন্তু সেই ভালো লাগাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

পরক্ষণেই অন্য একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়াল আপনার সামনে। আপনি তাকে কেন সাহায্য করছেন?  অসহায়ত্বের জন্য? নাকি তার প্রতি আপনার আকর্ষণের জন্য? আপনি নিজের মনকে প্রশ্ন করলেন। উত্তর এল না।

সেদিন প্রথমবার আপনার মনে হলো—মানুষ নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে।

বিনিতা উঠে দাঁড়াল। ‘তাহলে আমি যাই।’

আপনি বললেন, ‘এত রাতে একা যাবে?’

—আমার বাসা তো নিচেই।

—ওঃ..

আপনি কথাটা শেষ করলেন না। বিনিতা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।

—আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনি কিছু বললেন না। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটা আবার নিঃশব্দ। আপনি গ্লাস হাতে নিলেন। কিন্তু আর পান করতে ইচ্ছে হলো না। গ্লাসটি টেবিলেই রেখে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।

নিচে কয়েকটি জানালায় আলো জ্বলছে। কোথাও টেলিভিশনের শব্দ, কোথাও শিশুর কান্না, কোথাও মানুষের হাসি।

আপনার মনে হলো, এই শহরের প্রতিটি জানালার ভেতরে আলাদা আলাদা গল্প আছে। কেউ সুখী হওয়ার অভিনয় করছে, কেউ দুঃখ লুকাচ্ছে, কেউ ভালোবাসার কথা বলছে, অথচ মনে অন্য কিছু বয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে, কেউ বিশ্বাসঘাতকতার ভয় নিয়ে বেঁচে আছে।

আর আপনি? আপনি নিজের কাছেই নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছেন। হঠাৎ মনে হলো, বিনিতা চলে যাওয়ার সময় যে চোখে তাকিয়েছিল, সেই চোখে কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি আরেকটি কিছু ছিল। কিন্তু কী?

ভয়? নাকি প্রত্যাশা?

আপনি নিশ্চিত হতে পারলেন না। তবে সেদিন রাতে প্রথমবার আপনার মনে হলো—বিনিতার জীবনে আপনি শুধু বাড়িওয়ালা হয়ে থাকবেন না। কীভাবে, কেন—তা আপনি জানেন না। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য জায়গায় যেন গল্পটির আরেকটি দরজা খুলে গেছে। আর সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন, যার নাম আপনি এখনো জানেন না। আপনি শুধু এটুকু জানেন—

সে আপনাকে চেনে।

খুব ভালো করেই চেনে।

আর আপনার নিজের সম্পর্কে আপনি যতটা জানেন, তার চেয়েও বেশি কিছু সে জানে।

সেদিন রাতে অনেক বছর পর আপনি মদ না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু ঘুমের আগে শেষ যে কথাটি আপনার মনে এলো, সেটি ছিল—

‘আমি কি সত্যিই ভালো মানুষ?’

চলবেে


ইউটিউবে শুনুন





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ