ধারাবাহিক উপন্যাস:আয়নায় দেখা পাপেট








নাসির আহমেদ কাবুল

 পর্ব ১

গোধূলি বেলা। পশ্চিম আকাশে স্থির হয়ে আছে সিঁদুওে কিছু মেঘ। আপনি বসে আছেন ব্যালকনিতে। ইজিচেয়ারে বসে পুরানো দিনের কথা মনে পড়ছে আপনার। চোখ বুজে কত কী ভাবছেন। কিন্তু কোনো ভাবনায়ই ঠিক মন বসাতে পারলেন না। অনেকগুলো পরিচিত মুখ মনের জানালায় ভেসে উঠছে। মিলিয়ে যাচ্ছে আবার কোন সুদূরে। শত্রু-মিত্র-প্রিয়জন কতজনই তো মনের জানালায় ফিরে ফিরে আসে,  আবার মিলিয়েও যায়; ইচ্ছে করেও কাউকেই ধরে রাখা যায় না। হঠাৎ আপনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং চকিতে মনে হলো দীর্ঘশ্বাস কেন? বুঝতে পারলেন না।

আমরা প্রতিদিন কত কী যে করি, তার ঠিক অর্থ জানি না।  আজ এই বিষণ্ণবেলায় আপনার অবস্থাও ঠিক তেমনি। আপনি নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে না। হয়তো দীর্ঘশ্বাসটা ঠিক সে কারণেই।

আপনার বিশাল একটি ফ্ল্যাটে আাপনি একা, অনেক বছর। আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আপনি খুব একা হয়ে পড়েছেন। একা থাকতে থাকতে আপনি হাঁপিয়ে  উঠেছেন। বন্ধুরা বলেছে আবার বিয়ে করার জন্য। আপনিও ওরকমই ভাবছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সিদ্ধান্ত নিতে আপনি খুব সাতপাঁচ ভাবেন।  দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা ভাবতে ভাবতে বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। আপনার বয়স এখন পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। এই বয়সে আপনি আর আপনার মতো মেয়ে পাবেন বলে মনে করেন না।

প্রেম করে বিয়ে করে ভেবেছিলেন স্ত্রীকে ভালোবাসা ও স্বচ্ছলতা দিয়ে আটকে রাখতে পারবেন। কিন্তু পারেননি। সে আপনার অফিসে তারই কলিগ একজনের হাত ধরে চলে গেছে।  এরপর আপনি আর কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এখন আপনি মেয়েদের খেলনাসামগ্রী ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না। মন বিষিয়ে উঠেছে আপনার। এই বিষাক্ত মনে সুন্দর কিছু আশা করছেন না আপনি। সুতরাং যেমন আছে, তেমনই চলে যাবে—এই ভেবে আপনি প্রায় মোটামুটি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু আপনি সেখানেও মন বসাতে পারছেন না।

আপনার কেউ নেই—বাবা-মা ভাইবোন, কেউই নেই। আপনি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবার সম্পত্তির সবটাই পেয়েছেন। বাবার ব্যাবসা, ব্যাংক ব্যালেন্স সবই এখন আপনার। বিপুল অর্থ আপনার, সম্মান ও প্রতিপত্তিও। একটা জীবন বসে বসে খেলেও শেষ  হবে না। টাকার অভাব হয় না আপনার। আপনার অভাব ভালোবাসার। সেটা আপনি এ জীবনে আর পাবেন বলে মনে করেন না।

বন্ধু বলতে কয়েকজন বিজনেস পার্টনার আছে। তাদের সঙ্গে ক্লাবে বা নিজের ড্রইংরুমে আড্ডা দিয়ে কিছুটা সময় কাটে আপনার। বন্ধুরা লাভক্ষতির হিসাব করে। আপনি এখন আর ওমনটা হিসাব করেন না। আপনার বেশ কয়েকটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর লজ্জায় নিজের প্রতিষ্ঠানেও যেতে পারেন না এখন। আপনার ইন্ডেটিং ফার্মে  বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। আপনার একজন পার্সোনাল সেক্রেটারি আছে, বেশ সুন্দরী-স্মার্ট। তাকে নিয়ে মনে মনে এটাসেটা ভাবতেন, বিদেশ কাটাতেন। তাকে সন্দেহ করত আপনার স্ত্রী। অথচ সন্দেহ করার কোনো কারণ হয়নি কখনোই। আপনি নিজেকে আদর্শবান, সৎচরিত্রবান ভাবতেন। এখন ভাবছেন  আপনি ভুল করেছেন। আপনি মনে করেন আপনার স্ত্রী আপনাকে ঠেলে পংকিলতার পাপসমুদ্রে পাঠিয়ে দিয়েছে। তবে এখনো আপনার চরিত্র এতটুকু কাদা লাগেনি। লাগবে যে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই আপনার।

ব্যাবসায়ী বন্ধুরা বাসায় এলেই ড্রিংক করেন আপনিও।  ফ্রিজে হরেকরকম বিদেশী মদ আছে। সন্ধ্যার পর ওগুলোই আপনার আপন। সন্ধ্যা কাটিয়ে রাত হলে দুএক পেগ পেটে না পড়লে আপনার সময় কাটে না। বন্ধুরা কেউ না এলেও রাম কিংবা ভদকা গিলে ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে রক সংগীত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন আপনি। এভাবেই রাত কেটে যায় আপনার।

আপনার চারপাশে মেয়েদের অভাব নেই। তরুণী থেকে মধ্যবয়স্কা মহিলারা আপনার প্রেমপ্রত্যাশী—কারণ আপনার টাকা আছে। কিন্তু আপনার মন পড়ে থাকে এমন একটি মেয়ের প্রতি যা আপনি নিজেও কল্পনা করতে পারেন না। কারণ মেয়েটির বয়স খুবই কম। আপনার প্রাক্তন স্ত্রী মণিকা ও আপনার পার্সোনাল সেক্রেটারি তুলির চেয়েও সুন্দরী সে। বয়স বিশ একুশ। ওর নাম বিনিতা। সে আপনার বাড়ির একটি ফ্লাটে স্বামীর সঙ্গে থাকত। কিন্তু হঠাৎ প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে বিনিতার স্বামী মারা যায়। এরপর খুব অসহায় হয়ে পড়ে মেয়েটি। দুবছরের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তার  কোথাও যাবার জায়গা নেই। এতসব খবর আপনার জানার কথা নয়। ভাড়াটিয়াদের নিয়ে এতটা সময় নষ্ট করার সময়ও আপনার হাতে নেই। তবে মাস ছয় হয়ে গেল ভাড়াটিয়া কোনো ভাড়া দিচ্ছে না। আপনি ভাবছেন, হয়তো সমস্যায় আছে। সমস্যা কেটে গেলেই ভাড়া মিটিয়ে  দেবে।

একদিন রাতে, আপনি তখন ভদকায় মেশায় প্রায় বুঁদ হয়ে আছেন। আপনার দরজার কলিং বেল বেজে  ওঠলে আপনি বিরক্ত না হয়ে ভাবলেন এই সময় কেউ এলে গল্প করা যেত। দরজা খুলে দিলেন আপনি। দেখলেন বিনিতা দাঁড়িয়ে আছে। বিনিতাকে এর আগেও কয়েকবার দেখেছেন, তাই চিনতে কষ্ট হয়নি আপনার। এর কারণ বিনিতার রূপযৌবনে আপনি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক আগেই। কিন্তু আপনি নিজেকে শাসন করেছেন। আপনি এখন ভাবছেন হয়তো এই শাসন আর বেশিদিন খাটাতে পারবেন না নিজের ওপর।

দরজা খুলে দিয়ে আপনি বললেন, ভিতরে এসো।

বিনিতা ঠিক বুঝতে পারল না কী করবে। ভিতরে আসবে, না কি আসবে না। কিন্তু আপনি বাড়িওয়ালা বড়োলোক, সম্মানিত ব্যক্তি। আপনাকে নাও করা যায় না। তাই ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করল বিনিতা।  আপনি সোফা দেখিয়ে বললেন, বসো। আপনার চোখ তখন নেশাতুর। বিনিতার অদ্ভুত সৌন্দর্য আপনার নেশাকে আরো রঙিন করে তুলেছে।

চলবে

ইউটিউকে  ‍শুনুন আয়নায় দেখা পাপেট



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ