Header Ads Widget

পৃথিবীর পথে পথে


বই : পৃথিবীর পথে পথে
লেখক : হুসনুন নাহার নার্গিস
ধরন : ভ্রমণকাহিনী
মূল্য : ৪০০ টাকা ২৫% কমিশনে ৩০০ টাকা, কুরিয়ার ফি ফ্রি
অর্ডার করুন : ০১৮১৭১২৭৮০৭

একটুখানি পড়ে  দেখুন


পম্পেই : ভিসুভিয়াসের ধ্বংসযজ্ঞে মাটির নিচে চাপাপড়া এক শহর

১৯১২ সাল। আমাদের গন্তব্য ইটালির পম্পেই। লন্ডন থেকে ইটালি বেশি দূরে নয়। মাত্র তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। আমরা উৎফুল্ল মনে প্লেনে চেপে বসলাম। ইটালির নেপলেস ছিল আমাদের ল্যান্ডিং এরিয়া। আগে থেকেই একটা ‘ভিলা’ রিজার্ভ করা ছিল; যা মেডিটেরিয়ান সমুদ্রের একেবারে কাছে। ভিলার এক জানালা দিয়ে সমুদ্র আর এক জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের দেয়াল। সমুদ্রের পানি ঘন নীল। আমরা হোটেলের ম্যানেজারকে জানালাম আমরা কী-কী দেখতে চাই। ম্যানেজার সবকিছু অ্যারেঞ্জ করে দিলেন। পরের দিন সকালে একজন গাইড তার কোচে করে আমাদের নিয়ে যাবে। ব্রেকফাস্টের পর আমাদের গাইড নেপলেসের হোটেল থেকে অন্যান্য ট্যুরিস্টদের তুলে নিয়ে চলল পম্পেইর উদ্দেশে। গাইড ইটালিয়ান। তিনি ইংলিশ স্পিকিংয়ে দক্ষ এবং নিজ পেশায় খুবই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হাসিখুশি একজন মানুষ। সে আমাদের দুপাশের দৃশ্য দেখিয়ে যেতে যেতে সেসবের নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে এগিয়ে চললেন। কীভাবে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতের ট্যুরিস্টকে একত্রে আনা যায় এবং তাদের খুব কাছে টানা যায়, সে ব্যাপারে গাইড ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ। পম্পেইর ইতিহাস এবং ভিসুভিয়াসের উদগীরণ সম্বন্ধে তার ছিল যথেষ্ট জ্ঞান। 
আমাদের বিরাট ট্যুরিস্ট দলটিকে সে সবকিছু ভালোভাবে তো দেখালোই এবং চমৎকারভাবে বর্ণনাও দিলো। এতে আমরা সবাই অভিভূত হলাম। আমরা ঠিক সময়ে এসে পৌঁছলাম পম্পেই শহরে; যা কি না ঢাকা পড়েছিল শত শত বছর ধরে মাটির নীচে। আর সেই মাটি বা ছাই উদগীরণ হয়েছিল মাউন্ট ভিসুভিয়াস থেকে। আমরা গাইডকে ফলো করতে করতে দেখতে লাগলাম আর সেই ভয়াল আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের পরিণতি অনুধাবন করতে লাগলাম। 
১৭০০ সালের দিকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে পড়া এই গ্রীসিও রোমান শহরটি মানুষ আবিষ্কার করে। এখানে প্রায় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার লোক বাস করত। পুরো শহরটি প্রায় ২৩ ফিট পর্যন্ত ছাই, লাভা আর ডেবরি দিয়ে ঢাকা পড়েছিল। 
পম্পেই
পম্পেই ইটালির একটি প্রাচীন শহর, যা কি না প্রিজার্ভ হয়ে আছে মাউন্ট ভিসুভিয়াস থেকে উৎক্ষিপ্ত ভস্ম, গলিত লাভা, পাথর আর পাথরের গুঁড়ো দিয়ে গভীর মাটির নিচে ঢাকা পড়া এক সিটি। শত শত বছরে ধরে পম্পেই এভাবেই ছিল। এটা নেপলেস থেকে দক্ষিণে ১৪ মাইল দূরত্বে। 
৭৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্টের ২৪ তারিখ দুপুর। চারদিকে মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত। কেউ বুঝতেই পারেনি কী ভয়াবহ পরিণতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে বিরাট এক ভলকানোর আগুন, কালো ধোঁয়া, গ্যাস, ডেবরি পাথর, ছাই আর গলিত লাভা বের হতে লাগল, তাও আবার বিরাট আকারে। চারদিক অন্ধকারে ডুবে গেল। কিছু মানুষ এর থেকে জীবন বাঁচাতে সমুদ্রের দিকে ছুটল, কিছু ঘরের মধ্যেই আশ্রয় নিলো। কিন্তু যে যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে মারা গেল। একদল মানুষ একেবারে সমুদ্রের কাছে সমুদ্র পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। সেখানে কোনো লাভা না গেলেও তারা মারা পড়ে বিষাক্ত গ্যাস আর ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে। 
সমস্ত ঘর বাড়ির ছাদ ভেঙ্গে পড়েছিল। পুরো শহর ছাই দ্বারা ঢাকা পড়ে যায়। ছাই আর ডেবরির পরিমাণ ২৫ মিটার পর্যন্ত গভীর ছিল। 
শতাব্দীর পর শতাব্দী এগুলো মাটির তলেই পড়ে থাকে এবং মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ১৭০০ সালে এই গ্রীসিও রোমান সিটিটি মানুষ আবিষ্কার করে; যা ছিল মাটির অনেক নিচে। এখানে আবিষ্কৃত হয় পাবলিক বিল্ডিং, ধনী মানুষের ভিলা, এমফি থিয়েটার, বাজার, রেস্টুরেন্ট, রাস্তা, পাবলিক বাথ আর সারি সারি মানুষের মৃতদেহ; যা কি না মানুষের আকারে সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে আছে। কেউ বসা, কেউ বাচ্চা কোলে, কেউ হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থায়—যে যেখানে যেমন অবস্থায় ছিল, তেমন অবস্থায় মারা পড়েছে। 
ভিসুভিয়াসের উদগীরণের শিকার একজন হতভাগ্য
পম্পেই সার্ন নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি শহর। পম্পেইর কাছাকাছি আরও কিছু শহর যেমন হেরাকুলানিয়াম, স্তাবিরাক, টরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৯৭ সালে পম্পেই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত হয়। আমরা ভাঙ্গা ঘরবাড়িগুলো দেখতে দেখতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে অগ্রসর হচ্ছিলাম। এসব কিছু দেখার পর এটাই মনে হলো এই পৃথিবীর মানুষ প্রকৃতির কাছে খুব অসহায়!
মাউন্ট ভিসুভিয়াস
পম্পেই দেখার পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল মাউন্ট ভিসুভিয়াস। কোচে উঠে পড়লাম আর কিছু দূর যাওয়ার পর আমরা এসে গেলাম সেই ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরির কাছে; যা নেপলেসের কাছাকাছি। যা কি না জীবন্ত এবং প্রায় প্রতি বছর একবার করে উদ্গিরণ হয়। খুব ভয়ঙ্করভাবে অগ্ন্যুৎপাত হয় মাঝে মাঝে। যেতে যেতে কিছুদিন আগে বের হওয়া লাভার প্রবাহ দেখতে পেলাম। যা কালো ও শক্ত হয়ে গিয়েছে। উপর দিয়ে লাভা প্রবাহের ঢেউ খেলানো দৃশ্য এখনো রয়ে গেছে। এত বেশি শক্ত লাভা যে, তাতে গাছপালা জন্মাতে পারে না। আমরা হেঁটে এগুতে থাকলাম উপরের দিকে জ্বালামুখের দিকে। এখানে পায়ে হঁাঁটা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিছু দূর যাওয়ার পর একটা ঘাসও চোখে পড়ল না। শুধু কালো ছাই আর কয়লার গুঁড়োর মতো ডাস্ট। হাইকিং করতে করতে আমরা উঠতেই আছি উপরে। পুরো মাউনটেনের উচ্চতা ১ হাজার ২৮১ মিটার। তবে যতবার অগ্ন্যুৎপাত হয় ততবার এর উচ্চতা এদিক-ওদিক হয়। প্রায় ২/৩ মাইল হঁাঁটার পর আমরা একেবারে জ্বালামুখের কাছে এসে পড়লাম। সে এক ভয়ঙ্কর অনুভূতি। কারণ তখনো সেখান দিয়ে ক্রমাগত ধোঁয়া বের হচ্ছে। এটা একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আর যেখান দিয়ে আগুন, লাভা, আর ডেবরি বের হতে পারে যখন তখন। উদ্গিরণকালে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে হাজার হাজার টন লাভা আর ডেবরি বের করে। আর যে কি না একটা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল!
মাউন্ট ভিসুবিয়াসের ধোঁয়া নির্মগমণ
মাথা বাড়িয়ে জ্বালামুখের ভিতরটা দেখছিলাম চারদিকে ঘুরে ঘুরে। সে সময় ভয় লাগছিল খুব—এই বুঝি শুরু হবে প্রলয়ঙ্করী উদ্গিরণ। তবে বর্তমানে আধুনিক টেকনোলজির মাধ্যমে আগাম বার্তা দিয়ে মানুষকে সচেতন করা হয়। আমরা দেখলাম সেই টেকনোলজির কারবার। অর্থাৎ বিশাল বিশাল মেশিন বসানো আছে আর সেগুলো একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের কাজ কেমন অবস্থায় আছে এর উদ্গিরণের অবস্থা বা কখন তা বেরিয়ে আসতে পারে তা আগাম জানা। 
অনেক ট্যুরিস্ট সেখানে ভিড় করে দেখছিল। আমরা অনেক ছবি তুললাম। তারপর নামার পালা। সেই ছাই আর ডেবরির পথ বেয়ে বেয়ে নিচে নামতে থাকলাম। 
৭৯ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে ১০৩৭ সাল পর্যন্ত আরও অনেকবার অগ্ন্যুৎপাত হয়। সেগুলো ২০৩, ৫১২, ৬৮৫, ৭৮৭, ৯৬৮, ৯৯১, ৯৯৯ এবং ১০০৭ সালে। ৫১২ সালের উদ্গিরণ খুব বড়ো ছিল। ১৬৩১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ভূমিকম্প এবং অগ্ন্যুৎপাত একসঙ্গে হয় এবং এর লাভা গড়িয়ে সমুদ্র পর্যন্ত যায়। তখন ৩ হাজার মানুষ মারা যায়। 



 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ