সাংস্কৃতিক ঐহিত্যে অনন্য বাংলা সন

 শীলা প্রামাণিক 


বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ বাঙালি জাতির নিজস্ব সময় গণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি, যা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাংলা সালের প্রবর্তননের পর কালের প্রবাহে আমরা অতিক্রম করছি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, ১৪৪৮ হিজরি। প্রবতনের পর শত শত বছরের  ঐতিহ্যে বাংলা সন বঙ্গাব্দ আজ সমহিমায় প্রতিষ্ঠিত।

ছর আসে বছর চলে যায়। আসে নতুন দিন। বৈশাখ আসে নতুন বার্তা নিয়ে। কিন্তু নতুন দিন মানে তো কেবল স্বতন্ত্র একটি দিন নয়। যে বছরটি শেষ হয়ে যায়, মিলিয়ে যায় পশ্চিম দিগন্তের অস্তবেলায় তা আমাদের অস্তিত্ব থেকে কোনোদিনই হারিয়ে যায় না। আমাদের অতীতের মধ্যে ওই দিনগুলো সঞ্চিত হয়ে থাকে। তবু বর্ষশেষে নতুনকে বরণ করবার প্রয়াসে আমরা জেগে উঠি। আমাদের সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য যাই বলি না কেন, জাতিগতভাবে আমাদের জীবনে আসে তিনটি নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ, ইংরেজি ও হিজরি নববর্ষ। আমরা বাঙালি তাই বাংলা নববর্ষকে উদ‌্‌যাপন করে থাকি সাড়ম্বরে। এই উৎসবে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একাকার হয়ে যায়। নববর্ষ উৎসব ব্যতীত এমন কোনো উৎসব নাই যা জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে এত বেশি একাত্ম করে দেয়!

বাংলা সালের ইতিহাস জানতে হলে জানা প্রয়োজন, বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ বাঙালি জাতির নিজস্ব সময় গণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি, যা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এর উৎপত্তি মুঘল আমলে, বিশেষ করে মহামতি আকবর-এর শাসনামলে। ধারণা করা হয়, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাংলা সালের প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু তা গণনা করা হয় ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর প্রথম দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন। তখন হিজরি সাল ছিল ৯৬৩। হিজরি শব্দের অর্থ হলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশদের অত্যাচারে মক্কা থেকে মদিনায় গমন করেন। আনুমানিক সেসময় যে সালের প্রচলন হয় সেই সালই হিজরি সাল।

তৎকালীন সময়ে রাজস্ব আদায়ের জন্য হিজরি সন ব্যবহৃত হতো, যা চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। ফলে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে অসুবিধা দেখা দিতো। এই সমস্যার সমাধান করতে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তাঁর অমাত্য আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী কৃষিনির্ভর বাংলায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটা নীতি নির্ধারণ করেন। এ নীতিতে বলা হয় যে, ফসলের মাঠে বীজ বপণের প্রথম থেকে বছরের শুরু আর ফসল ওঠা শেষ হলে বর্ষের সমাপ্তি ঘটবে। সেই হিসেবে তিনি একটি নতুন সাল প্রচলন করেন যার নাম বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ সম্রাট আকবর একটি নতুন সূর্যভিত্তিক বর্ষপঞ্জি চালু করেন। যা কৃষি ফসলের সময় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এই নতুন পঞ্জিকাই পরবর্তীতে বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। তিনি হিজরি ৯৬৩ কেই বাংলা সালের প্রথম বছর হিসেবে চালু করেন। সহজ কথায় ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সাল ধরা হলো ৯৬৩। এভাবে শুরুতেই বাংলা সালের বয়স ধরা হয়েছিল ৯৬৩। তাহলে হিসাবটা মিলিয়ে নেয়া যাক। এখন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের পর ৪৭০ বছর কেটে গেছে। তাহলে ৯৬৩-এর সঙ্গে ৪৭০ যোগ করলেই পেয়ে যাব বর্তমান বাংলা সাল ১৪৩৩। এখন থেকে ৪৭০ বছর পূর্বে বাংলা সালের গণনা শুরু। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে হিজরি সাল গণনা করা হয় চাঁদ অনুসারে আর বাংলা সাল গণনা করা হয় সূর্যের গতি অনুসারে। সেই হিসেবে বাংলা সাল গণনা করা হয় ৩৬৫ দিনে আর লিপ ইয়ার হলে ৩৬৬ দিনে। কিন্তু হিজরি সাল বাংলা বছরের তুলনায় প্রতিবছর ৯ থেকে ১০ দিন কম থাকে। তাই ৩৫৫ থেকে ৩৫৬ দিনের মধ্যে হিজরি বছর গণনা করা হয়। কখনোই ৩৫৬ দিনের বেশি হয় না। আর সে কারণেই বর্তমান বাংলা সাল ১৪৩৩ ও হিজরি ১৪৪৮ এ ধরনের ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলা সালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। প্রতি বছর ১লা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসব উদ্‌যাপন করা হয়, যা বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব। এই দিনে মানুষ নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করে, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং নতুন পোশাক পরে আনন্দ উদ্‌যাপন করে থাকে।

আধুনিক যুগে বাংলা সালের কিছু সংস্কারও করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রধান ছিলেন বিখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁরা ঠিক করে দিয়েছেন প্রতিবছর বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রত্যেক মাস হবে ৩১ দিনে। আশ্বিন থেকে চৈত্র প্রত্যেক মাস হবে ৩০ দিনে। প্রতি চতুর্থ বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে।

সেই হিসেবে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালন করা হয়। প্রতিবছর দিনটি হয় ১৪ই এপ্রিল। আমরা মেতে উঠি বর্ষবরণ উৎসবে নতুনের আবাহনে । নানাবিধ অর্জন-অনার্জনের মধ্যে দিয়ে যে বছর চলে যায় সেদিকে না ফিরে পা বাড়াই নতুন দিনের পথে। নতুন করে পথ চলি আমরা। বিখ্যাত এক দার্শনিক বলেছিলেন, "পরপর দুটি দিন যার একইভাবে অতিবাহিত হয় নিশ্চয়ই সে ক্ষতিগ্রস্ত"। কাজেই একটি দিনের পর আরেকটি দিন আমরা একইভাবে কাটিয়ে দিতে পারি না। পূর্বের বছরটির চাইতে পরের বছরটি উজ্জ্বলতর হবে সুন্দরতর হবে, পুরানো বছরের সব আবর্জনা দূরে সরিয়ে নেব আমরা।

ঝেড়ে ফেলব সকল ব্যর্থতাকে। এগিয়ে যাব উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। নতুন বছরে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। 


ডেস্ক/আআগামী/০৯২১/নাআকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ